সামাউল্লাহ মল্লিক

সামাউল্লাহ মল্লিক, টিডিএন বাংলা : রামনবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। সেই ধিকিধিকি আগুন নিভতে না নিভতেই ফের উত্তপ্ত শান্তির বাংলা। রাজ্যের ২০টি জেলার ৪৮ হাজার ৬০৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত, ৯ হাজার ২১৭টি পঞ্চায়েত সমিতি ও ৮২৫টি জেলা পরিষদ আসনে ১, ৩ ও ৫ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথ। যদিও বৃহস্পতিবার পঞ্চায়েত নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশের নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। ১৬ এপ্রিলের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট  দিয়ে  নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হাল হকিকত জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। তার পরেই ঠিক হবে পঞ্চায়েত নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।

এই নির্বাচনের জন্য ২ এপ্রিল থেকে মনোনয়ন পত্র জমা শুরু হয়। সেইদিন থেকেই অগ্নিগর্ভ রুপ ধারণ করে মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের বাংলা। দিকে দিকে শুরু হয়ে যায় মনোনয়নকে ঘিরে নাটক ও যাত্রা পালা। বিক্ষিপ্ত এই ঘটনাগুলিতে এখনও পর্যন্ত প্রাণ গিয়েছে ৪ জনের। বিপক্ষীয় দলগুলির অভিযোগ, ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস বিপক্ষের উপর প্রাণনাশক আক্রমণ চালাচ্ছে। বিপক্ষের প্রার্থীদের মনোনয়ন আটকাতে মারধোরও করেছে। এই ধারাবাহিতায় বাদ যায়নি গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদমাধ্যমও। সাংবাদিকদেরও শিকার হতে হয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতার। বাম সংগঠন, বিজেপি ও কংগ্রেস একসুরে মমতা সরকারকে বিদ্ধ করছে। যদিও পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিরোধীদের সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস যদি ভালো করে লক্ষ্য করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে – রাজনৈতিক সহিংসতার এই ঘটনা প্রথমবার ঘটছেনা। আর না এই ঘটনা শেষবার ঘটছে। বাংলায় রাজনৈতিক সংঘর্ষের এক দীর্ঘ রক্তরঞ্জিত ইতিহাস রয়েছে। জাতীয় অপরাধ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এনসিআরবি) খতিয়ান এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এনসিআরবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে রাজ্যে ৮১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। যাতে ২০৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এর আগে ২০১৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার মোট ১৩১টি ঘটনায় প্রাণ গিয়েছিল ১৮৪ জনের। একইভাবে ২০১৩ সালে প্রায় ২৬ জন ব্যক্তি রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছিল, যা কিনা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অধিক।

১৯৯৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বিধানসভায় জানিয়েছিলেন, ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৮ হাজার মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। রাজ্যে ১৯৭৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গবেষণা করে বই লেখা সমাজ কর্মী সুজাত ভদ্র বলেন, ‘গবেষণা করে বই লিখতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে, ভারতে সবথেকে বেশি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা যদি কোথাও ঘটে থাকে সেটা হল পশ্চিমবঙ্গ।’ রাজ্যের প্রবীণ সাংবাদিক বরুণ ঘোষ বলেন, ‘বাংলায় রাজনৈতিক সহিংসতা কোনও নতুন ঘটনা নয়। ষাটের দশকের শুরু থেকেই বাংলায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে আসছে।

বাংলায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধির পিছনে সাধারণত তিনটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে। বেকারত্ব, আইনের শাসনের উপর ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের আধিপত্য ও বিজেপির পাল্টা সহিংসতা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ডা. বিশ্বনাথ চক্রবর্তী এই কারণগুলির ব্যাখা করতে গিয়ে বলেন, ‘বাংলায় ব্যবসার হালহকিকত খুব একটা ভালো না, যার কারনে রোজগারের নতুন পথ খুলছেনা। অন্যদিকে জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। চাষাবাদ করে বিশেষ কিছু সুবিধা হচ্ছেনা। এমতাবস্থায় বেকার যুবকেরা টাকা আয় করার জন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছে, যাতে করে পঞ্চায়েত অথবা বিধানসভা কোটার উন্নয়ন খাতের টাকায় ভাগ বসানো যায়। স্থানীয় পর্যায়ে চলমান তোলা আদায়ও তাঁদের আয়ের অন্যতম উৎস। তাঁরা চায়, তাঁদের নিকটতম আত্মীয় কোনওপ্রকারে নির্বাচনে জয়ী হোক। এরজন্য যদি হিংসার পথ বেছে নিতে হয় তাও তাঁরা বেছে নেয়। আসলে এটা তাঁদের অর্থনৈতিক লড়াই।’

ডা. বিশ্বনাথ চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘আইনের শাসনে ক্ষমতাসীন পার্টির হস্তক্ষেপ রাজনৈতিক সহিংসতার অন্যতম কারণ। বিগত কয়েক বছরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ‘রুল অফ ল’কে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের মুঠোয় ভরে নিয়েছে এবং আইনী তথা প্রশাসনিক বিষয়গুলিতেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে। এই কারণেই পুলিশ আধিকারিকরা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারছেন না।’ উল্লেখ্য, পঞ্চায়েত নির্বাচনকে ঘিরে বিপক্ষীয় দলগুলি ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি পুলিশের উপরও পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করছে। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যের পুলিশ তৃণমূল কংগ্রেসের ক্যাডারের মত আচরণ করছ।

সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের হিংসার জবাব বিপক্ষীয় দলগুলি বিশেষ করে বিজেপি হিংস্রভাবেই দিয়েছে। বিশেষত উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের প্রধান বিরোধী হিসেবে উঠে এসেছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া মনোনয়ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেস ১ হাজার ৬১৪টি আসনে ও বিজেপি ১ হাজার ১৪৩টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এইক্ষেত্রে কংগ্রেস অথবা সিপিআইএম অনেক পিছিয়ে। কমিউনিস্ট পার্টি ৩৫১ ও কংগ্রেস ১২৪টি আসনের জন্য মনোনয়ন ভরতে সক্ষম হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে যে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল এখন বিজেপি। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।