—কী রে, কিছু হয়েছে?
—নাহ্!
—তা হলে এমন গুম মেরে বসে আছিস যে?
—এমনি!
—এমনি এমনি তো লোকে হরলিকস খায়। তুই কী খাচ্ছিস? ল্যাদ না হ্যাল?
—ছাড় না!
—যা বাব্বা! তার মানে বলবি না। তাই তো?
—আচ্ছা, তুই স্বপ্ন দেখিস?
—হ্যাঁ…
—কী দেখিস?
—বস চাকরি খেয়ে নেবে বলে শাসাচ্ছে, বৌ ঝাড় দিচ্ছে, বন্ধুরা ইয়েতে লাগছে, মাল খেয়ে পথ হারাচ্ছি, রুমাল খুঁজে পাচ্ছি না…আরও কত কী!
—এগুলো স্বপ্নে দেখিস?
—হ্যাঁ রে, শালা স্বপ্নেও মাইরি কম চাপ নাকি!
—আচ্ছা, স্বপ্নে কখনও বকুল ফুলের গন্ধ পেয়েছিস? কিংবা  কাকভোরে শিউলি…
—ইয়ে…মানে, তুই কি কিছু টেনেছিস?
—জানিস, তুই আর আমি কাল একসঙ্গে অনেক হেঁটেছি।
—ক্কী! কাল? কাল তো তোর সঙ্গে দেখাই হয়নি।
—জায়গাটা চিনি না। কিন্তু মাইলের পর মাইল জুড়ে ফুলের বাগান। রংবেরঙের কত ফুল। পায়ের তলায় তুলতুলে ঘাস। তুই বললি, ‘জুতো খুলে হাঁটতে ভাল লাগবে।’ উপরে শরতের নির্মেঘ আকাশ। নীচে আমরা দু’জনে খালি পায়ে হাঁটছি…
—থামিস না, হেঁটে যা…
—হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূরে চলে গেলাম। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম পায়ের নীচে বালি। সামনে একটা নদী। দু’পাড়ে গাছগাছালি। পাখি ডাকছে। ঘুঘু ছাড়া অন্য কোনও পাখির ডাক চিনতে পারলাম না।

—উফ্, শেষে ঘুঘু! আচ্ছা, ফাঁদ ছিল না?
—না রে, জালও ছিল না, ফাঁদও না।
—তা হলে এমন জালি কথা ছেড়ে কাজের কথায় আয়। সকাল থেকে কতগুলো মেসেজ, হোয়াটস-অ্যাপ করেছি। দেখিসনি কেন? ফেসবুকেও অফলাইন। কী ব্যাপার?
— আমার তো মোবাইল নেই।
—মানে?
—কাল বিকেলে ইন্টারনেট, ফেসবুক, অজস্র অ্যাপ-সহ আস্ত মোবাইলটা কমোডে ফেলে দিয়েছি।
— অ্যাঁ!
—হ্যাঁ, রে। তোদের বাড়ির সামনে সেই ডাকবাক্সটা এখনও আছে?
—কেন?
—চিঠি লিখব। তুইও লিখিস।
—ইয়ে… মানে…তুই কি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিস?
—অনেক দিন হল।
—মাসিমা জানেন?
—না। আমি ছাড়া আর কেউই জানে না। এইমাত্র তুই জানলি।
—ব্যাপারটা কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
—কেন?
—ওষুধ না খেলে সমস্যাটা আবার বাড়বে। তুই ফের অসুস্থ হয়ে পড়বি!
—আচ্ছা, একটা কথা বল তো, কোনটাকে তোরা সুস্থ থাকা বলিস?
—তুই কিন্তু ফালতু তর্ক করছিস…
—একেবারেই না। এই যে তুই ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকিস, মিনিটে মিনিটে স্টেটাস বদলাস, পটি করতে গিয়েও সেলফি মাড়াস,—এটা সুস্থতা? এর পর তো গভীর রাতে বুকে হাঁটার ভিডিও পোস্টিয়েও লিখবি—‘মাইলস টু গো…’


