ডা: মশিহুর রহমান, টিডিএন বাংলা: বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর৷ দল হিসাবে জামায়াত সুসংবদ্ধ, সুসংগঠিত৷ ক্যাডারভিত্তিক দল হিসাবে জামায়াত সবার উপরে অবস্থান করছে। আওয়ামী লিগকে ক্যাডারভিত্তিক দল লোকেরা বলে থাকে৷ কিন্তু জামায়াতের দলীয় শৃঙ্খলা, সুসংবদ্ধতা, সাংগঠনিক যােগাতার মানে অন্যদের থেকে অনেক এগিয়ে। জামায়াতের সদস্য ও কর্মীদের যে পদ্ধতিতে তরবিয়ত ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তার দরুণ জামায়াতের আদর্শিক অবস্থান অনেক বেশি মজবুত৷ কর্মীদের চারিত্রিক মান ইসলামী আদর্শের নিরিখে নিঃসন্দেহে উন্নত জায়গায় অবস্থান করেছে৷ আদর্শবাদী চেতনার নিরিখে সামগ্রিকভাবে জামায়াত অন্যান্য সংগঠনের তুলনায় প্রশংসার জায়গায় রয়েছে। এমনকি যে সব দ্বীনি সংগঠনণ্ডলো বাংলাদেশে কাজ করছে তাদের তুলনায় জামায়াতের ইসলামী আদর্শবাদী চেতনার মান তুলনামূলকভাবে ভাল৷ অগ্রবর্তী অবস্থানে রয়েছে। জামায়াতের লক্ষ্য হল একামতে দ্বীন৷ ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামায়াতের সকল কর্মতৎপরতা৷ বাংলাদেশের মাটিতে যে একত্ববাদ তথা তওহীদী মন মানসিকতা মানুষের অন্তরে রয়েছে, সেই তওহীদী চেতনাকে জাগ্রত করে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা আজকের যুগে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সকল নবী রাসূলদেরকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জামানার কুফরি শক্তির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে৷ এই দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে।

হযরত মুহান্মদ (সা.) এর সময়ে মুশরিক, আরবদের সঙ্গে তীব্র দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ হয়। আহলে কিতাব তথা ইহুদী নাসারাও হুমকি হয়ে দাড়ায়। মদীনায় ইহুদীদের চক্রাম্ভ ছিল ভয়াবহ৷ রোমের খৃষ্টীয় এবং পারস্যের অগ্নিপূজক এই দুই পরাশক্তির শত্রুতার সম্মুখীন ইসলামী রাষ্ট্ৰকে হতে হয়েছে। আবার মদীনায় অভ্যন্তরে মুনাফিকরা ছিল রাসূলের বিরুদ্ধবাদী৷ এসবের মোকাবিলা রাসূলকে করতে হয়েছে৷

আজকের যুগে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সহ কম্যুনিস্ট গ্রুপ ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সব থেকে বড় বাধা৷ তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বাঙালী জাতীয়তাবাদ, মুজিববাদ, জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশের মাটি থেকে মুছে দিতে আদাজল খেয়ে লেগেছে। হাসিনার পরিবার তান্ত্রিক রাজনীতিতে কম্যুনিস্টরা সঙ্গী হয়েছে৷ আওয়ামী লিগ সরকারের স্বৈরাচারী শাসনের অত্যাচারে গোটা বাংলাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। মেগালোম্যানিয়াক হাসিনার অত্যাচারে জামায়াত সহ বিরোধী দল বিএনপি চরমভাবে অত্যাচারিত। আওয়ামী লিগের সাহায্যে ব্রাহ্মাণ্যবাদী শক্তি এগিয়ে এসেছে। এই মুশরেকী শক্তি জামায়াতের অস্তিত্বকে কোনমতেই সহ্য করতে রাজী নয়। আর সেই সঙ্গে রয়েছে দুনিয়াপরাস্ত ধর্মব্যবসায়ী আলেম ও পীরেদের দল। জামায়াতের বিরুদ্ধে তাদের ফতওয়া এবং বিরোধীতা আগেও ছিল আর এখনও অব্যাহত রয়েছে। আওয়ামী লিগের তৈরি ওলামাদের দল, যাদের উলামায়ে সু’ না বলে পারা যায় না, তারাও ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

