টিডিএন বাংলা ডেস্ক : ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক, এর ফলে হার্ট ও ফুসফুসের ক্ষতি, গলা ও ফুসফুসের ক্যানসার, অ্যালার্জিক কাশি হয়, তা আমরা সকলেই জানি। তবে সদ্য হওয়া একটি নতুন গবেষণার ফলাফল থেকে জানা গিয়েছে যে অতিরিক্ত ধূমপান শুধু হার্ট বা লাংস নয়, ক্ষতি ডেকে আনে চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেরও। এমনকী সেই ক্ষতি বাড়তে বাড়তে মানুষ চিরতরে হারাতে পারে তার পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি। অর্থাত ধূমপানের সঙ্গে চোখের প্রধান অংশ রেটিনার ক্ষতি হয়ে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে।

কীভাবে ধূমপান রেটিনাকে ক্ষতিগস্ত করে তা জানতে রেটিনার কাজ সম্পর্কে দু-এক কথা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। রেটিনা চোখের একটি বিশেষ প্রকারের টিস্যু, যা আলোর প্রতি সংবেদনশীল। চোখের পিছন দিকে এই টিস্যুটির অবস্থান। এই রেটিনা অনেকটা ক্যামেরার ফিলের মতো কাজ করে। রেটিনায় পড়া আলোকরশিকে কম্পনে রূপান্তরিত করে আমাদের দেখতে সাহায্য করে। ফলে আমাদের দৃষ্টিশক্তি ঠিকঠাক রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে রেটিনা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত ধূমপানের ফলে ক্ষতিগস্ত হয় এই পদ্ধতি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড সু্ল অব পাবলিক হেল্থের পক্ষ থেকে গবেষক অ্যান্ড্রু রজার জানান, ‘ক্রমাগত যদি কেড খুব বেশি মাত্রায় ধূমপান করে তাহলে রক্তে বিশেষ কয়েটি রাসায়নিকের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। যার ফলে রেটিনা পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পায় না। আর সেজন্যই যারা খুব বেশি ধূমপান করে বয়স বাড়লে সবার প্রথমে তাদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষয় হয়। কেননা তাদের অল্প বয়সেই রেটিনা ক্ষয়ে যায়। ডাক্তারি পরিভাষায় এর নাম এজ রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (এএমডি)। ধূমপান ছাড়াও এর অন্যান্য কারণও রয়েছে। তবে ধূমপানজনিত ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়।’

‘সাইকিয়িট্রিক রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধ থেকে জানা গেছে ধূমপায়ীদের মধ্যে বিশেষ কয়েটি রং দেখার সমস্যা হয়, এর মধ্যে রয়েছে লাল, সবুজ, নীল, হলুদ। এর থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় নিউরোটক্সিক কেমিক্যাল যুক্ত উপাদান গহণে এই দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়ার সমস্যা ত্বরান্বিত হয়। এছাডা়ও চোখের অন্যান্য রোগ যেমন ছানি পড়া বা ক্যাটারাক্ট, চোখের প্রেসার বেড়ে গিয়ে হওয়া রোগ গ্লুকোমার পিছনেও ধূমপানের একাট প্রত্যক্ষ ভূমিকা বর্তমান। গবেষণায় দেখা গেছে ধূমপানের ফলে চোখের সামনের অংশের রোগগুলিই মূলত বেশি হয়, ম্যাকিউলার ডিজেনারেশন এবং ডায়াবেটিক ম্যাকিউলার ডিজিজের মতো রেটিনার রোগগুলিই এক্ষেত্রে সবার প্রথমে নীরবে বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যায়ে গিয়ে যখন ধরা পড়ে তখন রোগীর দৃষ্টিশক্তি হারানোর উপক্রম হয়।

মুম্বইয়ে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জীব মাহাতোর মতে, ‘রেটিনা কোনও কারণে ক্ষতিগস্থ হয়ে গিয়ে যদি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়, তাহলে তা ফিরিয়ে আনা আর কোনওমতেই সম্ভব নয়, কিন্তু কর্নিয়ার ক্ষেত্রে রিপ্লেসমেন্ট সম্ভব। তবে হ্যাঁ প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা পড়লে তা নিযন্ত্রণ করা অনেকটাই সম্ভব। উপসর্গ চিনতে পারাই প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয়ে প্রধান উপায়। অনেকে বার্ধক্যজনিত সমস্যা হলে এগুলোকে এড়িয়ে যায় আর সমস্যাটা সেখান থেকেই বাড়তে শুরু করে ক্রমশ।’

গবেষকরা বারবার বলছেন ডায়াবেটিসের রোগীদের বেশি করে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। তাঁরা ধূমপান করলে অতি সহজেই ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (ডায়াবেটিস থেকে চোখের স্নাযু ক্ষতিগস্থ হয়)। তবে বর্তমানে চিকিত্সাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এই ধরনের রোগের বাড়বান্ত আটকানোর চিকিত্সা বেরিয়েছে।  লেজার ফোটোকোয়াগুলেশন ও অ্যানি ভাসু্লার এন্ডোথেলিয়াল গোথ ফ্যাক্টর ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে চিকিত্সা করা হয়।

পাশাপাশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ধূমপান ছাড়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। সঙ্গে গাঢ়় সবুজ রংয়ের অ্যানি অক্সিডেন যুক্ত সবজি যেমন ব্রকোলি, লেটুস, পালংশাক খেলে রেটিনা ঠিক থাকবে। এসবের মধ্যে থাকে লুটেইন ও জিয়াক্সানথিন, এগুলি চোখের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়া গাজরের ভিটামিন এ-ও চোখকে সুরক্ষা দেয়।