কারিমুল ইসলাম, টিডিএন বাংলা :

“করিম”! “ও করিম”!
পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে আসলো কানে। জানালার বাইরে নীল আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জল টলমল ঝাপসা চোখে বাসের গেটের দিকে চাইল করিম। প্রান্তিক ডাকছে। ওরা দু’জনেই বিধাননগর কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। করিম লক্ষ্য করল প্রান্তিকের ডাক কানে আসতেই সে চমকে উঠল। আরও অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার হল তার মনে কোথাও যেন একটা ভয় ভয় ভাব। কেন এমন হল?

এ ডাক সে অনেকবার শুনেছে। ওর হাসি মুখ অনেকবার দেখেছে। হৃৎপিণ্ডের লাবডাব শব্দকে ছাপিয়ে তার মন থেকে অতি ভয়ানক আওয়াজে একটি শব্দ তার কানে আসছে “গো-রক্ষক বাহিনী”।

প্রান্তিক হিন্দু। তবে ও তো গো পুজারী! গোরু ওদের মাতা! ওদের দেবী! আর আমি! আমি তো মুসলিম! ও কি আমাকে মারতে আসছে! আমি কি পালাবো! চোখ তুলে তাকালো। হ্যাঁ! কি সর্বনাশ! ও তো ভীড় ঠেলে এদিকেই আসছে। এক্ষুনি পালাতে হবে। ও কি চিৎকার করবে! পুলিশ ডাকবে! কিন্তু লাভ আছে কি? রক্তাক্ত আকবরকে তো চার ঘন্টা ফেলে রেখে মারলো পুলিশই! কি সর্বনাশ!
এবার কি আমার পালা! ভয়ে শিউরে উঠলো করিম।

কাঁধে একটা হাত দিয়ে ঝাঁকুনি দিল কে। চমকে উঠল করিম। থতমত খেয়ে চেয়ে দেখল প্রান্তিক ডাকছে।
কি হয়েছে তোর? শরীর খারাপ নাকি! জল খাবি? প্রান্তিক বলল। করিমের সারা মুখে একরাশ জিজ্ঞাসা। নিজেকে সামলে নিয়ে করিম প্রান্তিকের কাছে থেকে জল নিয়ে খেল। ধাতস্থ হয়ে ভাবতে চেষ্টা করল। কি হয়েছিল তার। বুঝল অতিরিক্ত চিন্তাই তার এই মানুষিক অস্থিরতার কারণ।

সকালে সোশাল মিডিয়া ও খবরের কাগজে করিম জেনেছে, রাজস্থানে আবার গো রক্ষকের হাতে প্রাণ গেছে দুধ ব্যাবসায়ী আকবরের। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে তার স্ত্রী, মা, বোন ও এতিম পাঁচটি বাচ্চার বুক ফাটা কান্নার চিত্র। নরম মনের করিমের মনটা কেঁদে উঠেছিল আকবরের দুই বছরের এতিম ছেলের কান্না দেখে। সে মায়ের কোলে বসে কাদঁছে! সে কি বুঝেছে তার আব্বার উপর ঘটে যাওয়া এ সন্ত্রাস! ও কি সমাজে আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের কাছে কাঁদতে কাঁদতে তার আব্বাকে ফিরিয়ে দিতে বলছে! নাকি সে বোঝেইনি তার আব্বা মারা গিয়েছে!

আকবরের দুই বছরের ছেলে সবেমাত্র আব্বা বলতে শিখেছে! আকবরের স্ত্রী বলল, “ও বলে গেল একটি দুধওয়ালা গরু কিনবে যাতে খোকারও দুধ হবে আবার দুধের ব্যবসাও হবে। কিন্তু ও আর ফিরলোনা, খোকা কারে আব্বা বলবে! খোকা কি খাবে! আমাদের আর কেউ নেই! … “আট সদস্যের পরিবারের ভার ছিল আকবরের ওপর, ও মারা যাওয়ায় পরিবারের কেউ নেই হাল ধরার। এতিম সন্তানরা পথে বসতে চলেছে। …” আর পড়তে পারেনি করিম। ডুকরে কেঁদে ওঠে ওর প্রানটা।

ক্ষতবিক্ষত মন নিয়ে কলেজের পথে বাসে প্রান্তিকের সঙ্গে দেখা। এতক্ষণ ও জানালা দিয়ে আকাশের দিকে এসবই ভাবছিলো। গো রক্ষক, বিজেপি, আরএসএস, আখলাক, আফরাজুল, জুনায়েদ, আসিফা, পেহলু খান, আকবর এরকম আরো শত শত নাম ও ঘটনা তার মাথায় কিলবিল করছিল। তাই হঠাৎ তার মাথাটা এমন করে উঠল।

