তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা: যে ধর্মের নামে বিভেদ সঞ্চিত করে, ঈশ্বরের অর্ঘ্য হতে সে হয় বঞ্চিত।—- বারবার সমাজে বিভেদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সারা দেশ আজ বিভেদের বিষবাস্পে আক্রান্ত। এই যে বিভাজন রাজনীতি থেকে ধর্ম সবখানে আজ ছড়িয়ে গিয়েছে, এর বিপদটা বহু আগেই বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

২৫ বৈশাখ মানে শুধু গলা ছেড়ে গান নয়, শুধু কবিতার অনুরণন নয়, তাঁর অনুভবের আলোকে সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরার দায়বদ্ধতাও আছে। ২১ জৈষ্ঠ্য ১৩৩৮, রবীন্দ্রনাথ হেমন্তবালা দেবীকে লিখছেন, ‘বৈষ্ণব যেখানে বোষ্টম নয় সেখানে আমিও বৈষ্ণব, খৃষ্টান যেখানে খেষ্টান্‌ নয় সেখানে আমিও খৃষ্টান’।
হেমন্তবালা দেবী তাঁর নিজস্ব বিশ্বাসের জগত থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিঠি-বিনিময় করেছিলেন। সমাজ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি নিয়ে বড় বড় গালভরা কথা তিনি বলেননি। আর সেই সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের ধর্মবোধের সহনশীলতা এবং উদারতা অনেক সহজ করে পাওয়া যায় সেই সব চিঠিপত্রে। যেমন আর একটি চিঠিতে,
‘…যেখানে মন্দিরের দেবতা মানুষের দেবতার প্রতিদ্বন্দ্বী, যেখানে দেবতার নামে মানুষ প্রবঞ্চিত সেখানে আমার মন ধৈর্য্য মানে না।…দেশের লোকের শিক্ষার জন্যে অন্নের জন্যে, আরোগ্যের জন্যে এরা কিছু দিতে জানে না, অথচ নিজের অর্থ-সামর্থ্য সময় প্রীতি ভক্তি সবই দিচ্ছে সেই বেদীমূলে যেখানে তা নিরর্থক হয়ে যাচ্ছে। মানুষের প্রতি মানুষের এত নিরৌৎসুক্য, এত ঔদাসীন্য অন্য কোনো দেশেই নেই, এর প্রধান কারণ এই যে, এ দেশে হতভাগা মানুষের সমস্ত প্রাপ্য দেবতা নিচ্ছেন হরণ করে।…’
এই চিঠি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ১৯৩১-এ, অর্থাৎ মৃত্যুর দশ বছর আগে। নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে রাতারাতি কোনও বিপ্লব ঘটাতে চাননি রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সেটা করা যায় না। বরং তিনি নিজেকেই তাঁর সহিষ্ণু বিশ্বাসে অটল থাকার কথা বলছেন, ‘ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে যে মঙ্গলের ধারা প্রবাহিত হইতেছে তাহাকে পদে পদে “আমরা” ও “তোমরা” বাঁধের দ্বারা বিভক্ত করিয়া ধর্ম্মকে ও সাম্প্রদায়িক জয়পরাজয়ের আস্ফালনের সামগ্রী করিয়া অকারণে যাঁহারা কল্যাণকে বাধাগ্রস্ত করিয়া তোলেন তাঁহারা কেবলমাত্র ব্রাহ্ম নামটাকে গ্রহণ করিয়া উপবীতধারী অথবা অন্য কাহারও চেয়ে আপনাকে শ্রেষ্ঠ কল্পনা করিবার অধিকারী নহেন।’

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন না যে অসহিষ্ণুতার আবহ থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড় করিয়ে রাখলেই প্রলয় বন্ধ থাকে।

এই ভাবে বার বার সহিষ্ণুতার পক্ষে একলা দাঁড়িয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বঙ্কিমচন্দ্রের বিপক্ষতা করেছেন। মহাত্মা গান্ধীকে গভীর ভাবে শ্রদ্ধা করলেও তাঁর সব কথা মেনে নেননি। কিন্তু সেই না-মানার মধ্যেও একটি শান্ত সহনশীলতা বজায় রেখেছেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা তাঁর ‘সত্যের আহ্বান’ আজও রবীন্দ্রনাথের সেই একলা ভাবরূপ মনে পড়ায়। আবার গান্ধীর দৈববাণীতে বিশ্বাসের বিপক্ষে বলেছেন, ‘যুক্তির পরিবর্তে উক্তি তো কোনোমতেই চলবে না। মানুষের মুখে যদি আমরা দৈববাণী শুনতে আরম্ভ করি তা হলে আমাদের দেশে, যে হাজার রকমের মারাত্মক উপসর্গ আছে এই দৈববাণী যে তারই মধ্যে অন্যতম এবং প্রবলতম হয়ে উঠবে।’
সেই মারাত্মক উপসর্গ আজ কি মারণ ব্যাধির আকার নিয়েছে? তাই আজ ২৫ বৈশাখে রবীন্দ্র আলোকে শুদ্ধির প্রয়োজন সমাজের।