টিডিএন বাংলা:

লেখক: সায়েদ আবুল আলা মওদূদী(র:)

মৌলিক মানবাধিকারের অর্থ

মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব। তার জাতিগত প্রকৃতিই তাকে স্বজাতির সাথে মিলেমিশে একত্রে বসবাসে বাধ্য করে। সে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্য্ন্ত অসংখ্য ব্যক্তির সেবা, মনোনিবেশ, সাহায্য ও আশ্রয়ের মুখাপেক্ষী। শুধু নিজের লালন-পালন, অন্ন, বাসস্থান, পোশাক পরিচ্ছদ ও শিক্ষা দীক্ষার প্রয়োজনেই নয়, বরং নিজের প্রকৃতিগত যোগ্যতার লালনও ক্রমবিকাশ এবং তার বাস্তব প্রকাশের জন্যও সে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করতে বাধ্য। যে সামাজিক সম্পর্ক তার চারপাশে সম্পর্ক ও বন্ধনের একটি প্রশস্ত ও দীর্ঘ শৃঙ্খল তৈরী করে তা পরিবার, বংশ, পাড়া, শহর, দেশ এবং সামগ্রিকভাবে গোটা মানব গোষ্ঠী পর্য্ন্ত বিস্তৃত সম্পর্কের এই ছোটবড় পরিসরে তার অধিকার ও দায়িত্বও নির্ধারণ করে। মা-বাবা-সন্তান, ছাত্র-শিক্ষক, শাসক-কর্মচারী, ক্রেতা-বিক্রেতা, রাজা-প্রজার অসংখ্য পর্যায়ে তার উপর কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয় এবং এর বিপরীতে সে কিছু নির্দিষ্ট অধিকার প্রাপ্ত হয়।
এসব অধিকারের মধ্যে কতগুলো শুধু নৈতিক প্রকৃতির। যেমন বড়দের প্রাপ্য সম্মান, ছোটোদের প্রাপ্য আদর-স্নেহ, অসহায়ের অধিকার সাহায্যপ্রাপ্তি, মেহমানের অধিকার আপ্যায়নলাভ ইত্যাদি। আর কতগুলো আইনগত প্রকৃতির। যেমন মালিকানার অধিকার, মজুরীপ্রাপ্তির অধিকার, মোহরপ্রাপ্তির অধিকার, প্রতিশোধ ও প্রতিদানের অধিকার ইত্যাদি। এগুলো এমন অধিকার যার সাথে কোনো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে এবং দেশের আইনও এই স্বার্থ স্বীকার করে নিয়ে বিচার বিভাগের মাধ্যমে তা অর্জনের ব্যবস্থা করে দেয়। এগুলোকে আইনগত অধিকার(Legal Rights) অথবা ইতিবাচক অধিকার(Positive Rights) বলা হয়। ব্যক্তির অধিকারের আরেকটি পরিমন্ডল সরকারের সাথে সম্পর্কিত। এই পরিমন্ডলে ব্যাপক ক্ষমতা ও বিস্তৃত উপায়-উপকরণের অধিকারী সরকারের বিপরীত ব্যক্তিকে যে সকল অধিকার দেওয়া হয় তাকে আমরা মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) বলি। এসব অধিকারের জন্য মৌলিক মানবাধিকার(Basic Human Rights) এবং মানুষের জন্মগত অধিকার(Birth Rights of Man) পরিভাষাসমূহও ব্যবহৃত হয়। এসব অধিকারের গ্যারান্টি দেশের সাধারণ আইনের পরিবর্তে সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে ব্যবহৃত হয়। এগুলোকে মৌলিক অধিকার এজন্য বলা হয় যে, রাষেট্রর কোনো শাখাই তা প্রশাসনিক হোক বা আইন পরিষদ-এর বিরুদ্ধাচরণ করতে পারেনা। এই অধিকার কোনো ব্যক্তি নাগরিক হিসেবে নয়, বরং বিশ্ব মানবগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে লাভ করে থাকে। এগুলো বর্ণ, গোত্র, এলাকা, ভাষা এবং অন্যান্য সকল প্রকারের স্বাতন্ত্র্যের উর্ধে্ব এবং মানুষ কেবল মানুষ হওয়ার কারণে তা লাভ করে। এটা কোনো সরকারের মঞ্জুরীকৃত বা চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট নয় বরং মানুষ প্রকৃতিগতভাবে লাভ করেছে এবং তা তার অস্তিত্বের অপরিহার্য্ অংশ। কোনো রাষ্ট্র তা স্বীকার করে নিতে বা বাস্তবায়ন করা হতে পশ্চাদপদ হলে তাকে প্রকৃতিপদত্ত অধিকারসমূহ আত্মসাৎ করার অভিযোগে অপরাধী মনে করা হয়। কারণ এসব অধিকার অবিচ্ছেদ্য ও অপরিবর্তনীয়। সরকারের তা বাতিল করার তো প্রশ্নই আসেনা, তাতে সংশোধন, সীমিতকরণ অথবা কোনো ওজরবশত তা সাময়িকভাবে স্থগিত করারও অধিকার তার নেই। অবশ্য স্বয়ং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী অর্থাৎ জনগণ তাকে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট সীমা ও শর্তের অধীনে এই এখতিয়ার দিলে তা স্বতন্ত্র কথা। এই সুযোগও কেবল পাশ্চাত্যের সংবিধানসমূহে রাখা হয়েছে। ইসলামী সংবিধান কোনো ব্যক্তি, সংস্থা, বরং সামগ্রিকভাবে গোটা উম্মাহকেও এই ক্ষমতা দেয়নি যে, সে মৌলিক অধিকারসমূহকে কোনো অবস্থায় রহিত, সীমিত বা স্থগিত করতে পারে।
