টিডিএন বাংলা ডেস্ক : আমাদের দেশের সশস্ত্র বাহিনীতে যে সমস্ত বীর যোদ্ধার নাম স্বর্ণাক্ষরে উৎকীর্ণ হয়ে আছে, মোহম্মদ উসমান (১৫ ই জুলাই, ১৯১২- ৩রা জুলাই, ১৯৪৮) এর নাম তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তাঁর জন্ম উত্তরপ্রদেশের মৌ জেলায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সারা পৃথিবী যখন বিধ্বস্ত, তেমন সময় বিদেশীদের চক্রান্তে ভারত বিভাগ নিশ্চিত হয়ে গেল। সেই সময় তিনি বর্তমান পাকিস্তানের বালুচ রেজিমেন্টে পোস্টেড। সেনাবাহিনীতে বহুমূল্য পদোন্নতির লোভ, বা উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসারের নিশ্চিত জীবনের আশ্বাস- কোনটাই তাঁকে টলাতে পারেনি ভারতের প্রতি তাঁর অশেষ দেশভক্তি আর ভারতের মাটির প্রতি তাঁর আজন্মের টানকে। অতঃপর বদলি নিলেন, ডোগরা রেজিমেন্টে। ১৯৪৮ এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে জম্মু ও কাশ্মীরের নৌশেরা ও ঝাঙ্গার এ ভয়ঙ্কর যুদ্ধের বাতাবরণ- এই সময় বীর উসমানের সামরিক প্রতিভার স্বাক্ষর পাওয়া যায় একাধিকবার, ভারতের সামরিক ইতিহাসে সেই সমস্ত গল্প আজ প্রায় কিংবদন্তির রূপ নিয়েছে। শোনা যায়, একবার পাকিস্তানের হাজারকয়েক সৈন্য সীমান্তে আক্রমণ শুরু করে, ব্রিগেডিয়ার উসমানের কাছে তখন হাতেগোনা কয়েকজন ভারতীয় সেনা। অকুতোভয় ব্রিগেডিয়ার সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন আর যুদ্ধ শেষে দেখা যায় পাকিস্তানের যেখানে প্রায় এক হাজার জন আহত ও আরো এক হাজার সৈন্য নিহত হয়, ভারতের তরফে কেবল ৩৩ জন সৈন্য শহীদ হয়েছিলেন আর মোট জন ১০২ আহত। সীমান্ত রক্ষায় উসমানের অপ্রতিদ্বন্দীতা লোকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, ভারতবাসী ভালবেসে তাঁর নাম দিয়েছিল ‘নৌশেরা কা শের’ বা নৌশেরার সিংহ। পাকিস্তানের সরকার এতটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছিল যে তাঁর মাথার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ৫০,০০০ টাকা; সেই সময়ের বিচারে আজ তা কত দাঁড়ায় আপনারাই ঠিক করে নিন। যদিও শত্রুর এইসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে লক্ষ্যে অবিচল থেকে ব্রিগেডিয়ার তাঁর দায়িত্বপালন করে গেছেন শেষ দিন পর্যন্ত।

১৯৪৮ এর ৩রা জুলাই, জম্মু-কাশ্মীরে ভারত-পাক যুদ্ধে মৃত্যবরন করে এই বীর সন্তান সমগ্র ভারতবাসীকে ঋণী করে গেছেন, দেশভাগের যন্ত্রণার শেষে নতুন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ প্রেক্ষাপটে দেখলে তাঁর অবদান এক অন্য মাত্রা পায়, তাঁর অবদান এই সত্য স্মরণ করিয়ে দেয় যে ধর্ম নয়, দেশই আসল পরিচয়, দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার চেয়ে বড় পুণ্য আর নেই। তিনি প্রকৃতই ছিলেন ‘ঝাঙ্গার এর রক্ষাকর্তা’, মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ কথাটি ছিল-‘আমি মরতে চলেছি, কিন্তু যে ভূখন্ড রক্ষা করার জন্য আমরা লড়াই করছি, তা যেন কোনদিন শত্রু দখল করতে না পারে।’ নিজের দেশের প্রতি অনুভব, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের কতখানি উপরে উঠতে পারলে এমন কথা বলা যায়, তা সত্যিই বিস্ময়কর ও শ্রদ্ধার্হ।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদার ও দয়ালু, তাঁর উপার্জনের একটি বড় অংশই দরিদ্র শিশুদের লালনপালন ও শিক্ষার জন্য তিনি দান করে দিতেন। ভারতের সেনাবাহিনীর উচ্চতম পদাধিকারীদের মধ্যে একজন বীর, যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেছিলেন যে অমর শহীদ, তাঁকে শেষ সম্মান জানাতে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও তাঁর ক্যাবিনেটের অন্যান্যরা সমবেত হন। স্বাধীন ভারতের সামরিক বাহিনীর যে শ্রেষ্ঠ সম্মান, মৃত্যুপরবর্তী পদক- ‘মহাবীর চক্র’ তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে, এই মৃত্যুত্তীর্ণ পরমবীরের প্রতি আমরা আমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা জানাই।