আলি মোস্তাফা, টিডিএন বাংলা : আমরা ভারতীয়রা বাংলাদেশকে ব্যঙ্গ করে “কাংলাদেশ” বা “কাংলুদেশ” বলি। এর মাধ্যমে বোঝাই তারা গরীব, ভিখারী! তবে কেউ গরীব বা ভিখারী হলে তাকে ব্যঙ্গ করা উচিৎ নাকি সাহায্য করা উচিৎ, তা আলাদা বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশ কি আসলেই গরীব, ভিখারী? তাদেরকে কি কাংলু বলা যুক্তিযুক্ত?

এই প্রশ্নগুলিই মাথায় এলো দার্জিলিং গিয়ে! দেখলাম, সেখানে বেড়াতে আসা সমস্ত লোকদের প্রায় ৩০%-৪০%ই বাংলাদেশী! এত বাংলাদেশী কেন, কীভাবে এদেশে বেড়াতে আসছে? এত টাকা পায় কোথায়? বিষয়টা আমাকে ভাবালো! সেখানেই দুজনের সাথে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলো। একজন ঢাকার। ওনার রেস্টুরেন্ট রয়েছে। আরেকজন খুলনার। ওনার ই-কমার্স ব্যবসা রয়েছে। মূলত ওয়াটার বাইক, বোট, ফ্লোটিং আইল্যান্ড, রোবোট, ফটো তোলার ড্রোন ইত্যাদি শৌখিন দ্রব্য বিক্রি করেন।

প্রথমজন বললেন, আসলে বাংলাদেশের প্রচুর মানুষ বিদেশে থাকেন। তারা প্রচুর টাকা দেশে পাঠান। এই টাকা তাদের পরিবার আর তো আর জমিয়ে রাখবে না। নিশ্চয় খরচ করবে। বাড়ি বানাবে, গাড়ি কিনবে, বা নতুন কোনো ব্যবসা করবে, পোশাক কিনবে, এরপরে আমার রেস্টুরেন্টেও খেতে আসবে। এতে সকলের ব্যবসা ভালো চলছে। টাকার ফ্লো বাড়ছে। আমাদের মত ব্যবসায়ীদের হাতে বেশি টাকা আসছে। আবার আমাদের প্রয়োজন মেটানোর পরেও উদ্বৃত্ত টাকা থাকছে। আর তখনই আমরা বিদেশ ভ্রমণের কথা চিন্তা করি। এর পাশাপাশি আমরা আরও দশজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছি। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবেই দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটছে।

আগের দিন আপনাদের অনেকের পরিচিত এক ব্যবসায়ী এবং লেখকের সাথে আলোচনা হচ্ছিল। যদিও অর্থনীতি নয়, বরং অন্য বিষয় নিয়ে। তিনিও দাবী করলেন, অর্থনীতিতে তাঁদের দেশের দ্রুত উন্নয়ন ঘটছে। তিনি জানালেন, বাংলাদেশ সরকার অর্থনীতির উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। যার কারণে দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটছে দ্রুত। তাঁর মতে, সে দেশে এখন কাজের অভাব নেই।

উপরে উল্লেখিত খুলনার ব্যবসায়ীর সঙ্গেই এই বিষয়ে সবচেয়ে বেশী আলাপ হয়েছিল। তিনিও মোটামুটি একই কথা জানালেন। এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সেদেশের সরকারের প্রশংসা করলেন। পোশাক, মাছ, শাক-সবজি ইত্যাদি বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধি ঘটছে।

অবশ্য এর বিরোধী মতও শুনেছি। তবে একটা ব্যাপার বুঝলাম যে, সেদেশে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে, নির্বাচনে দাঁড়ানো নিয়ে, ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নিয়ে অনেকের আপত্তি বা প্রশ্ন থাকলেও তথা এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার উপর চরম ক্ষুদ্ধ থাকলেও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে শেখ হাসিনার ‘অগণতান্ত্রিক’ সরকার অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, তা প্রায় সকলেই স্বীকার করছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্পর্কে বাংলাদেশীদের এই দাবী কতটা সত্য? বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার জন্য গুগলের সাহায্য নিলাম।
World Economic Forum কর্তৃক প্রকাশিত The Inclusive Growth and Development Index (IDI) বা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকে ৭৪টি “উন্নয়নশীল” দেশের মধ্যে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩৬-তম। সেখানে ভারতের অবস্থান ছিল ৬০-তম। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ২ ধাপ এগিয়ে আসে ৩৪-তম স্থানে, অন্যদিকে ভারত ২ ধাপ পিছিয়ে ৬২-তম স্থানে চলে যায়। অর্থাৎ মাত্র ৭৪টি “উন্নয়নশীল” দেশের মধ্যে ভারতের র‍্যাংক ৬২! পাকিস্তান ২০১৭ সালে ছিল ৫২-তম স্থানে। ২০১৮ সালে এগিয়ে আসে ৪৭-তম স্থানে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে নেপাল সবচেয়ে এগিয়ে। ২০১৭ সালে ছিল ২৭-তম স্থানে, ২০১৮ সালে আসে ২২-তম স্থানে। অর্থাৎ এক বছরে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপালের অগ্রগতি হলেও ভারত ২ ধাপ পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এই সুচকে ভারতের চেয়ে ২৮ ধাপ এগিয়ে ছিল। শুধু তাই নয়, সার্বিক IDI প্রবণতা অনুযায়ী বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে ৪.৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে ভারতের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২.২২ শতাংশ। বাংলাদেশের তুলনায় ২.৩৩ শতাংশ কম।