ইউরোপে মৌলিক অধিকার পরিভাষা চালু হয়েছে তিনশো সাড়ে তিনশো বছরের বেশি হয়নি। এটা মূলত প্রকৃতিগত অধিকারসমূহের সেই প্রাচীন মতবাদেরই অপর নাম যার সর্বপ্রথম গ্রীক চিন্তাবিদ জেনো পেশ করেছিলেন। এরপর রোমের বিখ্যাত আইনবিদ সিসেরো আইনের ও সংবিধানের ভাষায় তা আরো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। ফ্রিডম্যান বলেন, “ একজন নাগরিকের সুনির্দিষ্ট অধিকারসমূহের উপর ভিত্তিশীল সমাজের ধারণা তুলনামূলকভাবে আধুনিক ধারণা যা প্রথমত মধ্যযুগের সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং দ্বিতীয়ত সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের আধুনিক রাষ্ট্রের একনায়কতন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ উথ্থিত হয়েছে। এর সুস্পষ্ট প্রকাশ Locke এর ফ্রান্সের আইন দর্শনের মানবাধিকার ঘোষণায় এবং আমেরিকার সংবিধানে হয়েছে।”(W. Friedmann, “Legal Theory”, Sterers Saw, London 1967, P 392).
গায়েয ইযিজিওফোর মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন, “মানবীয় অথবা মৌলিক অধিকার হলো সেইসব অধিকারের আধুনিক নাম যাকে ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার বলা হয় এবং তার সংজ্ঞা এই হতে পারে যে, সেইসব নৈতিক অধিকার যা প্রত্যেক ব্যক্তি প্রতিটি স্থানে এবং সার্বক্ষণিকভাবে এই কারণে পেয়ে থাকে যে, সে অন্যান্য সকল সৃষ্টির তুলনায় বোধশক্তি সম্পন্ন ও নৈতিক গুণাবলীর অধিকারী হওয়ায় উত্তম ও উন্নত। ন্যায়বিচারকে পদদলিত করা ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তিকে এসব অধিকার হতে বঞ্চিত করা যায়না।(Gaiues Ezejiofor, Protection of Human Rights under the Law, Butterworths, London 1964, p.3)।
মৌলিক অধিকারের ধরন ও বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করতে গিয়ে বিচারপতি জ্যাকসন বলেন, “কোনো ব্যক্তির জীবন, মালিকানার স্বাধীনতা, বক্তৃতা বিবৃতি ও লেখনীর স্বাধীনতা, ইবাদত-বন্দেগী ও সমাবেশের স্বাধীনতা এবং অনুরূপ অন্যান্য অধিকার জনমত যাচাইয়ের জন্য দেয়া যায়না। তার নির্ভরযোগ্যতা নির্বাচনসমূহের ফলাফলের উপর কখনও ভিত্তিশীল নয়। (A.K. Brohoi, Quotation in United Nations and Human Rights, Karachi 1968, P 313).
মৌলিক অধিকারের ধারণার মূলত দুটি দিক রয়েছে। এর একটি দিক নৈতিক যার ভিত্তিতে সমাজে মানুষের একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থান থাকা উচিত। সে মানুষ হিসেবে সম্মানের পাত্র এবং সমাজের অন্যান্য লোকের মত তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সরকারের জন্যও অপরিহার্য্। যে ব্যক্তিই কোনো কর্তৃত্ববলে তার সাথে ব্যবহার করে তার একথা ভুললে চলবেনা যে, সে একজন মানুষ এবং মানবীয় সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে সে কেবলমাত্র কোনো ক্ষমতাবলে অথবা পদাধিকারবলে অন্যদের তুলনায় বিশেষ কোনো মর্যাদার অধিকারী নয়। মৌলিক অধিকারের দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে আইনগত। তদনুযায়ী এসব অধিকার আইনগতভাবে স্বীকার করে নেয়া উচিত এবং দেশের উচ্চতর আইনে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। বাস্তবে তা বলবৎ করার ক্ষেত্রে এর তিনটি দিক রয়েছে।
১. মৌলিক অধিকারসমূহ মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতি দেয় এবং আইনগত ও প্রশাসনিক কার্য্ক্রমের জন্য পথ প্রদর্শনের নীতিমালা সরবরাহ করে।
২. এসব অধিকার মানুষকে জুলুম অত্যাচার ও শক্তি প্রয়োগের কবল হতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। অধিকারের অলংঘনীয় সীমারেখা তাকে আইনগত, প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ হতে রক্ষা করে। কারণ এসব অধিকারের ক্ষেত্রে আইনের জন্য সুস্পষ্ট ধারাসমূহ সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।
৩. মৌলিক অধিকারসমূহ এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব দান করে যা অন্যান্য সকল ব্যক্তির ও শাসকগোষ্ঠীর মোকাবিলায় এসব অধিকার বাস্তবায়নের গ্যারান্টি দান করে, অর্থাৎ বিচার বিভাগ।
