আলী মোস্তফা, টিডিএন বাংলা : শিক্ষা হল জাতীর মেরুদণ্ড। আর কোন জাতীর অতীত জানার মাধ্যম হল “ইতিহাস”। কিন্তু সেই ইতিহাস বিষয় বা বইটা যদি ভুলে ভরা থাকে বা বিকৃত থাকে, তাহলে সেই জাতী তাদের অতীতের কথা সঠিকভাবে জানবে কি করে? আর জাতীর মেরুদণ্ডটাই বা কি করে শক্তপোক্ত হবে? এগুলি বললাম এই কারণে যে, এক বাড়িতে ক্লাস ওয়ানের একটি বাচ্চার ইতিহাস বই চোখে পড়ে। তারপর বইটি হাতে নিয়ে দেখি। বইটি প্রকাশ করেছে রমানাথ মজুমদার ষ্ট্রীটের সাহিত্য কুঠি পাবলিকেশন। বইটিতে রামায়ণ ও মহাভারত নামে দুটি আলাদা অধ্যায়। রামায়ণ অধ্যায়ে ছয়-সাতটি বাক্যে রামায়ণের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যেন, ঘটনাগুলি অতীতে বাস্তবেই ঘটেছিল। সাথে আছে প্রচুর প্রশ্ন-উত্তর। যেমন, দশরথ কোথাকার রাজা ছিলেন? রাম কোথায় বনবাসে গিয়েছিলেন? রাবণ কোথাকার রাজা ছিলেন? ইত্যাদি। এই প্রশ্ন-উত্তরগুলো পড়লে বাচ্চারা ভাববে যে, সত্যিই মনে হয় রাম-সীতা-রাবণ অতীতে ছিল। এভাবেই বাচ্চাদের ব্রেনওয়াশ করা হচ্ছে।

 

এই বাচ্চারা যখন ফোর-ফাইভে উঠে টিভি বা খবরের কাগজে অযোধ্যার রামমন্দির বিতর্ক দেখে, তখন ধরে নেয়, সত্যিই মনে হয় এই অযোধ্যার এই মন্দিরেই রামচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব ব্যাপার হলো রামায়ণ ও মহাভারত কাল্পনিক মহাকাব্য ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু বাচ্চারা কি এটা পরিষ্কার করে বুঝতে পারবে? এটা ঠিকই যে, অধ্যায় দুটোর নাম দেওয়া হয়েছে, রামায়ণ ও মহাভারত এবং এটা বলাও হয়েছে যে এদুটো মহাকাব্য। কিন্তু বাচ্চারা কি এটা স্পষ্ট করে বুঝতে পারবে? যেহেতু এখানে রামায়ণ ও মহাভারতের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তারা তো ধরেই নেবে যে এরাই অতীতে ভারত-শ্রীলঙ্কা শাসন করতো। এখানে রামায়ণ ও মহাভারতের পুরো কাহিনী দেওয়া নেই। অথচ মহাকাব্যদুটির চরিত্রদের নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন আছে। সেটা কিভাবে সম্ভব? এটা তো ইতিহাস বই। ইতিহাস বইয়ে এই কাল্পনিক চরিত্রদের নিয়ে এতগুলো প্রশ্নোত্তর থাকবে কেন? বাংলা বইয়ে কাল্পনিক চরিত্রদের নিয়ে প্রশ্নোত্তর থাকে। কিন্তু সেখানে পুরো গল্পটাই তুলে দেওয়া থাকে। তারপর প্রশ্নোত্তর। যেমন ধরা যাক, ক্লাস সিক্সের হ-য-ব-র-ল। কাল্পনিক গল্পের এই বইটি সম্পূর্ণ পড়তে হয়। তারপর বাচ্চারা প্রশ্নোত্তর পড়ে। আর সিক্সের স্টুডেন্টরা এটা বুঝতে পারে যে, হ-য-ব-র-ল-এর কাহিনী সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তাছাড়া হ-জ-ব-র-ল বা বা অন্য গল্পগুলি পড়লে বাচ্চারা স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারে এগুলো নিছক গল্প। কিন্তু ইতিহাস বইয়ে যেভাবে রাম-সীতা-রাবণ-দেরকে নিয়ে যেভাবে প্রশ্নোত্তর করা হয়েছে, তাতে বাচ্চাদের বোঝার উপায় নেই যে এগুলি নিছক কাল্পনিক ব্যাপার।আসলে এভাবেই বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে তথা ব্রেনওয়াশ করা হচ্ছে। এভাবেই শিক্ষায় গৈরিকিকরণ চলছে। বইটিতে রামায়নের কাহিনী নিয়ে প্রশ্ন আছে ৩৭টি। মহাভারতের কাহিনী নিয়ে প্রশ্ন আছে ২৯টি। অথচ ঐতিহাসিক চরিত্র গৌতম বুদ্ধকে নিয়ে প্রশ্ন মাত্র ১৫টি। যীশুকে নিয়ে প্রশ্ন মাত্র ১৫টি। হজরত মুহম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে প্রশ্ন মাত্র ১০টি। শ্রীচৈতন্য কে নিয়ে প্রশ্ন মাত্র ১১টি! শুধু তাই নয়, বইটির ৪২ পৃষ্ঠায় একটি প্রশ্ন করা হয়েছে, ইসলাম ধর্মের মূল কথা কি? উত্তর দেওয়া হয়েছে, ইসলাম ধর্মের মূল কথা হল-আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। সব মানুষই আল্লাহর সন্তান। এখানে বলা হয়েছে, ইসলাম ধর্মের মূল কথা “সব মানুষই আল্লাহর সন্তান”। অথচ এটা চূড়ান্ত ভুল। লেখিকা হয় ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ নতুবা ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচার। এরকম শুধু এই বইটাতে নয়। বাচ্চাদের বেশিরভাগ ইতিহাস বইয়েই এরকম। বেশিরভাগ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ইতিহাস বইয়ে রাম-লক্ষ্মণের কাহিনী নতুবা রামায়ণ ও মহাভারত নামে আলাদা দুটো বই থাকে। এভাবে বাচ্চাদেরকে ছোটবেলাতেই রামভক্ত হিসেবে বড় করা হচ্ছে। উপরে যে বিষয়টা উল্লেখ করলাম, এটা সাধারণ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের। এছাড়া এরা বই ছাপে না। বরং কোন প্রকাশনী সংস্থার বই কিনে নেয়। সেই প্রকাশনী সংস্থাগুলিই এভাবে বাচ্চাদের বইয়ে হিন্দুত্ববাদ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে আরএসএস এর বিদ্যাভারতী পরিচালিত অনেক সারদা শিশু তীর্থ আছে। এই বিদ্যাভারতীর বই নিয়েও বারবার বিতর্ক উঠেছে। বিদ্যাভারতীর সারদা শিশু তীর্থের মূল উদ্দেশ্যই হলো বাচ্চাদেরকে ছোটবেলা থেকেই আরএসএসপন্থী হিসেবে গড়ে তোলা। অনেকদিন আগে সারদা শিশুতীর্থের এক শিক্ষক আমাকে জানিয়েছিলেন, আরএসএস-এর সদস্যদের মধ্য থেকেই সারদা শিশুতীর্থে শিক্ষক নেওয়া হয়। এভাবে পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতেই ক্রমে শিক্ষাব্যবস্থায় হিন্দুত্ববাদী চিন্তাধারা প্রচারিত হচ্ছে। এখনই জেগে না উঠলে ভারত এক এক অজানা অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাবে।