টিডিএন বাংলা ডেস্ক: ‘চিকিৎসায় অভাবে’ সোমবার আদালতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মিসরের প্রথম ও শেষ গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে রাজধানী কায়রোতে গোপনে দাফন করা হয়েছে। কায়রোর পূর্বাঞ্চলে মদিনা নাসার সিটিতে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টায় তাকে দাফন করা হয়। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ তথ্য জানান মুরসির ছেলে আহমদ মুরসি। খবর রয়টার্স, আল জাজিরা ও আনাদোলু। আহমদ মুরসি জানান, মুরসির নিজ শহর শারকিয়্যায় তার দাফন হোক সেটি চেয়েছিল তার পরিবার। কিন্তু মিসর সরকার সেই আবেদন মঞ্জুর করেনি। আমরা টোরা কারা-হাসপাতালে তাকে গোসল করিয়েছি। গতকাল ভোরে জানাজার নামাজ আদায় করে মদিনা নাসার সিটির গোরস্তানে মুসলিম ব্রাদারহুডের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের কবরের পাশে মিসরের অবিসংবাদী এই নেতাকে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত সোমবার আদালতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মিসরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একমাত্র প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। মোহাম্মদ মুরসি মুসলিমপন্থী দল মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপরের সারির নেতা ছিলেন। ২০১২ সালের ৩০ জুন তিনি মিসরের প্রেসিডেন্ট হন। এক বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ৩ জুলাই সামরিক অভ্যুত্থানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি। প্রেসিডেন্ট মুরসিই তাকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করেছিলেন।

মোহাম্মদ মুরসির বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি ৬ বছর ধরে জেলে বন্দি ছিলেন। ডায়াবেটিস, লিভার ও কিডনিসহ বিভিন্ন রোগে দীর্ঘদিন ভুগছিলেন তিনি। গ্রেফতারের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কারান্তরালে ছিলেন মুরসি। তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। তার বিরুদ্ধে রয়েছে কমপক্ষে ৬টি মামলা। মিসরের আদালত মুরসিকে সাত বছরের কারাদন্ড দেয়। সে সময় মুরসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ভুল তথ্য দিয়েছিলেন।

মুরসির বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ ছিল, তিনি অর্থের বিনিময়ে কাতারের কাছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি পাচার করেছেন। ২০১৪ সালে তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের জুন মাসে তথ্য পাচারের এ মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন নিম্ন আদালত। এছাড়া তার বিরুদ্ধে রয়েছে জেলবিদ্রোহ, বিচার বিভাগকে অবমাননা ও সন্ত্রাসে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। তবে তার সমর্থকরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন।

মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুরসিকে শহীদ বলে আখ্যায়িত করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর শোকবার্তায় তিনি বলেন, আমার ভাই মুরসি শহীদ হয়েছেন কাঠগড়ায়। মিসরীয়দের মুক্তির জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কাজ করেছেন মুরসি। মুরসি যে সংগ্রাম করে গেছেন, সেটি সব মুসলমান যুগ যুগ স্মরণ করবে। তিনি দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করেন।

এরদোগান বলেন, আমাদের কাছে মোহাম্মদ মুরসি শহীদ। ইতিহাস সেই (সিসি) একনায়ককে ক্ষমা করবে না যে কিনা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে জেল দিয়েছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নির্যাতন করেছে এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি তার হাজার হাজার বিপ্লবী সমর্থককে নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে কারাগারে ছিলেন। কিন্তু পাশ্চাত্যের কেউ এর প্রতিবাদ করেনি।

এরদোগান বলেন, আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের শহীদ ভাইদের জন্য দোয়া করছি। আল্লাহ যেন শহীদদের ওপর রহম করেন। আদালতের এজলাসেই তার মৃত্যু হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি আল্লাহর কাছেই রহমত কামনা করি।
ইস্তাম্বুলের হ্যালিক সেন্টারে দেয়া এক বক্তৃতায় মিসরের শাসকের সমালোচনা করে মুসলিম বিশ্বের এ নেতা বলেন, মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি জনগণের ভোটে নির্বাচিত মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল, গণতন্ত্রকে পদদলিত এবং ক্ষমতায় এসে ৫০ জনকে ফাঁসি দিয়েছেন।