দেশের আইন ব্যবস্থায় মৌলিক অন্তর্ভুক্তির উদ্দেশ্য হলো-রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার গন্ডি নির্দিষ্ট করা এবং তাকে বিচার বিভাগের সাহায্যে আইনগত সীমারেখা ও রক্ষাকবচসমূহের অনুগত বানানো, যাতে শাসক শ্রেণী নাগরিকদের মৌলিক অধিকারসমূহ আত্মসাৎ করে একনায়কত্বের পথ অবলম্বন করতে না পারে। এসব অধিকার দাবীর আসল অভিপ্রায় হলো-মানুষের সম্মান, মর্যাদা ও গাম্ভীর্য্ কে একনায়কতন্ত্র, নির্মম স্বৈরতন্ত্র, নির্মম সাম্যবাদের প্রভাব হতে হেফাজতের ব্যবস্থা করা, সসম্মানে জীবন যাপনের গ্যারান্টি দেওয়া, তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার উন্মেষ ঘটানো, এই যোগ্যতার দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং চিন্তু ও স্বাধীনতার এমন এক পরিমন্ডলের ব্যবস্থা করা যা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যান্য ব্যক্তির হস্তক্ষেপ হতে নিরাপদ থাকবে।
ইউরোপের বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মৌলিক অধিকারের পরিভাষার উন্মেষ ঘটে। হাজার বছরের গৃহযুদ্ধ, রাজাদের একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরাচার, ভূ-স্বামীদের জুলুম নির্যাতন, ব্যক্তিগত জীবনের উপর গীর্জার অসহনীয় হস্তক্ষেপ, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মতভেদের কারণে সংঘটিত দাঙ্গা, জাতীয়তাবাদ এবং তার সৃষ্ট আঞ্চলিক ক্ষমতা বৃদ্ধির লালসা ইউরোপে যেভাবে মানুষের ব্যক্তিগত সম্মানকে আহত করেছে, তার জানমাল ও ইজ্জত আব্রু পদদলিত করেছে এবং স্বৈরাচারী জালিম সরকারের সামনে জনগণকে সম্পূর্ণ অসহায় ও অক্ষম করে ফেলেছিল-তা মানবতার প্রতি সহমর্মিতা অনুভবকারী লোকদের বিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দেয় এবং তারা চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হন যে, মানুষকে অসম্মান ও অপমান হতে উদ্ধার এবং তার সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কি পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং স্বৈরাচারী রাজন্যবর্গ ও একনায়কতন্ত্রীদেরকে মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পথ কিভাবে দেখানো যায়। এই পরিস্থিতিতে প্রকৃতিগত অধিকারসমূহের মতবাদ বাস্তব রূপলাভের স্তরে পৌছতে পৌছতে মৌলিক অধিকারের রূপ ধারণ করে এবং সমগ্র ইউরোপে ব্যক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট অধিকারসমূহের আইনগত হেফাজতের আন্দোলন দিনের পর দিন জোরদার হতে থাকে। ঔপনিবেশিক আমলের অত্যাচার, আবার দুই দুইটি বিশ্বযুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ও আনবিক বোমার ব্যবহারের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে যখন নরকে পরিণত করা হয়েছিল এবং তার লেলিহান শিখা গোটা মানবজগতকে নিজের গহবরে নিয়ে নিল তখন ইউরোপে গুঞ্জরিত ‘মৌলিক অধিকারের’ আওয়াজ এক বিশ্বব্যাপী দাবীতে পরিণত হল-যার ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘ সনদ এবং মানবাধিকার সনদ অস্তিত্ব লাভ করে। স্বৈরাচার ও দমননীতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে উক্ত পরিভাষার ধ্বনিও পৃথিবীর আনাচে কানাচে পৌছে যায়।
ইউরোপে মৌলিক অধিকারের ধারণা যে প্রেক্ষাপটে উন্মেষ লাভ করে ইসলামের মৌলিক অধিকারের প্রেক্ষাপট তদ্রূপ নয়। তাই তা সম্পূর্ণ ভিন্নতর। এর বিস্তারিত বিবরণ আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে পেশ করবো।
মৌলিক অধিকারের ইতিহাস

ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের যে ধারণা দিয়েছে এবং এসব অধিকার চিহ্নিত করে তার হেফাজতের যে ব্যবস্থা দিয়েছে তার উপর বক্তব্য রাখার আগে পাশ্চাত্য কর্তৃক রচিত মানবাধিকারের ইতিহাস, এসব অধিকারের উৎস সম্পর্কে পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের সরবরাহকৃত রক্ষাকবচসমূহের সর্বপ্রথম আমাদের মূল্যায়ণ করে দেখা উচিত যে, আজ স্বয়ং পাশ্চাত্যে এবং তার অনুসারী অন্যান্য দেশে মানুষ কি পরিমাণে জানমালের নিরাপত্তা, ন্যায় ইনসাফের প্রতিষ্ঠা, মান সম্মানের হেফাজত, চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতা লাভ করেছে। এই মৌলিক অধিকার কতটা অবিচ্ছেদ্য এবং গত তিন চারশো বছর ধরে এসব অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অর্জনের জন্য যে সংগ্রাম অব্যাহত ছিল তা মানুষকে নিরাপদে, শান্তিতে ও সম্মানের সাথে জীবনযাপনের কতটা সুযোগ দান করেছে।