আওয়ামী লিগ জামায়াতের প্রথম শ্রেণির নেতাদের ফাঁসি দিয়েছে। অধ্যাপক গোলাম আযমের মতো বিশ্ববরেণ্য ইসলামী আন্দোলনের নেতাকে জেলে রেখে হত্যা করেছে৷ হত্যা এই জন্য বলব যে, অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মামলার যে রায় দেওয়া হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। তার পক্ষে কাউকেই সাক্ষী পেশ করতে দেওয়া হয়নি। কেবল তার এক ছেলেকে আদালতে কথা বলতে দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের অন্যান্য নেতাদের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। বিচারের নামে প্ৰহসন হয়েছে। দুনিয়ার খ্যাতিমান মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুদ্ধপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারিক রায়ের তীব্র সমালোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ম আইন মেনে ট্রাইব্যুনাল বিচার হয়নি। একথা আজ সর্বজনবিদিত৷ আওয়ামী সরকার জামায়াতকে নেতৃত্বশূন্য করতে চেয়েছে। আর চেয়েছে ভয় দেখিয়ে বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে। বাংলাদেশের খোদাভীরু, মূত্তাকি, দ্বীনদার, ইসলাম নিবেদিত অমূল্য ইসলামী নেতৃত্বগুলিকে।

মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীকে জেলের কুঠুরিতে আবদ্ধ রেখে ইসলামী আদর্শের চেতনার আওয়াজকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে স্বৈরচারী, ফ্যাসিস্ট হাসিনা। হাজার হাজার জামায়াত সদস্য, কর্মীরা নানা মিথ্যা কেসের আসামী। কেদ্রীয়, জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের অসংখ্য নেতাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। জামায়াতের নির্বাচনী নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। কোন মিটিং, প্রকাশ্য ইজতেমা করতে পারছে না জামায়াত৷ জামায়াতের অনেক সম্পত্তি দখল করা হয়েছে৷ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বন্ধ৷ জামায়াতের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম কোন রকমে কাজ করছে৷ দলের সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মহিলা সদস্যাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। ফেরাউনী রাজ কায়েম হয়েছে৷ বিএনপির খালেদা জিয়াকে যেভাবে ফাঁসানো হয়েছে তাতে হাসিনার স্বৈরাচারিতন্ত্র মুখ উন্মোচিত হয়েছে৷ তাঁকে জামিন দেওয়া হচ্ছে মামলাতে, আবার তাঁকে নানা মামলায় আটকে রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র বলে কিছুই নেই। চলছে নির্মম তানাশাহী৷ একেবারে মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাকশালী রাজত্ব চলছে৷ মুজিবুবাদের ভূত সওয়ার হয়েছে সর্বত্র৷ সীমাহীন অত্যাচার জুলুমের মধ্যেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কাজ বাড়ছে৷ আওয়ামী লিগেও ভেবেছিল জামায়াত শেষ হয়ে যাবে। কোন আদর্শবাদী ইসলামী দলকে শেষ যে করা যায়না তা হাসিনা বুঝতে পারছেন না।
সম্প্রতি একটি গবেষণামূলক বই ওই দেশে বেরিয়েছে। ‘১৯৮১-২০০০ বাংলাদেশের রাজনীতি, ইসলামী দল সমূহের ভূমিকা’ এই বইয়ে তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে লেখক লিখেছেন-জামায়াতের সদস্য (রোকন), কর্মী (কারকুন) ও সহযোগীর (মুত্তাফিক) সংখ্যা অনেক বেড়েছে৷ জামায়াতের জনসমথর্থন অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

পরিসংখ্যান এরকম :-
জামাতের রূকন সংখ্যা
২২০০০ (২০০৬) এবং ২০১৭ তে ৩৩০০০-৩৫০০০

কর্মী সংখ্যা
২ লক্ষ এবং ২০১৭ তে ৪ লক্ষ

মুত্তাফিক
১০ লক্ষ (২০১০৬) এবং ২০১৭ তে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে

জামায়াতকে সন্ত্রাসী বলে যতই কম্যুনিস্ট ও আওয়ামী লিগ দেগে দিতে চেষ্টা করুক না কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, জামায়াত হল এক অ-সরকারী সংগঠন। এই দলকে মার্কিন রাষ্ট্র সন্ত্রাসী বলতে নারাজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোন ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্ৰতিষ্ঠাকামী দলকে ভাল চোখে দেখেনা৷ তবুও জামায়াতের কার্যকলাপকে পর্যবেক্ষণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই রায় দিয়েছে। এতে বেজায় চটেছে বর্তমান আওয়ামী লিগ সরকার।

জামায়াতের নির্বাচনী নিবন্ধন বাতিল করলে কি হবে জামায়াত নির্দলভাবে রাজনীতিতে প্রার্থী দিয়ে লড়ছে। ইউনিয়ন বোর্ড, পৌরসভার ভোটেও ব্যাপক প্রার্থী দিয়েছে৷ কোথাও বিএনপির সঙ্গে জোট বজায় রেখে লড়েছে আর কোন কোন ক্ষেত্রে একাই লড়েছে। ভোটে জামায়াতের পক্ষে আগের থেকে বেশি ভোট পড়েছে৷ জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কথা আওয়ামী লিগ সরকার বারবার বলছে৷ মন্ত্রী পরিষদের কাছে কাগজপত্র না কি প্রস্তুত রয়েছে-সূত্র তাই বলছে৷ কিন্তু কেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে এখনও পারছে না? বিশেষজ্ঞদের মতামত হল জামায়াতের এক বড় সাপোর্ট বেস’ রয়েছে। কোন আদর্শবাদী দলকে বন্ধ করে রাখা যায় না। ১৯৭১ সালের পর যে সকল জামায়াত নেতা কর্মীদের জন্ম হয়েছে তাদেরকে রোখা যাবে না। সবাইকে তা মুক্তি যুদ্ধের বিরোধী বলে দেগে দেওয়া যাবে না৷ এছাড়া জামায়াতের আর্থিক সোর্স দূর্বল নয়। দল হিসাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে তাতে সফল হতে পারবে না সরকার। এ মত ড. তোফায়েল আহমদ সাহেবের৷ আইন দিয়ে দর্শন, আদর্শবাদী চেতনাকে রোখা যায় না। এদলকে মুছা যাবে না। তোফায়েল সাহেব তাই বলেছেন। মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দল হিসাবে জামায়াত এখন অনেক সুসংগঠিত। জামায়াতকে বিএনপি থেকে সরানোর চেষ্টায় কিছুটা সফল হলেও উভয়ের মধ্যে মেলবন্ধন হয়েছে। তিনি মনে করেন- পরিচয় সত্তার রাজনীতি বাংলাদেশে রয়েছে। আওয়ামী লিগও এই আইডেন্টিটি পলিটিক্স করে এসেছে বলেই সংবিধানে রাষ্ট্ৰধর্ম হিসাবে ইসলামকে রেখে দিয়েছে৷ এ তো মুক্তি যুদ্ধের চেতনার বিরোধী৷ কিন্তু আইডেন্টিটি পলিটিক্স তাকেও করতে হচ্ছে। আওয়ামী লিগ হয়ত চাচ্ছে এরশাদের জাতীয় পার্টির মতো জামায়াতকে ট্রামকার্ড হিসাবে ব্যবহার করবে৷ এ জন্য আওয়ামী লিগ ও জামায়াতের মধ্যে সিলেট পৌরসভা নির্বাচনে বোঝাপড়া হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে লিগ আর ভাইস চেয়ারম্যান পদ জামায়াত পাবে এই সমঝোতা হয়। আবার জামায়াত নিজস্ব দলীয় সংবিধান চেঞ্জ করেছে৷ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত যখন চেঞ্জ করেছে দলীয় গঠনতন্ত্রের তখন তাকে নিষিদ্ধ করে রাখা যাবে না। তবে মহিউদ্দিন সাহেবের দুটি কথাতে সায় দেয়া যায়না। জামায়াত মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল নয় যে, মুসলিম আইডেন্টিটি পলিটিক্স করবে। ওসব তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষবাদী ও জাতীয়তাবাদীরা করে থাকে৷ জামায়াত ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করছে। তবে বৈধ মুসলিম স্বার্থ ও ইসলামের বিষয়টিকে ভিন্ন করে দেখা যায় না। জামায়াত তাই মনে করে। বাংলাদেশের সামগ্রিক কল্যাণও তার লক্ষ্য তবে তা ইসলামের নিরিখে জামায়াত বিবেচনা করে থাকে৷ দ্বিতীয়, জামায়াতকে এরশাদের দলের মতো ট্রাম কার্ড হিসাবে হাসিনার দল ব্যবহার করবে তা একেবারেই অসম্ভব৷ তবে বিএনপি ও আওয়ামী লিগের মধ্যে জামায়াত কখন কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে কতটা বোঝাপড়া করবে তা জামায়াত নেতৃত্বই ভালোই বোঝে৷ তবে ইসলামী আদর্শ মাথায় রেখে করবে৷ (সৌজন্যে-সাপ্তাহিক মীযান)