টিডিএন বাংলা ডেস্ক: এক অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে পৃথিবী। যতোই দিন যাচ্ছে ততোই আশঙ্কা বাড়ছে। যেন বিদ্যুত্বের গতিতে বাড়ছে করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত সংখ্যা। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় এই মরণঘাতি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এক লাখেরও বেশি মানুষ। আর মৃতের সংখ্যা ৬০ হাজার ১১৫ জন। আর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ জন। জনহপকিনস ইউনিভার্সিটি এখবর দিয়েছে। অথচ শুক্রবারও এই সংখ্যাটা ছিল ১০ লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ মাত্র একদিনেই নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এক লাখেরও বেশি।
করোনা ভাইরাস নিয়ে লাইভ আপডেট দেয়া ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডমিটারের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে এখন আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৭৭ হাজার ৫২২ জন। যার মধ্যে মারা গেছেন ৭ হাজার ৪০৩ জন। আর সুস্থ হয়েছেন ১২ হাজার ২৮৩ জন।
আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে স্পেনে ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৩৬ জন, ইতালিতে ১ লাখ ১৯ জাার ৮২৭ জন, জার্মানিতে ৯১ হাজার, ফ্রান্সে ৮২ হাজার, চীনে ৮১ হাজার, ইরানে ৫৬ হাজার, যুক্তরাজ্যে ৩৮ হাজার, তুরস্কে প্রায় ২১ হাজার, সুইজারল্যান্ডে প্রায় ২০ হাজার, বেলজিয়ামে সাড়ে ১৮ হাজার, নেদারল্যান্ডে পৌনে ১৬ হাজার, কানাডায় সাড়ে ১২ হাজার, অষ্ট্রিয়ায় পৌনে ১২ হাজার, পর্তুগাল পৌনে ১০ হাজার, ইসরাইলে সাড়ে ৭ হাজার, সুইডেনে ৬ হাজার, অস্ট্রেলিয়ায় সাড়ে ৫ হাজার এবং নরওয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজারের অধিক মানুষ।
আর মৃত্যুর সংখ্যার দিকে থেকে ইতালিতে ১৪ হাজার ৬৮১ জন, স্পেনে ১১ হাজার ৭৪৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রে ৭ হাজার ৪০৩ জন, ফ্রান্সে ৬ হাজার ৫০৭ জন, যুক্তরাজ্যে ৩ হাজার ৬০৫ জন, ইরানে ৪ হাজার ৪৫২ জন, নেদারল্যান্ডে ১ হাজার ৪৮৪ জন, বেলজিয়ামে ১ হাজার ২৮৩ জন, জার্মানিতে ১ হাজার ২৭৫ জন, সুইজারল্যান্ডে ৬০৪ জন, তুরস্কে ৪২৫ জন, ব্রাজিলে ৩৬৫ জন, সুইডেনে ৩৫৮ জন, পর্তুগালে ২৪৬ জন, কানাডয় ২০৮ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯১ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৭৭ জন, অস্ট্রিয়ায় ১৬৮ জন, ইকুয়েডরে ১৪৫ জন, ফিলিপাইনে ১৪৪ জন, রোমানিয়ায় ১৪১ জন, ডেনমার্কে ১৩৯ জন, আইয়ারল্যান্ডে ১২০ এবং আলজেরিয়ায় ১০৫ জন। এছাড়াও একশ’র নিচে এমন দেশের সংখ্যা প্রায় ৪০ টিরও বেশি।
বিশেষজ্ঞারা বলছেন, সম্ভবত কয়েক দশকের মধ্যে মানবজাতির জন্য এটিই সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি। কোন দিকে যাচ্ছে পৃথিবী? নাকি একটা আমূল পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে? আগামীর পৃথিবী কেমন হবে তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের উপর।
অর্থনৈতিক এক পরিবর্তন আসবে এটা নিশ্চিত। আর বৈশ্বিক রাজনীতিতেও একটা পরিবর্তন আসতে পারে। সেটা হয়তো পুঁজিবাদী সভ্যতার ক্রমবর্ধমান ধারা বিকাশ, অথবা সম্রাজ্যবাদী-সমাজবাদীদের পতন, অথবা ধর্মপন্থিদের উত্থান। এছাড়াও আগামীর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও হয়তো ঢেলে সাজবে।
এদিকে ইকুয়েডরের সবচেয়ে জনবহুল শহর গুয়াইয়াকিলে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে মানুষজন শুধুমাত্র জনাকীর্ণ হাসপাতাল মারা যাচ্ছে তা নয়, এখানে মানুষকে রাস্তায় মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোভিড-১৯ এর কারণে বাড়িতে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের লাশগুলো সরিয়ে নিতেও কয়েকদিন সময় লেগে যাচ্ছে। কারণ লাশ সরিয়ে নেয়ার তালিকা আর এর জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। গুয়াইয়াস প্রদেশে করোনা ভাইরাসের কারণে পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুরো ল্যাটিন অ্যামেরিকার সবগুলো দেশ মিলিয়ওে এই পরিমাণ মানুষ মারা যায়নি করোনাভাইরাসে। ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ১৯৩৭ জনের মধ্যে। প্রদেশটির রাজধানী গুয়াইয়াকিলেই মোট আক্রান্তের ৭০% রোগীর বসবাস। এটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শহরগুলির মধ্যে একটি যেখানে মাথাপিছু করোনা ভাইরাস আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি।