পাশ্চাত্যের পন্ডিতগণ মৌলিক মানবাধিকারের ধারণার বিবর্তনশীল ইতিহাসের সূচনা করেন খৃ.পূ. পঞ্চম শতকের গ্রীস হতে; অতঃপর খৃষ্ঠীয় পঞ্চম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তার সূত্র যোগ করে এক লাফে খৃস্টীয় একাদশ শতকে প্রবেশ করেন। খৃ. ষষ্ঠ হতে দশম শতক পর্য্ন্তকার পাঁচশো বছরের দীর্ঘ যুগ তাদের রচিত ইতিহাসের পাতা হতে অদৃশ্য। কেন? সম্ভবত এজন্য যে, তা ছিল ইসলামের যুগ।
গ্রীক দার্শনিকগণ নিঃসন্দেহে আইনের রাজত্ব ও ন্যায় ইনসাফের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত পান্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থাবলী রচনা করেছেন। কিন্তু তাদের লেখায় আমরা মানবীয় সমতার কোনো ধারণা পাচ্ছিনা। তারা হিন্দুস্তানের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, কায়স্থ(সরকারী কর্মচারী) ও নমশূদ্র ইত্যাদি শ্রেণীর ন্যায় মানবজাতিকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেন এবং মনুশাস্ত্রের মত তাদের এখানেও চারটি শ্রেণী বিদ্যমান। প্লেটো(খৃ.পূ. ৪২৭-৩৪৭) তাঁর প্রজাতন্ত্র (Republic) গ্রন্থে শাসন কর্তৃত্ব শুধুমাত্র দার্শনিকগণকে দান করেন এবং সমাজের অবশিষ্ট লোকদের কৃষক, সৈনিক, দাস ইত্যাদি শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। তিনি বলেন, “নাগরিকগণ! তোমরা অবশ্যই পরস্পর ভাই, কিন্তু খোদা তোমাদের বিভিন্ন অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের মধ্যে কতকের রাজত্ব করার যোগ্যতা আছে এবং তাদেরকে খোদা তাআলা সোনা দিয়ে তৈরি করেছেন। কতককে রূপা দিয়ে তৈরি করেছেন এবং তারা পূর্বোক্তদের সাহায্যকারী, তারপর আছে কৃষক ও হস্তশিল্পী যাদের তিনি পিতল ও লোহা দিয়ে তৈরি করেছেন।”(Morris Stockhammer, Plato Dictionary, Philosophical Library, New York 1903, p. 32).
এখন প্লেটোর ন্যায়বিচারের দর্শন নিরীক্ষণ করুনঃ “আমি ঘোষণা করছি যে, ন্যায়বিচার শক্তিমানদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীর সর্বত্র ন্যায়বিচারের মাত্র একটিই মূলনীতি রয়েছে এবং তা হচ্ছে ঐ শক্তিমানদের স্বার্থ।”(ঐ, পৃ. 141)।
ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা আরো বিশদভাবে শুনুনঃ “ন্যায়বিচার এমন একটি বিষয় যা বন্ধুদের প্রতিপালন করে এবং শত্রুদের পশ্চাদ্ধাবন করে।”(ঐ, পৃ. ১৩৪)।
প্লেটোর মতে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দোষ এই যে, তাতে সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। “গণতন্ত্র বিভেদের জন্মদানকারী প্রকৃতির একটি সরকার যা বিশৃঙ্খলা ও বাড়াবাড়িতে পরিপূর্ণ এবং সমান ও অসমান লোকদের মাঝে সমতা বিধানের চেষ্টা করে।”(ঐ, পৃ. ৫৬)।
আইনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে প্লেটো সাহেব বলেনঃ “আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে-তার চর্চা ও ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্টি বিধান।”(ঐ, পৃ. ১৪৯)।
প্লেটো ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সাম্যের প্রবক্তা নন। তিনি প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষের জন্য পৃথক পৃথক আইনের সমর্থক। ক্রীতদাসদের সম্পর্কে তিনি তাঁর আইনগ্রন্থে লিখেছেন, “ক্রীতদাসদের সেই শাস্তিই পাওয়া উচিত যার তারা যোগ্য। তাদেরকে স্বাধীন নাগরিকের মত শুধু তিরস্কার ও ভৎসর্ণা করেই ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। অনথায় তাদের মনমানসিকতা খারাপ হয়ে যাবে। (ঐ, পৃ. ২৩৮)।
তিনি নারী পুরুষের মাঝেও সমতার সমর্থক নন। তিনি বলেন, “সৎকাজের ব্যাপারে নারীদের প্রকৃতি পুরুষদের তুলনায় হীনতর।”(ঐ, পৃ. ২৮০)।
প্লেটোর মত তাঁর শিষ্য এরিস্টটলও (খৃ.পূ. ৩৮৪-৩২২) শ্রেণী বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থার প্রবক্তা। তিনিও সাম্যনীতির দর্শনে ভয় পান। তিনি নিজের ‘রাজনীতি’(Politics)শীর্ষক গ্রন্থে গণতন্ত্রকে নিকৃষ্টতম পদ্ধতির সরকার আখ্যায়িত করে লিখেছেনঃ “গণতন্ত্র এমন একটি সরকার ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা থাকে নীচ, দরিদ্র ও বোকা লোকদের হাতে। এটা হচ্ছে সেই সর্বশেষ নিকৃষ্টতম সরকার ব্যবস্থা যা প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার বানিয়ে দেয়।”(Thomas P. Keirman, Aristotle Dictionary, Philosophical Library, New York 1962, P. 288).
