চারিদিকে চক্রান্তের বিস্তার

২৩ জুন ১৭৫৭ সাল। কয়েক ঘণ্টার ‘তথাকথিত-যুদ্ধ’ নামের প্রহসনে পাল্টে গেল বাংলার এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভাগ্য। যুদ্ধের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ধারার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পলাশীর ২৬০ বছর পূর্তিতে পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরছেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এর কন্ট্রিবিউটিং এডিটর ড. মাহফুজ পারভেজ। পড়ুন তৃতীয় পর্ব

১৭৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে নবাব ও ইংরেজের মধ্যে আলীনগরে সন্ধি স্বাক্ষরিত হলেও শুরু থেকেই সন্ধির শর্তাবলি অমান্য করে পরিস্থিতি উত্তেজক রাখতে এবং নবাবকে বিরক্ত করতে উদ্যোগী হয় ইংরেজরা। একই সঙ্গে, সন্তর্পনে তারা নবাবের প্রতি বিরূপ সভাসদদের নিয়ে ষড়যন্ত্রের বিস্তার ঘটাতে থাকে।

আগে থেকেই নানা কারণে রাজধানী মুর্শিদাবাদ রাজ-দরবারের কিছু প্রভাবশালী আমত্য তরুণ নবাব সিরাজের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। আর ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রাসাদ রাজনীতি। ইংরেজরা এসব তৎপরতাকে উস্কে দেয়। ইতিহাস গবেষকরা বলছেন, ইংরেজরা বাংলার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তার করে ষড়যন্ত্রে বলয় বড় না করলে আদৌ পলাশীর ঘটনা ঘটত কিনা সন্দেহ।

পলাশিতে সৈন্য সমাবেশ

নবাব সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র চূড়ান্তকরণে অন্যান্য চক্রান্তকারীর তুলনায় ব্রিটিশ-ইংরেজরাই সবচেয়ে বেশি উদগ্রীব ও অগ্রণী ছিল। লন্ডনে অবস্থিত কোম্পানির কর্তারা এ ব্যাপারে যত না তৎপর ছিল, ভারত ও বাংলার কোম্পানি কর্তারা তারচেয়ে অধিক সচেষ্ট ছিল। কোম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তারা বারংবার লন্ডনে এই বলে চাপ দিতে থাকে যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাংলার ক্ষমতা গ্রহণের নীতি গৃহীত হওয়া দরকার। এক পর্যায়ে কেন্দ্রিয়ভাবে কোম্পানি ভারত ও বাংলার জন্য আধা-সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে। ফলে বাণিজ্যের বাইরে ক্ষমতা গ্রহণের লক্ষ্যে নানামুখী তৎপরতা চালাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের সামনে আর কোনো অসুবিধা থাকে না।

বাস্তবিক পক্ষে, ১৭৫৬ সালের ১৩ অক্টোবর গৃহীত ফোর্ট সেন্ট জর্জ কাউন্সিলের নিদের্শনামায় ‘পলাশী ষড়যন্ত্রের বীজ’ বপন করা হয়। নিদের্শনামা মতে, শুধু কলকাতা পুনরুদ্ধার ও বিপুল ক্ষতিপূরণ আদায় করলেই চলবে না, বরং ‘বাংলা প্রদেশে নবাবের উগ্রতায় বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিবর্গ বা যারা নবাব হতে অভিলাষী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য প্ররোচিত করা হয়’। নিদের্শনামার এই অভিব্যক্তির মর্মার্থ অনুধাবণ করতে কারো কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

ফলে মাদ্রাজ থেকে কলকাতা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার আগেই ক্লাইভ নবাবের আমত্যদের বিরূপতাকে কাজে লাগানোর ইঙ্গিত পেয়ে যান। তিনি সেখানে শুধু যুদ্ধ নয়, ‘নাইস ইমপরটেন্ট গেম’-এর জন্য যাচ্ছেন মর্মে বিলাতে বসবাসকারী পরিবারবর্গকে চিঠিতে জানান। এতে পলাশীকে কেন্দ্র করে চারদিক থেকে ঘনিয়ে আসা ষড়যন্ত্রের গভীরতা ও তীব্রতা সহজেই আঁচ করা যায়।

পলাশি : যুদ্ধ পরিকল্পনা

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ক্লাইভ এবং ওর্ম (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারি ইতিহাস লেখক) উভয়েই বাংলা দখল করার লক্ষ্যে ইংরেজদের একটি পূর্ব পরিকল্পনা সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। ১৭৫২ সালে কর্নেল স্কট নামে একজন ইংরেজ সেনাপতি কলকাতায় এই পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেন এবং সেটি মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জ-এর মোহাফেজখানায় সংরক্ষণ করে রাখেন।

বয়সে তরুণ হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতায় পাকা ক্লাইভ ১৫৪৯-৫০ সময়কালে এক বছরের জন্য কলকাতায় অবস্থান ও পর্যবেক্ষণও করেন। তিনি সেখানে ডাচ ও আর্মেনিয়ান বণিকদের প্রসার লক্ষ্য করে তার স্থলে ইংরেজ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প তখন থেকেই আঁটতে থাকেন। তদুপরি, বাংলার শাসকদের সঙ্গে ফরাসিদের সুসম্পর্ক দেখেও তিনি বিচলিত হন। দ্বিতীয় বার কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য আসার সময় তিনি ইংরেজ আধিপত্য সামগ্রিকভাবে নিষ্কণ্টক করার ক্ষেত্রে সিরাজকে নবাবের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়াটাই একমাত্র উপায় বলে সিদ্ধান্ত নিয়েই আসেন। তাছাড়া বাংলায় ইংরেজের আধা-সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার কাজটিও সিরাজের মতো স্বাধীনচেতা শাসনের উপস্থিতিতে মোটেও সম্ভব ছিল না বলেই নবাবকে সরানোর ক্ষেত্রে ইংরেজরা সর্বাত্মক ভূমিকা পালনে তৎপর হয়।

অনেক ঐতিহাসিক যদিও মত দেন যে, ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীরাই সহযোগিতা লাভের আশায় পরিকল্পিত ‘বিপ্লব’ ঘটানোর জন্য ইংরেজদের সাথে যোগাযোগ করে ও চক্রান্তে লিপ্ত হয়, তথাপি ঐতিহাসিক দলিলপত্র বিশ্লেষণে সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ব্রিটিশরাই তাদের পরিকল্পিত ‘বিদ্রোহ’ বাস্তবায়নের জন্য নবাবের দরবারের বিরুদ্ধবাদীদের সমর্থন আদায়ের জন্য যোগাযোগ করার ব্যাপারে অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করে। কাসিমবাজার থেকে ১৭৫৭ সালের ৯ এপ্রিল কোম্পানির কর্মচারি লুক ক্র্যাফটন কর্তৃক ক্লাইভের বিশ্বাসভাজন জন ওয়ালশকে লেখা পত্রে এ ধারণার অনুকূলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চিঠিতে তিনি জানান, ‘ঈশ্বরের দোহাই, আমাদের নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা মতো অগ্রসর হওয়া উচিত। কারণ কোম্পানির প্রতি অনুরক্ত নবাব পাওয়া কোম্পানির জন্য কতই না গৌরবজনক হবে।’

প্রাথমিকভাবে ইয়ার লতিফকে পরবর্তী নবাব করার জন্য পরিকল্পনা নেয় কলকাতার ইংরেজরা। কিন্তু ক্লাইভ যখন বাংলায় এসে জানতে পারেন যে, প্রভাবশালী মীরজাফর নবাবের প্রতি তীব্রভাবে অসন্তুষ্ট, তখন তিনি পূর্বতন পরিকল্পনা বাতিল করে দেন। ক্লাইভ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ওয়াটস এবং ক্র্যাফটনকে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেন মীরজাফরকে সক্রিয় করার জন্য। তিনি ইংরেজদেরকে মীরজাফরের আস্থা ও বন্ধুত্ব অর্জনের জন্য সম্ভাব্য যা কিছু দরকার, সবই করার নিদের্শ দেন। এ লক্ষ্যে দুই ইংরেজ, ওয়াটস এবং ক্র্যাফটন, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতায় ব্যস্ত ও কর্মবহুল সময় অতিবাহিত করেন। প্রথম দিকে মীরজাফর ইংরেজদের বিশ্বাস করেন নি এবং পাত্তা দেন নি। এমনটি টের পেয়ে ওয়াটস এবং ক্র্যাফটন কলকাতার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী উমিচাঁদ-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নবাবের দরবারের প্রধান প্রধান কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে তাকে নিযুক্ত করেন। উমিচাঁদ ইংরেজদের কাছে নবাবের দরবারের গোপন চিত্র প্রকাশ করেন এবং নবাব হতে আগ্রহী ইয়ার লতিফের পক্ষে দিওয়ান রায়, দুর্লভরাম ও প্রভাবশালী ব্যাঙ্ক মালিক জগৎ শেঠ প্রমুখের সমর্থনের কথা জানান। মীরজাফরকে হাতে আনতে ব্যর্থ ওয়াটস সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনাটি লুফে নেন এবং ক্লাইভকে জানিয়ে তা অনুমোদন করিয়ে নেয়।

পলাশির যুদ্ধ

ইংরেজদের সঙ্গে ইয়ার লতিফের যোগাযোগ আঁচ করতে পেরে মীরজাফর তার অনীহা ভেঙে তৎপর হন। তিনি খাজা পেট্রস নামের এক আর্মেনীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ইংরেজদের কাছে নবাব হওয়ার আগ্রহের কথা জানান। এমতাবস্থায় কলকাতার কোম্পানির সিলেক্ট কমিটি জরুরি বৈঠকে বসে মীরজাফরকে সমর্থনের পক্ষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ওয়াটসকে মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তির শর্তাদির বিষয়ে আলোচনা করার দায়িত্ব প্রদান করে। মীরজাফর ১৭৫৭ সালের ২ মে ওয়াটসের মাধ্যমে ক্লাইভ ও কোম্পানির পূর্ণ সম্মতি জ্ঞাত হন। তিনি ৩০ মে পর্যন্ত রাজধানী মুর্শিদাবাদে নবাবের চোখের সামনেই অবস্থা করছিলেন বিধায় ইংরেজদের সঙ্গে প্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনা ও চুক্তি সম্পাদনের উপযুক্ত সুযোগ পাচ্ছিলেন না।

এমতাবস্থায় ইংরেজরা বড় রকমের একটি কূটনৈতিক চাল চালে। ৫ জুন ওয়াটস ইংরেজদের মূল মতলব ও ইচ্ছা গোপন রেখে দুটি চুক্তি সম্পাদন করে। লাল কাগজের একটি চুক্তিতে ইংরেজরা ইয়ার লতিফের পক্ষে উমিচাঁদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। আর সাদা কাগজের চুক্তিনামায় অতি গোপনে ও কৌশলে মীরজাফরের স্বাক্ষর আদায় করে। এভাবেই পলাশীর মাত্র কয়েকদিন আগেই ইংরেজরা নবাবের বিরুদ্ধবাদী শক্তিগুলোকে টোপ দিয়ে হাত করে নেয়। নবাবের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইংরেজের পক্ষাবলম্বীতে পরিণত হয়। ষড়যন্ত্রকারীরা ইংরেজদেরকে এই মর্মে বিশ্বাস করে যে, নবাব সিরাজ পরাজিত হলে ‘তাকেই’ বাংলার নবাব পদে অধিষ্ঠিত করা হবে। ভবিষ্যত ক্ষমতার লোভে ষড়যন্ত্রকারীদের সকলেই নিজ নিজ অনুগত লোকজনকে নিষ্কিয় ও স্থবির করে রাখে। ইংরেজের বিরুদ্ধে সিরাজের বিরাট বাহিনী ভেতরে ভেতরে অসংহত ও অকার্যকর হয়ে যায়। যুদ্ধের আগেই যেন পরাজিত হয়ে পড়েন নবাব সিরাজউদ্দৌলা।

কতিপয় অনুগত সেনা ছাড়া বিপুল সংখ্যক নামী-দামি সেনাপতি ও আমত্য যে চক্রান্তে অংশ নিয়ে পক্ষ-পরিবর্তন করে তাঁকে ছেড়ে ইংরেজদের দিকে চলে গেছে, সেটা আবছাভাবে অনুধাবন করতে পারলেও ষড়যন্ত্রকারীদের অতি-সাবধানী তৎপরতা ও দেশপ্রেমের অভিনয়ের কারণে নবাব পুরোপুরি ধরতে পারেন নি। ফলে তিনি এইসব অবিশ্বস্ত লোকদের ওপর আস্থা রাখেন এবং এদের ওপর ভরসা করেই যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে চরম প্রহসনের শিকারে পরিণত হয়ে একতরফাভাবে মার খেয়ে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হন।

পরবর্তী পর্ব
বাংলার আকাশে ঘনীভূত অন্ধকার