তিনি বলেন, মুরসি গণতান্ত্রিক উপায়ে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু দেশটির সামরিক বাহিনী এ বাস্তবতা মেনে নেয়নি। তারা মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সব ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছিল।
এরদোগান বলেন, মুরসিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার সব ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তিনি আদালতে গিয়েও তার ওপর জুলুমের প্রতিবাদ করেছেন। মিসরের জনগণ ও নিজের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিবাদী মুরসির এ মৃত্যু-জুলুমের সাক্ষী হয়ে থাকবে। মিসরের নিপীড়ক শাসক গণতন্ত্র কায়েম করতে গিয়ে গ্রেফতার হওয়া নেতাদের জুলুম করে হয়তো সাময়িক বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু তাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস মিসরীয়দের মন থেকে মুছে দিতে পারবে না।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচনা করে বলেন, সিসি ক্ষমতায় আসার পর মিসরীয়দের ফাঁসি দিলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বিষয়ে নীরব থেকেছে। এমনকি মিসরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলো অংশ নিয়েছে যখন সেখানে ফাঁসির ঘটনা ঘটছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইউরোপ মানবাধিকার বিষয়ে দ্বিমুখী আচরণ করছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) দাবি করেছে, কারাগারে সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে মোহাম্মদ মুরসিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে দেশটির সরকার। আন্তর্জাতিক এ মানবাধিকার সংস্থাটি মুসরির মৃত্যুর বিষয়ে নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্ত করতে জাতিসংঘের কাছে দাবি জানিয়েছে।

গত সোমবার মুরসির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর এক টুইটবার্তায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক সারাহ লি উইটসন বলেন, মুরসির মৃত্যুর ঘটনা ভয়ঙ্কর। তবে এটি অনুমেয়। কারণ দেশটির সরকার মুরসিকে সঠিক চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, মিসরের সেনাশাসিত সরকার মুরসিকে বছরের পর বছর বিনা চিকিৎসায় জেলে ভরে রেখেছে। জেলে থাকাবস্থায় তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে দেয়া হয়নি। এমনকি তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি। তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করতেও দেয়া হয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এই কর্মকর্তা বলেন, মিসরের একনায়ক সরকার মুরসিকে ন্যূনতম বন্দি অধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছে। তার প্রতি স্পষ্টত মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। আমরা এর নিন্দা জানাই। সেই সঙ্গে মুরসির স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রমাণ দাবি করছি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, মুরসির মৃত্যুর দায় এখন মিসর সরকারকে নিতে হবে। তারা তার উপযুক্ত মেডিকেল সেবা ও কারাগারে বন্দির মৌলিক অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

বেশ কয়েক বছর ধরে রিপোর্ট প্রকাশ হচ্ছিল যে, মুরসির সঙ্গে কারাগারে অশোভন আচরণ ও নির্যাতন করা হচ্ছে। তাই অধিকারকর্মীরা বলছেন, তার মৃত্যুকে জেলখানায় নিঃসঙ্গ রেখে তার ওপর পর্যায়ক্রমে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত।
অন্যদিকে একই রকম বিবৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক আরেক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা বলেছে, সাবেক এই প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর দায় নিতে হবে মিসর সরকারকে। মুরসি মারা যাওয়ার শেষ কয়েক ঘণ্টায় সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে তারা।

এদিকে মুরসির রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুড দাবি করেছে, মোহাম্মদ মুরসিকে হত্যা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে দেশে দেশে মিসরীয় দূতাবাসগুলোর বাইরে বিক্ষোভের ডাক দেয় মুসলিম ব্রাদারহুড। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ হয়েছে। তবে তারা তাদের নেতা মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যুকে একটি হত্যাকান্ড আখ্যায়িত করে তার জানাজায় গণজমায়েত আহ্বান করেছিল। নিজেদের ওয়েবসাইটে মুসলিম ব্রাদারহুড একটি বিবৃতি দিয়েছে। তাতে সারা বিশ্বে মিসরীয় দূতাবাসের বাইরে প্রতিবাদে জমায়েত হতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। (সাবাহ,আল জাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি,ইনকিলাব)