উল্লেখ্য, অর্থনীতির তিনটি মানদণ্ড – ‘প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন’, ‘অন্তর্ভুক্তিকরণ’ এবং ‘আন্তঃপ্রজন্ম সমতা, প্রাকৃতিক ও আর্থিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা’র ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বেড়ে পৌঁছেছে ১২.৯ শতাংশে৷ যার পরিমাণ ভারতের প্রায় দ্বিগুণ৷ ২০১৬-এর শেষ পর্যন্ত ভারতের আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫.৬ শতাংশ৷

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১৭৫১ ডলার। সেখানে ভারতীয়দের মাথাপিছু আয় ২১৩৪ ডলার। তবে ভারতের মোট সম্পত্তি বা মোট আয়ের একটা বিশাল অংশই মাত্র হাতে গোণা কয়েকজনের হাতে। সেদিক থেকে ভারতের বিশাল অংশটাই গরীব এবং একটা অংশ খুবই গরীব। অন্যদিকে বাংলাদেশের জনগণদের মধ্যে কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক সাম্য রয়েছে। এছাড়া মাথাপিছু আয় দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

বাংলাদেশে অভাবে পরে আত্মহত্যার খবর শোনা যায় না। না খেতে পেয়েও মৃত্যুবরণের কথা শোনা যায় না। কিন্তু ভারতে অভাবে পরে, ঋণের চাপে, কৃষিতে ক্ষতি হয়ে আত্মহত্যা নিয়মিত ঘটনা। এমনকি আমাদের কাছে এটা এখন যেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি যে, উত্তরবঙ্গের চা-বাগান এলাকাসহ ভারতের অনেক জায়গা থেকেই না-খেতে পেয়ে মৃত্যুর খবর এসেছে একাধিকবার।

এখন আপনারাই বলুন, বাংলাদেশকে “কাংলাদেশ” বলা কতটা যুক্তিযুক্ত?
ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যাটা কি? এক্ষেত্রে ভারতের মূল দুটি সমস্যা বা পিছিয়ে পড়ার কারণ হলো বানিজ্য ঘাটতি এবং বিদেশে টাকা পাচার।
বর্তমানে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৪.৭৩ বিলিয়ন ডলার। গত বছরে যা ছিল ১৫.৬৭ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। এর অর্থ, আমাদের দেশের মোট আমদানী, রপ্তানির চেয়ে ১৫.৬৭ বিলিয়ন ডলার বেশি ছিল। গত জুলাই, ২০১৮ তে দেশের সার্বিক আমদানির পরিমাণ ২৯ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে সার্বিক রফতানির পরিমাণ ১৪ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছিল। এই অবস্থার তেমন কোনোই পরিবর্তন লক্ষ্য যাচ্ছে না। রপ্তানীর চেয়ে আমদানির পরিমাণ বাড়ছেই।

অর্থাৎ, দেশ থেকে নিয়মিত প্রচুর রুপি/ডলার চলে যাচ্ছে। যার অর্থ, বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে যেখানে তাদের হাতে বেশি বেশি টাকা আসছে, সেখানে ভারতীয়দের হাত ক্রমশ খালি হচ্ছে, আমাদের হাত থেকে টাকা বেড়িয়ে যাচ্ছে, আমাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বেকারত্ব বাড়ারও অন্যতম কারণ এটা।

এর পাশাপাশি রয়েছে বিদেশে মুদ্রা পাচার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে মুদ্রা পাচারের দিক থেকে ভারতের অবস্থান চতুর্থ থেকে পঞ্চমে ওঠানামা করে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিআইএফ) এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ভারত থেকে ১৬৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১১ লাখ কোটি রুপি পাচার হয়েছে। শুধুমাত্র ২০০৬ সালেই সুইস ব্যাংকে ভারত থেকে পাচার হওয়া টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি। সেসময় সুইস ব্যাংকের ৪৩% টাকাই ছিল ভারতীয়দের। তবে ধীরে ধীরে সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের টাকা রাখার প্রবণতা কমে যায়।

এর পাশাপাশি রয়েছে ভারতীয়দের ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে কেনাকাটা, বিদেশে উচ্চশিক্ষা। এসবের কারণেও ভারতীয় টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। যদিও এর প্রভাব খুব সামান্যই।

মূলত বাণিজ্য ঘাটতি ও বিদেশে অর্থপাচারের কারণে আমাদের অর্থনীতি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা পিছিয়ে পড়ছি বাংলাদেশীদের থেকেও। এই দুটি সমস্যার সমাধান না হলে আমাদেরকে ভবিষ্যতে আরও বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। (লেখক: এক্টিভিস্ট)