সমীরণ খাতুন, টিডিএন বাংলা: বছর পঞ্চাশের এক ভদ্রলোক ‘ট্যাক্সি’ ‘এই ট্যাক্সি’ বলে আওয়াজ দিতেই, সামনে এসে দাঁড়ালো একটি ট্যাক্সি। যার চালক ছিল মাথায় টুপি দাড়িওয়ালা বছর পঁচিশের এক যুবক। গাড়িতে উঠেই ভদ্রলোক বললেন, বড়োবাজার থানা চলো। তারপর জানতে চাইলেন, ট্যাক্সি চালকের নাম? ড্রাইভার বিনীত ভাবে জানাল আমার নাম মহঃ ইজাজ আহমেদ। ভদ্রলোক তাচ্ছিল্য করে বললেন, ও মুসলমান! তারপর ভদ্রলোলোকের মোবাইলটা বেজে উঠলো। উনি কলটি রিসিভ করে বললেন, ভবানীপ্রসাদ যোশী স্পিকিং। জি আজ পেমেন্ট পেয়ে যাবেন। বারোটা নাগাদ আসুন। যথাস্থানে বড়োবাজার থানায় নেমে পড়লেন ভদ্রলোক। ফোনে কথা বলতে বলতেই তিনি ট্যাক্সির বিল মিটিয়ে চলে গেলেন।

ইজাজও এগিয়ে চললো। কিছুদূর যাওয়ার পর এক প্যাসেঞ্জার হাত দেখাতেই ইজাজ গাড়ি দাঁড় করালো। তারপর পিছনের গেট খুলতে গিয়ে দেখলো একটা পিছনের সিটে একটি ব্রিফকেস পড়ে আছে। সেটা খুলতেই দেখা গেল তাতে দশ লক্ষ টাকা। ইজাজ বুঝলো ওটা ওই বড়োলোক ব্যবসায়ীর টাকা। তখনই সে সিদ্ধান্ত নিলো যে করেই হোক টাকাটা ওনাকে পৌঁছে দিতে হবে। তারপর ট্যাক্সি ঘুরিয়ে সোজা চলে এলো বড়োবাজার থানায় যেখানে ভদ্রলোক নেমেছিলেন। তারপর কয়েকজনকে লোকটির বর্ণনা  দিয়ে তার খোঁজ করলেন ইজাজ। সকলে নাম জানতে চাইলেন।

তিনি ফোনে নামটি বলেছিলেন কি যেন? মনে পড়ে যায় ইজাজের। ভবাবীপ্রসাদ যোশী। নাম বলতেই একজন বললেন আরে যমুনালাল বাজারের সবচেয়ে বড়ো কাপড়ের মিলের মালিক উনি। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখুন, সামনেই ‘সঞ্জয় সেলস’। ধন্যবাদ জানিয়ে ইজাজ এগিয়ে গেল। খুব সহজেই অফিসটি খুঁজে পেল ইজাজ। ভবানীবাবু ইজাজকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে একটু কড়া মেজাজে বললেন, কি চাই এখানে? ইজাজ শান্ত স্বরে ব্রিফকেস এগিয়ে দিয়ে জবাব দিলো, বাবু আপনার ব্রিফকেস! হতবাক হয়ে ভবানীবাবু সেটি হাতে নিয়ে খুলে দেখলেন। একটি টাকাও নড়চড় হয়নি। তিনি বললেন, ইজাজ বসো। তোমাকে যে কি বলে সুকরিয়া জানাবো? তুমি জানো কি আছে এটাতে?

ইজাজ বললো, জানি বাবু, টাকা আছে। ধন্যবাদ আমাকে নয়! আল্লাহকে জানান। আমি তো শুধু কর্তব্য পালন করেছি মাত্র।

তুমি জানা সত্ত্বেও আমাকে এটা ফিরত দিলে? এটা কি করে সম্ভব? তোমাকে তো দেখে মনে হয় শিক্ষিত। কতটা লেখাপড়া জানো? ইজাজ বললো, লেখাপড়া জেনে কি হবে বাবু! গ্রাজুয়েট কমপ্লিট করেছি,তবে চাকরি হবে কি করে? আমি তো পাঁচ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে পারবো না।

ভবানীবাবু বললেন, বেশ! বুঝলাম। আমি তোমাকে খুশী করে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিচ্ছি ব্যবসা করো। ইজাজ কোমল ভাবে বললো, ক্ষমা করবেন বাবু! টাকা আমি নিতে পারবো না। মা শুনলে খুব রাগ করবেন। মা বলেন, কাউকে উপকার করতে হয় নিঃস্বার্থভাবে। সৎ পথে স্বল্প উপার্জনে অনেক খুশীতে থাকা যায় বাবু। মনের শান্তিটাই আসল।

ভবানীবাবু মনে মনে বলতে লাগলেন, আরে হিন্দুত্ববাদীরা থেকে মিডিয়া সকলে বলে মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী, অশিক্ষিত!  এতো দেখি বিপরীত। মুখে বললেন, তুমি কার আদর্শ মেনে চলো ইজাজ? তোমাকে দেখে তো আমার মুসলিমদের সম্পর্কে ধারণাটাই বদলে গেলো। ইজাজ বললো, আমি সর্বকালের সেরা মহাপুরুষ  হযরত মহম্মদ (সাঃ) আদর্শ মেনে চলি। আসি বাবু আমাকে যেতে হবে। ভবানীবাবু বললেন বেশ, তবে ভালো থেকো প্রার্থনা করি। আমি ওই মহাপুরুষের জীবনী পড়বো, পড়তেই হবে আমাকে। ইজাজ! আজ সকলে যদি তোমার মতো হতো তাহলে পৃথিবীতেই স্বর্গ নেমে আসতো। আজ থেকে মুসলিমদের সম্পর্কে আমার ধারণার পরিবর্তন হলো।