মুহাম্মদ নুরউদ্দীন, টিডিএন বাংলা : নাম পরিবর্তন এর হিড়িক পড়েছে দেশ জুড়ে। এলাহাবাদের নাম পাল্টে হোল প্রয়াগ রাজ। মুঘল সরাই হয়ে গেল দিন দয়াল উপাধ্যায় নগর। ফাইজাবাদ এর নাম পাল্টে করা হচ্ছে অযোধ্যা। হায়দ্রাবাদ এর ভাগ্যে হয়তো ‘ভাগ্য নগর’নামটি অপেক্ষা করছে। আহমেদাবাদ হয়ত কর্ণাবতী বলেই লোক জানবে। নাম পরিবর্তনের হিড়ীকে হয়ত একদিন ভারত আর ভারত থাকবেনা। নাম পরিবর্তনের পিছনে কাজ করছে এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক মানসিকতা। মুসলিম মুক্ত ভারতের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে  মুসলিম ঐতিহ্য এমন কি আরবী, ফারসী শব্দও তাদের কাছে এলার্জির মতো হয়ে গেছে।তারা মুসলীম ঐতিহ্য সংস্কৃতি সবকিছু কে মুছে ফেলতে চায়। এই জঘন্য মানসিকতার পিছনে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া আর কিছু নেই। নিজেদের কে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বলে জাহির করা আর মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে ভোটের অংক মেরুকরণ করাই তাদের লক্ষ।

জায়গার বা স্থানের নাম পরিবর্তন করা কোন নতুন বিষয় নয়। কলিকাতা হয়েছে কোলকাতা, মাদ্রাজ হয়েছে চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর হয়েছে বেঙ্গালুরু, ম্যাঙ্গালোর হয়েছে মেঙ্গালুরু, মাহিসুর হয়েছে মাইসুরু, হুবলি হচ্ছে হাব্বালি, বীজাপুর হয়ে গেছে বিজয়পুরা। এ সকল নাম পরিবর্তনের  পিছনে স্থানীয় সংস্কৃতি ভাষা, আবেগ ইত্যাদি বিষয়কে গুরত্ব দেওয়া হয়। আবার পশ্চিমবঙ্গ ইংরেজিতে ওয়েস্টবেঙ্গল হয়ে যাওয়ার কারনে শেষের সারিতে পড়ে বলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের নাম পাল্টে বেঙ্গল করলেন।

শুধু রাজ্য নয় স্থানীয় রাস্তা, সড়ক, বাজার, সব কিছুরই নাম পাল্টানো হচ্ছে। মুনশী ডাঙ্গা কখন যে নীরবে মনসা ডিঙ্গি হয়ে যাচ্ছে বোঝাই মুশকিল। মুর্শিদাবাদের উমর পুর সড়ক বিভাগের দপ্তরে গিয়ে হয়ে গেছে অমর পুর। বাহারাম শাহের স্মৃতি বহন করা বহরমপুর ইংরেজদের কাছে এসে হয়ে গেল বেরাহামপুর।

এই সকল পরিবর্তন এর পিছনে কোথাও কালের ধারা কোথাও ভাষার বিবর্তন কাজ করছে। কিন্তু অমিত শাহ, যোগি আদিত্য নাথরা যে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও বিদ্বেষ নিয়ে নাম পরিবর্তনে নেমেছে তা ভয়ংকর। ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব তাই অমিত শাহ এর নামের ব্যাপারে যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন।তিনি তার এক টুইটে দাবী করেছেন আরবী ফারসি যুক্ত শব্দ বাদ দিতে হলে তো অমিত শাহ এর নামটাও বাদ দিতে হয়। কেননা শাহ কথাটাই ফারসী। এটা সম্পূর্ণ ভাবে বিদেশি শব্দ।আর এই শব্দ মুসলিম সম্প্রদায়ের হাত ধরে এ দেশে এসেছে। তেমনিভাবে, মজুমদার, জায়গিরদার, জামিনদার, তাহবিলদার, হকিম, হুকুম উকিল, মুনশী সব শব্দই আরবি ফার্সীর প্রভাবিত।লাল কেল্লায় দাঁড়িয়ে ভাষণ দেব, এই ঐতিহাসিক সৌধ ভাড়ায় দিয়ে টাকা কমাবো, বিদেশে গিয়ে তাজমহল কে নিয়ে গর্ব করব আর লালকেল্লা, তাজমহল এর স্রষ্ঠাদের নাম ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চাইব তা কি করে হয়?

