টিডিএন বাংলা ডেস্ক : “কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥” অনুবাদ: শরীরের গাছে পাঁচখানি ডাল–চঞ্চল মনে ঢুকে পড়ে কাল। -এটাই ছিল আজ থেকে কমপক্ষে এক হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা।

এটা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম, এবং বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদের অংশ। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের এই একটাই নিদর্শন পাওয়া গেছে; তবে তার মানে এই নয়, সে যুগে বাংলায় আর কিছু লেখা হয়নি। হয়তো লেখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষিত হয়নি। একবারও কি জানতে ইচ্ছা করে না কে ইতিহাসের ধুলোমাখা অতীত থেকে আবার আবিষ্কার করেছিলেন এই চর্যাপদ? তাঁর নাম মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। আজ তাঁরই জন্মদিন।

বাংলা ভাষাবিদ ও গবেষক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৫৩ সালের আজকের দিনে ৬ ডিসেম্বর তারিখে বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনার নৈহাটিতে জন্মগ্রহণ করেন। ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি ভারততত্ত্ববিদ, সংস্কৃত বিশারদ, সংরক্ষণবিদ ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা। তাঁর আসল নাম ছিল হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কর্তা। তিনি সন্ধ্যাকর নন্দীরচিত রামচরিতম্ বা রামচরিতমানস পুঁথির সংগ্রাহক।

তাঁর পিতার নাম পিতার নাম রামকমল ন্যায়রত্ন। ১৮৬৬ সালে গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং সংস্কৃত কলেজে প্রবেশ করেন। ১৮৭১ সালে নানারকম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে এন্ট্রান্স পাশ করেন। ১৮৭৩ সালে এফ.এ পাশ করেন।

১৮৭৬ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। বি.এ পরীক্ষায় তিনি ৮ম স্থান অধিকার করেছিলেন। ‘ভারত মহিলা’ প্রবন্ধ রচনা করে হোলকার পুরস্কার পান। ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হলে বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। কলকাতায় তিনি তাঁর বড়দা নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চুর বন্ধু তথা বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে থাকতেন। ১৮৭৭ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে এম.এ পরীক্ষায় একমাত্র তিনিই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ‘শাস্ত্রী’ উপাধি পান। ১৮৭৮ সালের মার্চ মাসে বিবাহ করেন।

১৮৭৮ সালে কর্মজীবনের সুচনায় কলিকাতা হেয়ার স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ক্রমে লক্ষ্ণো ক্যানিং কলেজ, কলিকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলিকাতা সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।

পুরাতন পুঁথি সংগ্রহের মাধ্যমে চর্যাপদ গবেষণা করে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনত্বকে প্রমাণিত করেন। ‘গোপাল তাপনি’ উপনিষদের ইংরেজী অনুবাদে তিনি রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সহযোগী ছিলেন। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ গ্রন্থ রচনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত লেখা থেকে পাঠোদ্ধার এবং পুঁথি আবিষ্কার ও টীকা রচনা করে ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিশেষ অবদান রাখেন। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মৃত্যুর পর এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক সংস্কৃত পুঁথিসংগ্রহের কাজে অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এই কাজে তিনি নেপাল. তিব্বত ভ্রমণ করেন।

রচনাসমগ্র : ১৯১৬ সালে চর্যাপদের পুঁথি নিয়ে রচিত তাঁর গবেষণাপত্র হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোঁহা নামে প্রকাশিত হয়। হরপ্রসাদ অনেক প্রাচীন গ্রন্থ সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বহু গবেষণাপত্রও রচনা করেন। তিনি ছিলেন এক খ্যাতনামা হিস্টোরিওগ্রাফার। স্বীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছিলেন বহু পুরস্কার ও সম্মান। তাঁর বিখ্যাত বইগুলি হল বাল্মীকির জয়, মেঘদূত ব্যাখ্যা, বেণের মেয়ে  (উপন্যাস), কাঞ্চনমালা(উপন্যাস), সচিত্র রামায়ণ, প্রাচীন বাংলার গৌরব ও বৌদ্ধধর্ম। তাঁর উল্লেখযোগ্য ইংরেজি রচনাগুলি হল মগধান লিটারেচার, সংস্কৃত কালচার ইন মডার্ন ইন্ডিয়াও ডিসকভারি অফ লিভিং বুদ্ধিজম ইন বেঙ্গল।

বাংলা ভাষাবিদ ও গবেষক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মৃত্যু হয় ১৯৩১ সালের ১৭ নভেম্বর।