রেবাউল মন্ডল, টিডিএন বাংলা: সালটা ২০০৩. রিহান তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। স্কুলে বরাবরই প্রথম সে। মা বাবার সাথে গ্রামবাসীদেরও গর্ব ওকে নিয়ে। উচ্চমাধ্যমিকে তখন পরীক্ষার সেন্টার পড়তো বাড়ি থেকে অনেকটাই দূরে। রিহানের বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তখন রাস্তার হালও ছিল খুব সঙ্গীন। ইয়া বড়ো বড়ো সব গর্ত। গোটা রাস্তায় পিচের লেশমাত্র নেই। বোল্ডার গুলো পিচমুক্ত হয়ে যেন দাঁত খিঁচিয়ে খিল খিল করছে। একবার এক ছাত্রছাত্রী বোঝাই বাস গর্তে পড়ে পাল্টি খায় আর কি!

এমন দুর্গম পথেই সাইকেল ঠেলে প্রায় দুঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হবে রিহানকে। বাল্য বন্ধুকে সঙ্গে না নিলে বিবেক, ফারহাদ, কিরণদেরও চলবেনা। প্রথমদিন বাংলা পরীক্ষা। তাও আবার দুটি পেপার। খুব টাফ। সাতটা বাজতে পাঁচ। সদর দরজায় বন্ধুদের হাঁক, “কই রে রিহান। এখনো হয়নি তোর!” জামার বোতামটা লাগাতে লাগাতে রিহান বলল, “বড্ড দেরি হয়ে গেলরে। আর পাঁচ মিনিট। ভেতরে আয় তোরা।”

সটান রিহানের রুমে ঢুকে বিবেক, ফারহাদ, কিরণদের কাতর অনুরোধ, “বন্ধু ভাই আমার! পরশু ইংরেজি। তুই-ই আমাদের একমাত্র ভরসা। আজ বাড়ি ফিরে তুই যদি কিছু ইম্পরট্যান্ট লেটার প্যারাগ্রাফ লিখে দিস তো খুব উপকার হয়। ঐ একদিনেই সব মুখস্ত করে নেব। নইলে তো বুঝতেই পারছিস  ডাহা ফেল!” “চিন্তা নেই। সব হয়ে যাবে। আমি আছি তো।” অভয় দিয়ে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে পড়লো রিহান। চঞ্চলতা ওর জন্মগত বৈশিষ্ট হলেও রিহান বরাবরই পরোপকারী। আর তার উপর আবার বন্ধু বলে কথা। রিহানের দেওয়া সাজেশন পড়ে সেবার ইংরেজি রাইটিংগুলি কমনও পেয়েছিল ওরা। পরীক্ষা শেষে সেদিন রিহানকে সেকি মিষ্টি খাওয়ানোর ধুম। এভাবে পরীক্ষায় ওদের  উপকার করতে পেরে অন্তকরণে কিযে নির্মল প্রশান্তি খুঁজে পায় তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারেনা রিহান।

বাবা বরাবরই নীরব পরিশ্রমী মানুষ। ছেলে-মেয়েরা মানুষ হবে এই স্বপ্নে খেয়ে না খেয়ে চাষের কাজে দিন রাত পড়ে থেকেছেন মাঠে। শুধু সন্তানরাই নয়, ছোট থেকেই ভাইদের কেউ বড় করেছেন এভাবেই। কোনদিনও খাবারটাও এগিয়ে দিতে বলেননি সন্তানদের। পরীক্ষার দিনগুলিতে ছেলের যাতায়াতের কষ্ট মেনে নিতে পারেননি বাবা। সকাল সাত টায় বেরিয়ে সেই সন্ধ্যা সাত টায় ঘরে ফেরা! তৃতীয় দিনে নিজেরই ছোট ভাইয়ের বাইকটা রিহানেরই সমবয়সী  প্রতিবেশী আবীরকে দিয়ে বললেন, “আজকের মত রিহানকে একটু নিয়ে যা না বাবা! খুব কষ্ট হচ্ছে ওর।”

ফার্স্ট হাফের পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। একটু ফ্রেশ হয়ে সাতসকালে বানানো মায়ের হাতের রুটি খাবে রিহান ও আবীর। এমন সময় রিহান যা দেখলো তাতে আর খাওয়া হল না তার। তপ্ত দুপুরে ছাতা মাথায় সাইকেলে ছুট্টে আসছেন বাবা। বাবার তো এখানে আসবার কথা নয়! এতক্ষন তো বাবা মাঠেই থাকেন! তবে কি কোন দুঃসংবাদ! এমনই হাজারো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে তখন রিহানের মনে।

কাছে এসে সাইকেলটা কোনরকমে দাঁড় করিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি যা বললেন শুনে এক অজানা ঝড় বয়ে গেল রিহানের সারা শরীর বয়ে। শ্রান্ত শুকনো মুখে বলে চলেছেন রিহানের বাবা, “আবীর, তুই শিগগিরি গাড়ি নিয়ে বাড়ি যা। তোর কাকীদের ধোপে আর টিকতে পারলাম না। আকাশ ভেঙে পড়ছে বাড়িতে। মার্চ মাস। ইয়ার এন্ডিং। পুলিশ নাকি এমাসেই খুব গাড়ি ধরে। একবার ধরলে নাকি আর ছাড়বে না! কেস হবে! আরো কত কি।” রিহানদের বাড়িতে ছোট থেকেই আসা-যাওয়া আবীরের। ও যেন ঐ বাড়িরই সদস্য। তাই বিষয়টি বুঝতে বেশি দেরি হয়নি। না খেয়েই ছুটলো আবীর।

দুফোঁটা জল ছাড়া বাকরুদ্ধ রিহানের মুখে সেদিন কোন ভাষা আসেনি। আজ সে প্রতিষ্ঠিত। প্রবাস জীবনে অফিসের খোলা জানালার বাইরে দূর শিমুল গাছটা থেকে ভেসে আসা বসন্তরানীর কুহুতান কলিগদের রঙিন মনে রোমাঞ্চের সঞ্চার করলেও পনেরো বছর আগে সেদিনের বাবার করুন অসহায় মুখচ্ছবি হৃদয় নিংড়িয়ে আজ নোনা বসন্তের দিনে রিহানের শান্ত চোখে যে রক্তজল এনে দিল অন্তরীক্ষ থেকে শুধু একজন ছাড়া তা সকলেরই অগোচরে রয়ে গেল।

গমাখালী, থানারপাড়া, নদীয়া