মুসলিম বিদ্বেষ ভারতীয় জনতা পার্টিকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে তারা এ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সবকিছু পাল্টে ফেলতে চায়। গেরুয়া করণের নামে ইতিমধ্যে তারা ইতিহাস থেকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম মুছে ফেলতে চেষ্টা করছে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এ ভরপুর ইতিহাস শিশু কিশোর দের মন মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিভাজনের রাজনীতি তাদের কে এতটা নিচে নামিয়েছে যে তারা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে রাজনীতি করতে ছাড়েনি।এক সময় নেতাজির ঘোর বিরোধী ছিল এই রাজনৈতিক দল টি। তারা নেতাজির ফাইল প্রকাশ করতে চায়নি। কিন্তু যখন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাহসিকতা দেখিয়ে নেতাজির ফাইল প্রকাশ্যে নিয়ে এলেন তখন চাপে পড়ে নরেন্দ্র মোদী নেতাজির কিছু ফাইল প্রকাশ করলেন। নেতাজীকে নিয়ে অনেক কথা লেখা হয়েছে বহু বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর জীবনের অনেক গোপন রহস্য আবিষ্কার করতে গবেষণায় নিযুক্ত আছে বহু ইতিহাসের ছাত্র ও অধ্যাপক।নেতাজির মৃত্যু রহস্য আজও উন্মুক্ত হয়নি তা নিয়ে বাক বিতণ্ডা চাপান উতর কম হয়নি। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য ও বিস্ময়ের বিষয় যে নেতাজির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যার ছিল যিনি তাকে জার্মান ,রাশিয়া, জাপান সফর করার পুর ব্যবস্থা করেছিলেন সেই মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির নাম উল্লেখ থেকে অতি সন্তর্পনে এড়িয়ে গেছেন ঐতিহাসিক গণ। যে জিয়াউদ্দিন এর ছদ্ম বেশ ধারণ করে নেতাজি দেশ ছেড়ে ছিলেন সেই জিয়াউদ্দিন কে? পরে ধরা পড়ে ব্রিটিশ রা যাকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে তিনি ছিলেন এই বিখ্যাত দেশপ্রেমিক। ভারতের ইতিহাস অতি সন্তর্পনে সতর্কতার সাথে এই নামগুলি এড়িয়ে গেছে। কাফনের গায়ে কয়লার কালি দিয়ে যিনি ভারতের সম্প্রীতির ইতিহাস লিখে গেছেন সেই ফজলে হক খাইরাবাদীর নাম ভুলিয়ে দিতে চায় ভারতের গৈরিক ইতিহাস। বিনয়, বাদল ,দীনেশ, ক্ষুদিরাম প্রফুল্ল চাকী দের নাম যথা যোগ্য মর্যাদার সঙ্গে ইতিহাসে ঠাঁই পেলেও সম পর্যায়ের শহীদ দেশ প্রেমিক আস্ফাকুল্লা, আহমাদুল্লা, শের আলী, তিতুমীর, আব্দুল্লাহ, মুহাম্মাদ আলী, শওকত আলী, আব্দুল গাফফার খাঁন দের নাম মুছে দেওয়া হচ্ছে।

এটাই ভারতের চরম ট্র্যাজেডি। আজ যারা সামান্য রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য কে বিকৃত করছে তারা আর যাই হোক দেশ ভক্ত, দেশ প্রেমিক হতে পারেনা। তারা দেশের শত্রু, মানুষের শত্রু। এই শত্রু দের যারা চিনেও না চেনার ভান করছে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবেনা।

Not available