টিডিএন বাংলা ডেস্ক: নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) দায়ের করা মায়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের শুনানি শুরু হয়েছে। গতকাল বক্তব্য দেন বাদি গাম্বিয়ার আইনজীবী আবু বাকার তামাদুর। সঙ্গে ছিলেন পায়াম আখাবানসহ দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ আইনজীবীরা।
এরই মধ্যে মায়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে একটি আইনি দলকে নেতৃত্ব দিতে হেগ-এ পৌঁছেছেন। গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবদুল কোয়াই আহমেদ ইউসুফও শুনানিতে উপস্থিত রয়েছেন। সূত্র : ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্স, ইউএনবি।

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ১১ নবেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা করেছে। মায়ানমার গণহত্যা, ধর্ষণ এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ধ্বংস করছে বলে অভিযোগ করেছে মামলায়। গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার শুনানির জন্য ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে গতকাল মঙ্গলবার শুনানি করে গাম্বিয়া। আর আজ ১১ ডিসেম্বর শুনানি করবে মায়ানমার।
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানিতে উপস্থিত থাকতে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি টিম ছাড়াও মানবাধিকার কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। এ শুনানিতে বাংলাদেশ গাম্বিয়াকে তথ্য উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করবে। গণহত্যা অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি সম্পর্কিত কনভেনশনের লঙ্ঘনের অভিযোগে মায়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ায় আবেদনের স্বাগত জানিয়েছে কানাডা এবং নেদারল্যান্ডস।
আদালতে ১৫ জন বিচারপতির সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দু’জন এডহক বিচারপতি। ওই দুজন গাম্বিয়া ও মায়ানমারের মনোনীত। আদালতের সিদ্ধান্ত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।
আদালতে অং সান সু চি মায়ানমারের পক্ষে হাজির হয়েছেন। গাম্বিয়ার পক্ষে আছেন দেশটির আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। নিয়মানুয়ায়ী শুরুতেই দুই এডহক বিচারপতি গাম্বিয়ার নাভি পিল্লাই এবং মায়ানমারের প্রফেসর ক্লাউস ক্রেস শপথ নিয়েছেন।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরের শান্তি প্রাসাদে (পিস প্যালেস) যুগান্তকারী এই মামলাটির শুনানি হচ্ছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালিয়ে মিয়ানমার বৈশ্বিক সনদ লঙ্ঘন করেছে কি না, তার বিচারই আইসিজের এই শুনানির উদ্দেশ্য। একই শহরের ১০ কিলোমিটারের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), যেখানে মায়ানমারের বিরুদ্ধে এর আগে উত্থাপিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।
আইসিজের মামলাটি যুগান্তকারী দু’টি কারণে। প্রথমত, প্রতিবেশী না হয়েও বৈশ্বিক সনদে স্বাক্ষরকারী হিসেবে মায়ানমার থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরের আরেকটি উপমহাদেশ আফ্রিকার রাষ্ট্র গাম্বিয়া এই মামলার বাদী। গণহত্যার অভিযোগে আইসিজেতে এর আগে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো ছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে (সার্বিয়া বনাম বসনিয়া এবং সার্বিয়া বনাম ক্রোয়েশিয়া)। দ্বিতীয়ত, এই প্রথম মানবাধিকারের লড়াইয়ের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একজন রাজনীতিক গণহত্যার সাফাই দিতে হাজির হয়েছেন শান্তি প্রাসাদে। ১৯৯১ সালে শান্তি পুরস্কার বিজয়ের ২৮ বছর পর সামরিক শাসনোত্তর মায়ানমারের প্রথম বেসামরিক সরকারের প্রধান অং সান সু চি তাঁর দেশের সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে অবতীর্ণ হচ্ছেন। ২০১৭ সালের আগস্টে শুরু হওয়া রোহিঙ্গাবিরোধী সামরিক অভিযানের পর সু চি জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক ফোরামে খুব কমই অংশ নিয়েছেন।
সু চির বিরুদ্ধে সর্বজনীন এখতিয়ার নীতির আলোকে নেদারল্যান্ডসে মামলা হয়েছে বলে শোনা গেলেও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই নীতির আলোকে মামলায় নেদারল্যান্ডসে গত সেপ্টেম্বরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে একজন সিরীয় বিদ্রোহী নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে সরকারপ্রধান হিসেবে সু চি দায়মুক্তির অধিকারী হওয়ায় তাঁর গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেই ধারণা করা হয়। আর্জেন্টিনায় তাঁর বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।