এরিস্টোটলের ন্যায়বিচার সম্পর্কীয় ধারণাও প্রায় প্লেটোর অনুরূপ। তিনি বলেনঃ “ন্যায়বিচার হচ্ছে সেই গুণ যার ফলে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী এবং আইন অনুযায়ী অধিকার লাভ করে।”(ঐ, পৃ. ৩১২)।
এখানে মর্যাদার শর্ত যোগ করে তিনি ন্যায়বিচার হতে সমতার মূলোৎপাটন করেছেন। দাসত্ব সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি আরো অধিক স্পষ্টঃ “কিছু লোক স্বভাবতই স্বাধীন জন্মগ্রহণ করেছে এবং কিছু লোক গোলাম হিসেবে। শেষোক্তদের ক্ষেত্রে সংখ্যাধিক্য উপকারীও এবং ন্যায়সংগতও।”(ঐ, পৃ. ৩১২)।
তিনি স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত লোকদের এ অধিকার দেন যে, তারা এই অসংখ্য গোলাম নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিয়ে তাদেরকে কাজে নিয়োগ করবে এবং তাদের খাদ্য বস্ত্রের যোগান দিবে। ‘রাজনীতি’ গ্রন্থেই তিনি লিখেছেন, “বুদ্ধিমান ও প্রশস্ত হৃদয়ের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের এই অধিকার রয়েছে যে, তারা ক্রীতদাসদিগকে নিজেদের মধ্যে বন্টন করে নিবে, তাদের কর্মে নিয়োগ করবে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দিবে।”(ঐ, পৃ. ৩৬৪)।
গোলামদের উপরই শুধু সম্ভ্রান্তদের এই অধিকার সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের উপরও তাদের মালিকানা রয়েছে। এরস্টোটল বলেনঃ “গরীব লোকেরা জন্মগতভাবেই ধনীদের গোলাম। সেও, তার স্ত্রীও, তার সন্তানরাও।”(ঐ, পৃ. ১৮৫)।
এরিস্টোটল ক্রীতদাসদের নাগরিক অধিকার দিতে প্রস্তুত নন। তার প্রদত্ত ‘নাগরিক’ এর সংজ্ঞা অনুযায়ী শুধু বাসস্থানের ভিত্তিতেই কোনো ব্যক্তি নাগরিক হয়ে যায়না। এই নীতি স্বীকার করে নিলে গোলাম ও স্বাধীন ব্যক্তি মর্যাদার দিক হতে সমান হয়ে যাবে। নাগরিক কেবল সেই ব্যক্তি যে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় কার্য্ক্রমের অংশগ্রহণ করে। আবার স্বাধীনও সেই ব্যক্তি যার পিতৃকূল ও মাতুল উভয়ই সম্ভ্রান্ত। “নাগরিক সেই ব্যক্তি যে পিতামাত উভয়ের দিক হতে নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে, না শুধু মায়ের দিক থেকে, অথবা পিতার দিক থেকে।”(ঐ, পৃ. ২০৭)।
মানুষ ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে এরিস্টোটল ও প্লেটোর এসব দৃষ্টিভঙ্গি হতে অনুমান করা যায় যে, ইউরোপের পথনির্দেশনার উৎস গ্রীসে মৌলিক মানবাধিকারের কি অবস্থা হয়ে থাকবে। রবার্ট এ ডেবি গ্রীকদের চিন্তাধারা ও মতবাদের পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেনঃ “তিন লাখ ক্রীতদাস এবং নব্বই হাজার নামমাত্র স্বাধীন নাগরিকের শহরে বসে প্লেটো কত মাহাত্মপূর্ণ ও অভিযোগপূর্ণ বাক্যে ‘স্বাধীনতার’ গুণ গেয়েছেন। (Dewery R.E., Freedom, The Macillan Co. London 1970, P. 347).
