সমীরণ খাতুন: ইসলামি আদর্শে বড়ো হওয়া হাফেজ জুবায়ের সিদ্দিকী আধুনিক শিক্ষিত ন্যায়পরায়ণ দরদী মানুষ। হাফেজী পাশ করে নিজের গ্রাম থেকে পাঁচ কিমি দূরে বেলডাঙ্গায় একটি মসজিদে ইমামতীতে নিযুক্ত। একদিন বাসে যাওয়ার পথে জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই ফুটব্রিজের নীচে এক বৃদ্ধাকে দেখতে পেলেন। অসহায় সেই বৃদ্ধাকে দেখতে অবিকল তার মায়ের মতো। কেমন যেন মায়া পড়ে গেল তার প্রতি। ফেরার পথেও লক্ষ্য করলেন ঐ বৃদ্ধাটি একই অবস্থায় সেখানে পড়ে রয়েছেন। কাঁপছেন ঠান্ডায়। ঘরে ফিরলেন জুবায়ের। মনটা বড়ই বিষন্ন। মনে হাজারো প্রশ্নের জট। কে ঐ বৃদ্ধা? কেন ওখানে পড়ে আছেন? তবে কি কেউ নেই ওনার? উনি কি অনাহারে আছেন? ঘুমাতে পারলেন না সারারাত জুবায়ের!

পরদিন খুব ভোরে সেখানে উপস্থিত হলেন তিনি। নিজের পরনে চাদরটি জড়িয়ে দিলেন মহিলার গায়ে। তারপর জানতে চাইলেন তার পরিচয়। বৃদ্ধা ইশারায় জানালেন তিনি খুবই ক্ষুধার্ত।

জুবায়ের সাহেব ছুটতে লাগলেন খাবারের সন্ধানে। দেখলেন দূরে একটি চায়ের দোকান খোলা। চা, রুটি কিনে এনে বৃদ্ধাকে নিজে হাতে খাওয়ালেন। পানি পান করালেন। তারপর জানতে চাইলেন, “কে আপনি?” আড়ষ্ট কণ্ঠে বৃদ্ধা জানালেন, ওনার নাম সুমতিবালা রায়। স্বামী অনেক আগেই গত হয়েছেন। একমাত্র পুত্র অনিমেষ ব্যাঙ্কে চাকরি করে। বাড়ি নদীয়ার কুলতলি গ্রামে। জুবায়ের সাহেব বললেন, তাহলে এখানে এলেন কিভাবে?

বৃদ্ধার কাতর জবাব, বউমা রোজ ঘরে অশান্তি করে ছেলেকে বলতো, “হয় তোমার মা নইলে আমি, দুজনের একজন থাকবো এই বাড়িতে।” জানিনা বাবা কি ছিল আমার অপরাধ? আমি তো শুধু পেটে দুটো খেতাম আর ঠাকুরঘরে পড়ে থাকতাম। তাও বৌমার বড়ো বোঝা হয়ে গেলাম। গত পরশুদিন ছেলে আমাকে ডাক্তার দেখানোর নাম করে এখানে বসিয়ে বললো, “মা, একটু বসো আমি এখুনি আসছি।” তারপর আর ফেরেনি। চার বছরের নাতিটা বড়ো ভালোবাসতো আমাকে। এই বলে কাঁদতে লাগলেন বুড়ি।

সাদা পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল খানি বের করে জুবায়ের বৃদ্ধার অশ্রু মুছিয়ে দিয়ে বললেন, “কাঁদবেন না মা, আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেবো। আর আপনার যদি আপত্তি না থাকে তো প্রয়োজনে আমার ঘরে আপনাকে মায়ের সম্মানে রাখবো।” বৃদ্ধা বললেন, “তুমি কে জানিনা বাবা। তুমি শুধু আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও। স্বামীর ভিটেমাটিতে নাতি বিট্টুর কাছেই শেষ জীবনটা কাটাতে চাই।” জুবায়ের বললেন, “ঠিক আছে। আমি আসছি। আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। অপেক্ষা করুন এখানেই।”