এতক্ষণে পাশের ভদ্রলোকটি উঠে যাওয়ায়, প্রান্তিক করিমের পাশের সিটে বসল। করিমের কপালে হাত রেখে দেখল জ্বর আছে কি! কপাল একটু গরম কিন্তু জ্বর নয়। কিরে ছ্যাঁকা খেলি নাকি? বাড়িতে বকেছে? প্রান্তিক করিমকে একটু হেসে জিজ্ঞাসা করল। করিম ধিরে ধিরে প্রান্তিকের মুখের দিকে চাইলো।
হঠাৎ তার একটা কথা মনে পড়ল।

হ্যাঁ, সেইদিনের ঘটনা।
আরে তার পাশে বসা প্রান্তিক তো তার বন্ধু। আর ও যখন কলেজের চারতলার ফাঁকা রুমে নামাজ পড়ে তখন দরজায় দাঁড়িয়ে তাকে পাহারা দেয় যে ছেলেটা সে আর কেউ নয়, সে তার পাশে বসা ছেলেটা। হ্যাঁ, প্রান্তিক রয়। মুহূর্তেই সব ভয় কেটে গেল।
প্রান্তিক আর যাই হোক মুসলিম হওয়ার অপরাধে তাকে মারবেনা। কারণ সে হিন্দু হয়েও নামাজের সময় তার খেয়াল রাখে। সে বিজেপি আরআরএসএসের মতাদর্শের হিন্দু নয়। সে বিবেকানন্দ ও রামকৃষ্ণের মতাদর্শের হিন্দু। তাই তাকে ভরসা করা যায়।

করিম ঘুরে বসল প্রান্তিকের দিকে। স্বাভাবিক ভাবে বলল, “আরে কিছুনা! একটু দেশের কথা ভাবছিলাম।”
প্রান্তিক বলল, “হ্যাঁ, ঠিক ভাই ভাবনার সময় এসেছে! এই ভাবে মুসলিম বলে আকবরকে মারা উচিত নয়! আমি জানি তুই ওটাই ভাবছিস। দেখ ভাই তুই ভাবিস না যে আমাদের ধর্ম মানুষ মারতে বলে। ও শালারা! হিন্দু নামে কলঙ্ক! আমাদের মহান ধর্মকে কলঙ্কিত করছে। আমি ওদের হিন্দু বলে মানিনা। ”
“হম্ আমারও তাই মনে হয়।”
“আর মনে হয় ওরা সত্যি হিন্দু নয়। সব বিজেপির দালাল! আর ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট নেওয়ার ধান্ধা!”

“হমম হিন্দু রাষ্ট্র বানাবে! বিজেপি আরআরএসএস। তোরাতো সব আনন্দে থাকবি। আমাদের তো পাকিস্থানে যেতে বলছে।” করিম বলে চললো।
“আরে ধুর! ওসব পাগলের প্রলাপ! আমি সোজা কথা বুঝি ভাই হিন্দু রাষ্ট্র চাইলে নেপালে যাও আর মুসলিম রাষ্ট্র চাইলে পাকিস্থানে যাও।”
“হমম একদম ”
“খুনিদের ফাঁসি হওয়া উচিত”
“আরে ফাঁসি দেবে কি! মন্ত্রীরা তো ওদের ফুলের মালা পরাচ্ছেন, চাকরি দিচ্ছেন। ”
“হমম জানি কিন্তু অপরাধী সাজা পাবেই। এখানে ছাড়া পেলেও ভগবান ওদের ছাড়বে না।”
“হমম অবশ্যই আল্লাহ ওদের শাস্তি দেবেনই!” কথা বেড়ে যাচ্ছিল, বাসের অন্যান্য যাত্রীরা উৎসুক হয়ে চেয়েছিল তাদের দিকে। দুজনেই ব্যাপারটা লক্ষ্য করে কথা থামালো।

করিমের মনটা একটু শান্ত হল। প্রান্তিকের মত হিন্দু এখনও আছে ভারতে! যারা তাদের ভগবানের কাছে একজন মুসলিমের জন্য ন্যায্য বিচার চায়! যাদের কাছে গরু নয়, মানুষ মুল্যবান। মনে মনে নিজেকে যেন বোঝালো ভারত এখনও “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।” জানালা দিয়ে করিম বাইরের দিকে তাকায়। বাস ছুটে চলেছে হোমটাউনের ওভার ব্রিজের ওপর দিয়ে। করিম মনের অজান্তেই প্রান্তিকের হাতটা শক্ত করে ধরল। ভরসার হাত। এ হাত প্রকৃত ভারতীয়র হাত।
কন্ট্রাক্টর হেঁকে চললো
“নিউটাউন… নিউটাউন …”

কারিমুল ইসলাম