গ্রীসে ক্রীতদাসদের মর্যাদা বাকশক্তিহীন জীবের অধিক কিছু ছিলনা। তারা মানুষ হিসেবে গণ্য হতোনা। তারা যাবতীয় অধিকার হতে ছিল সম্পূর্ণ বঞ্চিত। মনীবের সেবাই ছিল তাদের একমাত্র কাজ। এই করুণ অবস্থার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সোচ্চার হন দার্শনিক যেনোর শিষ্যগণ। এই চিন্তাগোষ্ঠীর স্থপতি যেনো(Zeno)মানবীয় সাম্যের উপর জোর দেন এবং প্রাকৃতিক আইনের মতবাদ পেশ করেন। এই মতবাদ অনুযায়ী “প্রাকৃতিক বিধান হচ্ছে চিরন্তন। তার প্রয়োগ কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপরেই নয়, বরং প্রতিটি মানুষের উপর হয়ে থাকে। এটা নিরপেক্ষ আইনের তুলনায় উচ্চতর এবং ন্যায় ইনসাফের সেই সব মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যাকে ‘চেতনার চোখ’ দিয়ে সুস্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে। এই আইনের অধীনে অর্জিত প্রাকৃতিক অধিকারসমূহ কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের বিশেষ নাগরিকদের পর্য্ন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং যে কোনো স্থানে বসবাসকারী মানুষ কেবল মানুষ ও বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ হওয়ার ভিত্তিতে তা লাভ করে থাকে।” (Cranston M., Human Rights Today, London 1964, P.9).
যেনোর চিন্তাগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক অধিকারের মতবাদ রোমের চিন্তাবিদ ও আইন প্রণেতাগণকে বহুল প্রভাবিত করে এবং তারা নিজেদের আইন ও রাজনীতির দর্শনে, ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সমতা’র উপর অসাধারণ জোর দেন। পাশ্চাত্যবাসীগণ এটাকে যেনোর অনুসারীবর্গেরই প্রভাবের ফল বলে সাব্যস্ত করেন। কিন্তু বাস্তব ঘটনা তার বিপরীত। এটা ছিল ধর্মের দানকৃত চেতনা এবং তার শিক্ষার ফলশ্রুতি।
রোমের সুপ্রসিদ্ধ আইনবিদ সিসেরো-যিনি ছিলেন খৃস্টধর্মের অনুসারী-তিনি প্রাকৃতিক বিধানের মতবাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লিখেছেনঃ “এই বিধান সামগ্রিকভাবে প্রয়োগযোগ্য। এতে কখনও পরিবর্তন আসেনা। তা সর্বদা কায়েম থাকার উপযোগী। তার পরিবর্তন করা অপরাধ। এর কোনো অংশ রহিত করার চেষ্টা করার অনুমতি দেয়া যায়না। তাকে সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দেয়া সম্ভব নয়। সিনেট অথবা জনসাধারণের দ্বারা আমরা তার আনুগত্য হতে মুক্ত হতে পারিনা। রোম ও এথেন্সে পৃথক আইন হবে অথবা আজ ও কাল পৃথক হতে পারে, কিন্তু একটি স্থায়ী ও পরিবর্তনের অযোগ্য আইনই সব জাতি ও সব যুগের জন্য বৈধ ও কার্য্কর হতে পারে।”(Gouis Ezejiofor, Protection of Human Rights Under the Law, London 1964, p.4)।
তিনি নিজের চিন্তাধারার মূল উৎসের দিকে ইশারা করতে গিয়ে বলেনঃ “সকল জাতি ও সব যুগ একটি চিরস্থায়ী ও রচিত করার অযোগ্য বিধানের অনুসারী হবে। আল্লাহ ই সকল মানুষের জন্য সমান ও অভিন্ন, তিনিই তাদের প্রভু ও সম্রাট। তিনিই ঐ বিধানের প্রস্তাব করেন, আলোচনায় আনেন ও কার্য্কর করেন। এটা সেই বিধান যার অনুগত্য না করলে মানুষ স্বীয় প্রভুর বিরুদ্ধাচারী হয়ে যায় এবং যাকে মানব স্বভাব গ্রহণ না করলে তার কারণে কঠোর শাস্তি ভোগ করে। যদি সে তা থেকে রক্ষা পেয়েও যায় তবে মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী তাকে অন্য কোনো শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে।”(A.K. Brohi, Fundamental Law of Pakistan, Karachi 1958, P.733)।
সিসেরো ও তার সমসাময়িক আইন প্রণেতাগণ নিজেদের রচিত বিধানে ব্যক্তি মালিকানার অধিকারকে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করেছেন। ফলে তাতে একদিকে ব্যক্তির গুরুত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়েছে এবং অপরদিকে মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞার জন্য একটি ভিত্তি সরবরাহ হল। মৌলিক অধিকার আন্দোলন এর আসল সূচনা হয় ১১শ শতকে বৃটেনে-যেখানে ১০৩৭ সালে রাজা দ্বিতীয় কনরাড একটি ফরমান জারি করে পার্লামেন্ট এর ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেন। এই ফরমানের পরে পার্লামেন্ট তার ক্ষমতার পরিসর বৃদ্ধির চেষ্টা শুরু করে। ১১৮৮ খৃ. রাজা ৯ম আলফেনসোর দ্বারা অন্যায়ভাবে আটকের নীতিমালা পাস করিয়ে নেয়া হয়। ১২১৫ সালের ১৫ জুন ম্যাগনাকার্টা জারী হয় যাকে ওয়েলটার ‘স্বাধীনতার সনদ’ আখ্যায়িতে করেন। সন্দেহ নেই যে, বৃটেনে ম্যাগনাকারটা ছিল মৌলিক অধিকারসমূহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিহাস সৃষ্টিকারী দলীল। কিন্তু তার অর্থ অনেক পরে বের করা হয়েছে। তৎকালে এটা ছিল রাজন্যবর্গ(Barons)ও রাজা জন এর মধ্যকার একটি চুক্তিপত্র স্বরূপ-যার মাধ্যমে রাজন্যবর্গের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছিল, জনগণের অধিকারের সাথে এর সম্পর্ক ছিলনা। হেনরী মারশ বলেনঃ “বিরাট বিরাট ভূ-স্বামীদের একটি ঘোষণাপত্র ছাড়া তার আর কোনো মর্যাদা ছিলনা।”(Henry Marsh, Documents of Liberty, David & Charls, New Town Abbot, England 1971, P.51)।
১৩৫৫ খৃ. বৃটিশ পার্লামেন্ট ম্যাগনাকার্টার স্বীকৃতি দিতে গিয়ে আইনগত সমাধান অন্বেষণের বিধান মঞ্জুর করে-যার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে বিচার বিভাগীয় কার্য্যক্রম ব্যতীত জায়গা-সম্পত্তি হতে বেদখল অথবা গ্রেফতার করা যেতনা এবং তাকে মৃত্যুদন্ডও দেয়া যেতনা।
১৪শ শতক হতে ১৬শ শতক পর্য্যন্ত ইউরোপে মেকিয়াভেলির দর্শনের জয়জয়কার ছিল, যিনি স্বৈরতন্ত্রের হাত শক্ত করেছিলেন, রাজাদের শক্তি যুগিয়েছিলেন এবং ক্ষমতা দখলকে জীবনের উদ্দেশ্যে পরিণত করেন। ১৭শ শতকে মানুষের প্রকৃতিগত অধিকারের মতবাদ পুনরায় পূর্ণ শক্তিতে উত্থিত হয়। ১৬৬৯ খৃ. বৃটিশ পার্লামেন্ট অন্যায় আটকাদেশের বিধান মঞ্জুর করে যার মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়। ১৬৮৪ খৃ. বিপ্লবী বাহিনী বৃটিশ পার্লামেন্ট এর সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তির কর্তৃত্বের সীমা নির্ধারণ করে দেয়। ১৬৮৯ খৃ. পার্লামেন্ট বৃটেনের সাংবিধানিক ইতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দলীল ‘অধিকার আইন’(Bill of Rights)মঞ্জুর করে। লর্ড একটোনের ভাষায়ঃ“এটি ইংরেজ জাতির মহত্ত্বম অবদান”।এই বিলকে বৃ্টেনে স্বাধীনতা আন্দোলনের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ এর সাহায্যে মৌলিক অধিকারসমূহ সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। ১৬৯০ সালে জন লক ১৬৮৮-৮৯ সালের বিপ্লবের বৈধতার সমর্থনে Treaties on Civil Government গ্রন্থ রচনা করেন, যার মধ্যে তিনি সামাজিক চুক্তির মতবাদ পেশ করেন এবং ব্যক্তির অধিকারসমূহের সমর্থনে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করেন। ১৭৬২ খৃ. খ্যাতিমান ফরাসী দার্শনিক রুশো(১৭১২-৭৮) ‘সামাজিক চুক্তি’ শিরোনামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যার মধ্যে হবস ও লক এর পেশকৃত সামাজিক চুক্তির একটি নতুন দৃষ্টিকোণ হতে মূল্যায়ণ করা হয়। তিনি হবস এর ‘সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ’ এবং লক এর ‘গণতন্ত্রের’ মধ্যে ঐক্যের সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তার মতবাদ কেবল ফরাসী বিপ্লবের পথই সমতল করেনি, বরং গোটা ইউরোপের রাজনৈতিক চিন্তাধারার উপরও গভীর প্রভাব ফেলে এবং সরকার কর্তৃক ব্যক্তির অধিকার স্বীকার করিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৭৭৬ সালের ১২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ভার্জিনিয়া হতে জর্জ ম্যাশন রচিত অধিকার সনদপত্র ঘোষিত হল, যার মধ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা এবং আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া হয়। ১৭৭৬ সালের ১২ই জুলাই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। এর খসড়া তৈরি করেছিলেন টমাস জেফারসন এবং এর অনেক মূলনীতি ইংরেজ চিন্তাবিদগণ বিশেষ করে জন লক-এর মতবাদের উপর ভিত্তিশীল ছিল। এই ঘোষণাপত্রের প্রারম্ভে প্রাকৃতিক বিধানের বরাতে বলা হয়েছে যে, “সকল মানুষ সমান সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদেরকে তাদের স্রষ্টা অভিন্ন অধিকার দান করেছেন-যার মধ্যে জীবনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং সুখের সন্ধান করার অধিকারসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”