—কী পাগলামো করছিস?
—ভেবে দ্যাখ, পাগলামিটা কে করছে?
—সারাটা পথ একসঙ্গে এলাম। কিন্তু সত্যিই কি একসঙ্গে এলাম? আমি দেখলাম ভেসে যাওয়া মেঘ, জানলা দিয়ে রাস্তার ছুটে চলা, গাড়ির কাচের ওপারে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার বিষণ্ণ চোখ, চালকের মনকেমন দৃষ্টি। ওয়াইপার মুছিয়ে দিল বৃষ্টিকুচি। আমার দু’গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনতা অ্যাসিড। তুই এ সব কিচ্ছু দেখলি না। অবশ্য তোর দেখেই বা কী হবে? তোর জন্য অপেক্ষায় থাকে হাজার হাজার চোখ। অপেক্ষায় থাকে আরও কয়েক হাজার আঙুল। কেউ কাউকে চিনিস না, জানিস না। অথচ সেই ভার্চুয়াল জগতে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকিস। উপোসি স্ক্রিনে টাচ না করলে যেন পৃথিবীটা ঘুরতে ভুলে যাবে। চাঁদ সিএল নেবে বেশ কয়েকটা দিন।
—তোর ব্যাগে কি ওষুধটা আছে?
—আমি অবাক হয়ে যাই, তোর দু’হাতের আঙুলগুলো দেখে। কী অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় তুই লিখতে পারিস। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে খাপে খাপ ইমোজি, স্টিকার…কী করে পারিস রে?
—শোন না, চল আজ ফিরে যাই।
—সত্যি বলছিস?
—হ্যাঁ…মানে আমি বাড়ি…
—কী আনাড়ি!
—মানে?
—সত্যি ফিরতে পারবি? বাড়ি নয়, শিকড়ে… সেই যেখান থেকে আমরা শুরু করেছিলাম।
—কী বলছিস, তা আবার হয় নাকি?
—কেন হয় না, চাইলেই হয়। রাত জেগে আমরা চিঠি লিখব। চিঠিতে মাখানো থাকবে আমাদের প্রিয় সুগন্ধী। পড়ন্ত বিকেলে একলা ছাদে আলতো করে খুলব রঙিন খাম। টেলিফোন নয়, মোবাইল নয়, মেল নয়, হোয়াটসঅ্যাপ নয়, নিত্যনতুন রংধনু বিস্ময় অপেক্ষা করবে আমাদের জন্য।
—নৌকায় উঠবি?
—হ্যাঁ।
—দাঁড়া, তার আগে মোবাইলটা ছুড়ে ফেলি।
—নৌকাটা এমন দুলছে কেন?
—ভয় করছে?
—না…
—ভয় পাস না, আসলে মোবাইল থেকে অজস্র তরঙ্গ জলের নীচে ছুটছে। এ তারই কাঁপুনি।
—কিন্তু আমি তো জলতরঙ্গ শুনছি।
—শুনবিই তো।
—কিন্তু তোর স্বপ্নের কথা আগে শেষ কর।
—না, এ বার থেকে আমরা যৌথস্বপ্ন দেখব।
—সে আবার হয় নাকি?
—হয়। নৌকার দড়িটা খুলে দে।
—মাঝি?
—দরকার নেই। এ বার আকাশের দিকে তাকা।
—না।
—কেন?
—আকাশের দিকে তাকালেই কষ্ট হয়। বাবার কথা মনে পড়ে।
—পড়ুক। তবুও তাকা।
— ওই সেই সপ্তর্ষিমণ্ডল…
—বাবা চিনিয়েছিল?
—হ্যাঁ!
—আর তারাখসা…
—খুব ঘুম পাচ্ছে রে…
—ঘুমিয়ে পড়…আমরা সেই নদীটার একেবারে কাছে চলে এসেছি। ঘুঘুর ডাক শুনতে পাচ্ছিস?

গৌরব বিশ্বাসের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া।