তার উপর, ভাইরাস পরীক্ষার আগেই যারা মারা গেছেন তাদেরকে এই পরিসংখ্যানের বাইরে রাখা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ইকুয়েডরে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা তৃতীয় সর্বোচ্চ – এর আগে রয়েছে ব্রাজিল এবং চিলি- তবে জনসংখ্যার অনুপাতে ইকুয়েডরে মৃত্যুর হার অন্যান্য দেশের চাইতে বেশি। গুয়াইয়াকিলের শেষকৃত্য আয়োজকরাও এই পরিথিতি সামলে উঠতে পারছে না। সঙ্কটের মাত্রা এমন যে প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো মৃতদেহ সরিয়ে নিতে এবং সমাহিত করতে বিশেষ টাস্কফোর্স তৈরি করেছেন। “আমার মামা সেগুন্দো ২৮ শে মার্চ মারা গিয়েছিলেন এবং কেউই আমাদের সাহায্য করতে আসেনি।” বলেন, জেসিকা কাস্তেদা। তিনি রাজধানী থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দক্ষিণে ২৫ লাখ জন বসতির কুইটো শহরে বাস করেন।
হাসপাতালে বিছানা পাওয়া যায়নি এবং তিনি বাড়িতেই মারা যান। আমরা জরুরি সেবা সংস্থাগুলোয় খবর দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের বলেছে ধৈর্য্য ধরতে। তার লাশ এখনও বিছানায় পড়ে আছে, আমরা ছুঁয়েও দেখতে পারিনি।
করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি চীনের উহান শহরে। এ ভাইরাসে দেশটিতে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা গোপনের অভিযোগ উঠেছে। চীনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৫০ হাজার ব্যক্তি মারা গেছে। দেশটি মৃত ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রকৃত তথ্য দেয়নি। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
চীনের সাময়িকী ক্যাক্সিনের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, উহানের হানকাউ নামের একটি শ্মশানে প্রতিদিন ১৯ ঘণ্টা ধরে মৃতদেহ সৎকার হয়েছে। মাত্র দুদিনে সেখানে ৫ হাজার ব্যক্তির মরদেহ পোড়ানো হয়। অনলাইনে পোস্ট করা ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো একটা হিসাব বের করেছে। এ হিসাবে গত ২৩ মার্চ থেকে মৃতদেহ সৎকার শেষে উহানে শব বা মৃতদেহের ছাই ভরা ৩ হাজার ৫০০ কলস ফিরে এসেছে প্রতিদিন। এই হিসাবে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১২ দিনে উহানে ৪২ হাজার ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন সরকার করোনাভাইরাসের কারণে মৃত্যুর যে সংখ্যা দিয়েছে, তা উহানে মৃত্যুর সংখ্যা থেকে ১৬ গুণ বেশি। প্রতিবেদনে রেডিও ফ্রি এশিয়া ফ্রির বরাত দিয়ে বলা হয়, উহানে ৮৮টি চুল্লিতে দিনরাত মৃতদেহ পোড়ানো হয়েছে। সেখানে ৪৮ হাজার ৮০০ ব্যক্তিকে পোড়ানো হয়েছে।
উহানের একজন বাসিন্দা ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, সরকারি তথ্য মোটেও ঠিক নয়। কারণ শ্মশানের চুল্লিগুলো দিনরাত লাশ পোড়ানোর কাজ করেছে। তাহলে কীভাবে নিশ্চিত করে বলা যায়, এত কম মানুষ মারা গেছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাও জানিয়েছে, চীন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত মানুষের তথ্য গোপন করছে। প্রকৃত অবস্থা আরও ভয়াবহ।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, চীন করোনাভাইরাস মহামারির তথ্য খোলামেলা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র করোনায় মৃত মানুষের সংখ্যা নিয়ে লজ্জাজনক মন্তব্য করছে।
ফ্রান্সের ছয় শত সেনা সদস্য মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লি আজ শনিবার এক ঘোষণায় এই তথ্য জানিয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেছেন, ‘পরিস্থিতি দিন দিন আরও বিস্তার লাভ করছে এবং আমরা তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তবে আমাদের সামরিক বাহিনীর কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি।’
গত বৃহস্পতিবারে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, পশ্চিম ও উত্তর-মধ্য আফ্রিকার একটি আধা-শুষ্ক অঞ্চল, যা সেনেগাল থেকে সুদান পর্যন্ত বিস্তুত, সেই সাহেল অঞ্চলে দায়িত্বরত দেশটির চার সেনা সদস্যের দেহে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
করোনা প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্র এখন ইউরোপ। মহাদেশটিতে এই মহামারিতে সবচেয়ে বিপর্যস্ত দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্স অন্যতম। দেশটিতে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা এখন ৬ হাজার ৫০০ এর বেশি। এছাড়া ৮২ হাজারের বেশি মানুষ এখন সেখানে করোনায় আক্রান্ত।
করোনায় সবচেয়ে বাজে অবস্থা ইউরোপ ও আমেরিকার। করোনায় বেশিরভাগ মৃত্যু হয়েছে এই দুই মহাদেশে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ইতালিতে; ১৪ হাজার ৭৮১ জন। ইউরোপের আরেক দেশ স্পেনের অবস্থান তারপরই। সেখানে মৃত্যু হয়েছে ১১ হাজার ৭৪৪ জনের।