১৭৮৯ খৃ. আমেরিকার কংগ্রেস আইন কার্য্কর করার তিন বছর পর তাতে এমন দশটি সংশোধনী মঞ্জুর করে যা ‘অধিকার আইন’ নামে প্রসিদ্ধ। একই বছর ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ ‘মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র’ অনুমোদন করে। ১৭৯২ সালে টমাস পেইন তার বিখ্যাত পুস্তিকা The Rights of Man প্রকাশ করেন, যা পাশ্চাত্যবাসীর চিন্তার উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং মানবাধিকার সংরক্ষণের আন্দোলনকে আরো সামনে এগিয়ে দেয়। ১৯শ ও ২০শ শতকে বিভিন্ন দেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকারসমূহের সংযোজন একটি সাধারণ প্রথায় পরিণত হয়। ১৮৬৮ খৃ. আমেরিকার সংবিধানে চতূর্দশ সংশোধনী অনুমোদন করা হয়, যাতে বলা হয়েছে যে, আমেরিকার কোনো অঙ্গরাজ্যই আইনগত নীতিমালার অনুসরণ ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন, স্বাধীনতা, মালিকানা হতে বঞ্চিত করতে পারবেনা এবং তাকে আইনের পক্ষপাতহীন নিরাপত্তা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারবেনা।
১ম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানী সহ বিভিন্ন ইউরোপীয় নতুন রাষ্ট্রের সংবিধানে মৌলিক অধিকারসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৪০ খৃ. প্রখ্যাত সাহিত্যিক এইচ.জি.ওয়েলস. তাঁর New World Order গ্রন্থে মানবাধিকারের একটি সনদপত্র ঘোষণার পরামর্শ পেশ করেন। ১৯৪১ সালের জানুয়ারীতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট কংগ্রেসের নিকট চারটি স্বাধীনতার সমর্থন করার জন্য আবেদন করেন। ১৯৪১ মাসের আগস্ট মাসে আটলান্টিক ঘোষণায় দস্তখত করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল চার্চিলের ভাষায় “মানবাধিকারের ঘোষণার সাথে সাথে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি।”
২য় বিশ্বযুদ্ধের পর লিখিত সংবিধানে মৌলিক অধিকারের সংযোজন আরো সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করে। ফ্রান্স তার ১৯৪৬ সালের সংবিধানে ১৭৮৯ সালের মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র শামিল করে। একই বছর জাপান মৌলিক অধিকারকে সংবিধানের অংশে পরিণত করে। ১৯৪৭ সালে ইটালী তার সংবিধানে মানবাধিকারের গ্যারান্টি দান করে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকারের পক্ষে পরিচালিত চেষ্টা সাধনার ফলশ্রুতিতে শেষ পর্য্ন্ত ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ‘মানবাধিকার সনদ’ ঘোষিত হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত অধিকারসমূহ অথবা মানুষের চিন্তায় উত্থিত হতে পারে এমন অধিকারসমূহ শামিল করা হয়। সাধারণ পরিষদে মতামত যাচাইয়ের সময় এই ঘোষণার অনুকূলে ৪৮ ভোট পড়ে। ৮টি দেশ মতামত যাচাইয়ে অংশগ্রহণ করেনি যার মধ্যে রাশিয়াও ছিল। এই ঘোষণাপত্র কতটা কার্য্কর হচ্ছে তা মূল্যায়নের জন্য এবং তার সংরক্ষণ অথবা নতুন অধিকারসমূহ চিহ্নিত করার জন্য প্রস্তাব পেশের উদ্দেশ্যে মানবাধিকার কমিশন নামে একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করা হয়।
মৌলিক অধিকারের এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের পর এখন আমরা বিষয়টির তাত্ত্বিক ও বাস্তব দিকসমূহের মূল্যায়ন করে দেখব যে, পাশ্চাত্য চিন্তাবিদগণের অধিকারের ধারণার এবং এসব অধিকারের উৎস কি? এসব অধিকার দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করায় অথবা একটি বিশ্ব মানবাধিকার সনদ রচনা ও মঞ্জুর করায় বাস্তবে কি এসব অধিকার সংরক্ষণের সন্তোষজনক গ্যারান্টি সরবরাহ করা হয়েছে? দেশের সংবিধান ও বিশ্ব মানবাধিকার সনদ কি ব্যক্তিকে একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের নখরদন্ত হতে মুছে দিতে ও স্বৈরতন্ত্রের চাকার নিষ্পেষণ হতে রক্ষা করতে কোনো কার্য্কর নিরাপত্তার উপায় প্রমাণিত হয়েছে? বিশ শতকের মানুষেরা বাস্তবিকই কি দ্বাদশ অথবা ষোড়শ শতকের গোলাম ও নির্যাতিত মানুষগুলোর চেয়ে অধিক নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করছে?

(বাকি অংশ পেতে নজর রাখুন টিডিএন বাংলার  পরের পর্বে)