টিডিএন বাংলা ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য আটটি দেশ মায়ানমারের নৃশংসতা বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে সংস্থার তদন্ত দলের দেয়া তথ্য শুনানির জন্যে গত মঙ্গলবার বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানিয়েছে। তদন্ত দল মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর ঘটনায় দেশটির সামরিক বাহিনীকে দায়ী করেছে। চীন এ আবেদনের বিরোধিতা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেননা, মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর সাথে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ থেকে দেশটিকে রক্ষা করতে চায়।

এএফপি’র হাতে আসা এক যৌথ আবেদন পত্রে নয়টি দেশ জানায়, তদন্ত দলের চেয়ারপার্সনকে মায়ানমার পরিস্থিতি এ বিষয়ে আরো তথ্য সংগ্রহের অনুমতি এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় এর প্রভাব বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করতে হবে। জাতিসংঘের ওই দল গত মাসে একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে মায়ানমার পরিস্থিতি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তুলতে বা অ্যাডক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহবান জানানো হয়।

ওই মিশন জানায়, রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চালানোর দায়ে মায়ানমারের কমান্ডার-ইন-চিফসহ দেশটির শীর্ষ জেনারেলদের বিরুদ্ধে অবশ্যই তদন্ত করে তাদের বিচার করতে হবে। তবে গত বছরের দমন অভিযান চলাকালে নৃশংস ঘটনায় মিয়ামারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ দেশটি প্রত্যাখান করেছে। সামরিক বাহিনীর ওই দমন অভিযানে বাধ্য হয়ে সাত লাখের বেশী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রোহিঙ্গা নিধনকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে জাতিসংঘ। তবে এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিষয়টির বিস্তারিত তুলে ধরা হলে দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

কূটনীতিকরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার মালিক চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া ঠেকাবে। তবে তারা নিরাপত্তা পরিষদের এই উদ্যোগ ঠেকাতে পারেননি। কারণ ১৫ সদস্যের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নূন্যতম ৯ সদস্য এই প্রস্তাবটি সমর্থন করেছে। তাই বিষয়টিতে ভেটো দেওয়া যাবে না। কূটনীতিকরা বলেছেন, চীন ও রাশিয়া মনে করে, এই প্রতিবেদন প্রথমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটির কাছে পাঠানো উচিত। ওই কমিটি মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করে থাকে। তবে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, পোল্যান্ড, পেরু, কুয়েত, আইভরি কোস্ট ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে এক চিঠিতে এই আবেদন জানায়। ফলে এখন তদন্ত দলের প্রধান নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনা করতে পারবেন।

জাতিসংঘ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকায় মায়ানমার সেনা কর্মকর্তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক কর্তৃপক্ষও এই নিধনযজ্ঞে ইন্ধন জুগিয়েছে। রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সহিংসতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাখাইনে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ নিয়ে মিয়ানমার সরকারের প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকারের মাত্রায় তারা অবাক হয়েছেন। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরমায়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উদ্দেশ্যে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে। এমন ঘৃণ্য অপরাধের নীলনকশা করার দায়ে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট পাঁচ জেনারেলকে বিচারে আওতায় আনা উচিত। এবার ওই তদন্ত কমিটির প্রধানকেই হাজির করা হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদে। তিনি সবার সামনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি বিস্তারিত তুলে ধরবেন।

তবে মঙ্গলবার জাতিসংঘে নিযুক্ত মায়ানমার রাষ্ট্রদূত হাও দো সুয়ান নিরাপত্তা পরিষদকে লেখা একটি চিঠিতে এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এটা রাখাইনের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস ও মেরুকরণই শুধু বাড়াবে।’ তিনি লিখেছেন, ‘অন্যান্য ইতিবাচক উন্নয়ন বাদ দিয়ে সবার উপরে জবাবদিহিতাকে স্থান দেওয়া একটি বিপজ্জনক প্রচেষ্টা যা ভবিষ্যতে ব্যর্থ হতে পারে।’

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার চিন্তা করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বাণিজ্যিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইতোমধ্যে তারা বেশ কয়েকজন সেনা সদস্যের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের চারজন সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত আগস্ট মাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও সেনাবাহিনী পরিচালিত কমপক্ষে দুইটি ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে যাচ্ছে দেশটি।

মায়ানমারের কূটনীতিক সুয়ান নিরাপত্তা পরিষদকে লিখেছেন, ‘মিয়ানমারের পরিস্থিতি বিবেচনা না করে একতরফা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাহ্যিক চাপ বিদ্যমান স্বদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মায়ানমার সরকারের সহযোগিতাকে নষ্ট করবে।’

Not available