তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা : অমর একুশে নিয়ে বাংলাদেশে যত কবিতা রচিত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আর কোনো একক ঘটনা নিয়ে এত কবিতা রচিত হয়নি। ২১ মানেই আমরা জানি ঢাকা। কবিতার ক্ষেত্রে অনুরণন উঠেছিল চট্টগ্রামে।

ভাষা আন্দোলন চলাকালে ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বসে ভাষা শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে কলম ধরলেন মাহবুবুল আলম চৌধুরী। তিনি লিখলেন, ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। এই দীর্ঘ কবিতাটি একুশের শহীদের স্মরণে প্রথম এবং ভাষিক আগ্রাসনের ওপর লেখা দ্বিতীয় কবিতা।

‘যে শিশু আর কোনদিন তার পিতার কোলে

ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ পাবে না,

যে গৃহবধূ আর কোনদিন তার স্বামীর প্রতীক্ষায়

আঁচলে প্রদীপ ঢেকে দুয়ারে আর দাঁড়িয়ে থাকবে না,

যে জননী খোকা এসেছে বলে উদ্দাম আনন্দে

সন্তানকে আর জড়িয়ে ধরতে পারবে না,

যে তরুণ মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে বার বার একটি প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে চেষ্টা করেছিল।

তাদের সবার নামে আমি শাস্তি দাবি করতে এসেছি।’

২১-কে ঘিরে রক্তঝরা কবিতার পাহাড় তৈরি হল দুই বাংলার বুকে। আলাউদ্দিন আল আজাদ শহীদ মিনার ভাঙার প্রতিবাদে এক বিখ্যাত কবিতা লিখলেন।

‘ইটের মিনার ভেঙ্গেছে, ভাঙুক

একটি মিনার গড়েছি আমরা চারকোটি পরিবার

বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়।’

এই ভাষিক আন্দোলনে গণমানুষকে উজ্জীবিত করতে কবিতা পরম আশ্রয় হয়ে ওঠে। অমূল্য সব কবিতার কাঠামো নির্মাণ হতে থাকে।

‘ওরা আমার মুখের কথা

কাইরা নিতে চায়।

ওরা কথায় কথায় শিকল পরায়

আমার হাতে ও পায়।’

আবদুল লতিফের এই লেখায় যন্ত্রণা কী তীব্র হয়ে ওঠে। ভাষার জন্য আর্তি প্রবল।

গানের মাধ্যমে সহজেই মানুষের মননে ঝংকার তোলা যায়, চেতনা জাগানো সম্ভব হয়। তাই বাঙালীর ভাষা আন্দোলন নিয়েও রচিত হয়েছে অনেক গান। গানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বাঙালী জাতির মুক্তির বার্তা। কবি শামসুদ্দিন আহমদ রচিত ‘ভুলবো না ভুলবো না, ভুলবো না আর একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলবো না’ গানটি ভাষা শহীদদের ওপর রচিত প্রথম গান হলেও আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত গানটিই বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি।’

২১ নিয়ে কবিতার অনুরণন ওঠে কলকাতার বুকেও।

অর্জুন চৌধুরীর কলম থেকে বেরিয়ে এল `২১ ফেব্রুয়ারি’।

`শ্রীচরণেষু মা,

বাহান্ন সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে কাগজ পড়তে পড়তে তুমি আমায় বলেছিলে, এই সব মানুষের কথা, এই সব প্রতিবাদের অমর কাহিনী। ….. সেদিন আমাদের বাড়িতে রান্না হয়নি। তুমি বলেছিলে, আমাদের ঘরের ছেলেগুলো মরে গেল বাংলা শব্দটাকে ভালোবেসে, তাঁদের লাশ এখনো মর্গে পড়ে আছে। এখন কি খাবার জন্য রান্না করতে ইচ্ছে করে? ঘরের ছেলে মরে পড়ে থাকলে তখন কি উনুনে আঁচ দেয় কোনো মা?’

সরাসরি ভাষা শহিদদের উদ্দেশ্যে না হলে ভাষা নিয়ে আবেগ প্রকাশ পায় কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতায়। `মাতৃভাষা’- কবিতায় তিনি বলেছেন,

`ও আমার ভাষা, আমি তোমারই ভিতরে ফিরি।‘

মায়ের মুখের ভাষা রক্ষা করতে জীবন বিসর্জনের ঘটনা ইতিহাসে বিরল, যার একমাত্র দাবিদার বাঙালী জাতি। বাংলা আমাদের জন্মের অহঙ্কার। বাংলা ভাষা আমাদের বেঁচে থাকার অলঙ্কার।