দুপুরবেলা তিনি গ্রামের ছেলে হানিফের অটোরিকশা আর নিজের ঘরে তৈরি খাবার টিফিনে নিয়ে ফিরে এলেন। বৃদ্ধাকে নিজের হাতে খাওয়াচ্ছিলেন। এমন সময় এলাকার কিছু যুবক এসে উপস্থিত সেখানে। কিছু বুঝে ওঠার আগে এক যুবক বললো, “দেখে বোঝা যাচ্ছে ও মুসলমান। ওর উদ্দেশ্য ভালো দেখছিনা। বৃদ্ধাকে একা পেয়ে সুযোগ নিচ্ছে। হয়ত অঙ্গ পাচারকারী। বৃদ্ধাকে ভুলিয়ে, ভালোমানুষি দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে সব বিক্রি করবে।” হৈ চৈ শুনে অনেক লোক জড়ো হলো। ভিড়ের মাঝে হঠাৎ একজন গলা উঁচিয়ে বলে উঠলো, “মার শালাকে।”

নিরুপায় জুবায়ের হাতজোড় করে কাতর মিনতির সুরে বললেন, “আমার কথাটি একবার শুনুন আপনারা। তারপর যদি অপরাধী মনে হয় যা শাস্তি দেওয়ার দেবেন।” কিন্তু কোন কথা না শুনে হৈ হৈ করে তেড়ে এলো অনেকে। লাঠি, জুতো, বাঁশ হাতের কাছে যে যা পেল তাই দিয়ে পেটাতে লাগলো জুবায়েরকে। বেগতিক দেখে পালিয়ে গেল হানিফ। কেউ কেউ মোবাইলে এই ঘটনা ভিডিও করতে লাগলো। উত্তেজিত জনতা সরে গেলে দেখা গেল জুবায়ের সাহেবের রক্তাক্ত শরীর। নাক, মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে, রক্তে রঞ্জিত পরনের সাদা পাঞ্জাবীখানি। যেন একটা সাদা পায়রা শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী ছড়াতে এসেছিলো। আপন স্বার্থ চরিতার্থ করতে একদল বাজ, চিল, শকুন তাকে ছিঁড়ে খেল, রক্তাক্ত করলো।

ঘটনাস্থলে পৌঁছালো পুলিশ। জুবায়ের সাহেবের পকেট হাতড়ে পাওয়া গেল একটি চিরকুট। তাতে লেখা বৃদ্ধার বাড়ির ঠিকানা-

সুমতিবালা রায়,

পুত্র -অনিমেষ রায় (ব্যাঙ্ক কর্মী)

গ্রাম-কুলতলি,

জেলা-নদীয়া।

ইতিমধ্যে পুলিশকে দেখে হানিফ কিছুটা সাহস করে এগিয়ে এসে বললো, “স্যার! যে মানুষটিকে মারা হয়েছে ওনার নাম জুবায়ের সিদ্দিকী, আমরা একই গ্রামের লোক। খুব জনদরদী মানুষ উনি। সকলের সাহায্যে উজাড় করে দিতেন সর্বদা নিজেকে। আমি অটোরিকশা চালাই বাবু। দূরে বৃদ্ধাকে দেখিয়ে বললো, ওনাকে তার ছেলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছিলেন জুবায়ের সাহেব।

পুলিশি উদ্দ্যোগে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার পথে মৃত্যু হল জুবায়েরের। ভেসে গেল তার সাজানো সোনার সংসার। অকালে এতিম হল দুটি শিশু সন্তান! বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমি আবার সন্তান হারা হলাম।”

পরদিন পুলিশ হানিফকে ডেকে পাঠায় থানায়। বড়োবাবু হানিফকে বলেন, “তুই গরীব মানুষ, এসবের মাঝে থাকিসনা। আমরা তদন্তে জানতে পেরেছি জুবায়ের সিদ্দিকীর পাকিস্তানের আতঙ্কবাদীদের সাথে যোগাযোগ ছিল।” হানিফ আঁতকে উঠল, “ওকথা বলবেন না বাবু! মহাপাপ হবে। ওমন ভালো মানুষ আমাদের গ্রামে দ্বিতীয়টি নেই।” বড়োবাবু ধমক দিয়ে বললো, চোপ শালা! একদম চুপ! বেশি সত্যবাদী হওয়ার চেষ্টা করলে তোকেও পেদিয়ে লকাপে ভরে দেব। উপর মহলের আদেশ! তোর লাশটাকেও কেউ খুঁজে পাবেনা।