গাম্বিয়ার পক্ষে মামলায় প্রতিনিধিত্ব করছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। রুয়ান্ডার গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তামবাদুর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনে বিশেষজ্ঞ যুক্তরাজ্যের অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডসসহ বেশ কয়েকজন বিশ্ব পরিসরে নেতৃস্থানীয় আইনজ্ঞের শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন। গতকাল মঙ্গলবার আদালতে গাম্বিয়ার বক্তব্য উপস্থাপন করার কথা এবং আজ বুধবার মায়ানমার তার অবস্থান তুলে ধরবে। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে গাম্বিয়া এবং বিকেলে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খ-ন ও চূড়ান্ত বক্তব্য পেশ করবে। মামলার রায় পেতে স্বল্পতম আট সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত লাগতে পারে।
মায়ানমার বিশেষজ্ঞ ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সাবেক বার্তা সম্পাদক ল্যারি জ্যাগান গত সোমবার ব্যাংকক পোস্ট-এ এক নিবন্ধে লিখেছেন, আইসিজের শুনানিতে মিয়ানমারের আইনি দলের প্রধান হিসেবে যুক্ত হয়েছেন গণহত্যা ও আন্তর্জাতিক আইনে বিশেষজ্ঞ কানাডার মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী অধ্যাপক উইলিয়াম সাবাস। মিয়ানমারের অ্যাটর্নি জেনারেল তুন তুন ও, দুই জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক দুই আইনজীবী যুক্ত আছেন মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলে।
আইসিজেতে এই শুনানি উপলক্ষে এবং দ্য হেগ শহরে গাম্বিয়া ও মায়ানমার ছাড়াও অন্য কয়েকটি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা হাজির হয়েছেন। এসব দেশের মধ্যে আছে বাংলাদেশ ও কানাডা। মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থন দিতে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কূটনীতিকেরাও উপস্থিত হয়েছেন। আরও জড়ো হয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী এবং মায়ানমার সরকারের সমর্থকেরা।
আদালতে গত ১১ নভেম্বর পেশ করা আবেদনে গাম্বিয়া বলেছে, কথিত শুদ্ধি অভিযানের সময় গণহত্যামূলক কর্মকা- সংঘটিত হয়েছে, যেগুলোর উদ্দেশ্য ছিল গোষ্ঠীগতভাবে অথবা আংশিকভাবে রোহিঙ্গাদের ধ্বংসসাধন। এ জন্য পাইকারি হত্যা, ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতা, কখনো কখনো বাড়িতে লোকজনকে আটকে রেখে জ্বালিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে গ্রামগুলোর পদ্ধতিগত ধ্বংস সাধন করা হয়েছে। গাম্বিয়া গণহত্যা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের ৩ নম্বর ধারার আলোকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। গাম্বিয়া ও মায়ানমার উভয় দেশই ১৯৪৮ সালে গৃহীত এই সনদে স্বাক্ষরকারী এবং ওই ধারায় সনদ লঙ্ঘনবিষয়ক বিরোধ আইসিজেতে নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। গাম্বিয়া সনদ লঙ্ঘনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিষয়টি নিরসনে গত ১১ অক্টোবর মায়ানমারকে কূটনৈতিকভাবে চিঠি দেয়।
আইসিজের নবনিযুক্ত রেজিস্ট্রার ফিলিপ গটিয়ে সম্প্রতি ইউএন রেডিওকে বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত হচ্ছে জাতিসংঘের একটি প্রতিষ্ঠান এবং এর লক্ষ্য হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি। এই আদালতে রাষ্ট্র ছাড়া কেউ অভিযোগ করতে পারে না। বিরোধে লিপ্ত উভয় পক্ষের সম্মতি ছাড়া আদালত কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন না। মামলার শুনানিতে মায়ানমারের অংশগ্রহণকে তাই আইন বিশেষজ্ঞরা আদালতের প্রতি দেশটির আস্থার বহিঃপ্রকাশ বিবেচনা করে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য কিছু অন্তর্র্বতীকালীন পদক্ষেপ নেওয়ারও আবেদন জানিয়েছে গাম্বিয়া। এগুলোর মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়ন বন্ধ রাখা এবং গণহত্যার সব ধরনের আলামত নষ্ট না করা।
রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মায়ানমারের বিরুদ্ধে বিচারে গাম্বিয়াকে সব ধরনের সহযোগিতা আর সমর্থন দেবে কানাডা ও নেদারল্যান্ডস। আইসিজেতে বিচারের শুনানি শুরুর আগে দুই দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে এ ঘোষণা দিল। দুই দেশের পক্ষে অটোয়া থেকে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত সোমবার বিবৃতিটি প্রচার করে। কানাডা ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জবাবদিহি সমুন্নত রাখা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি রোধ করতে দুই দেশ যৌথভাবে গাম্বিয়ার উদ্যোগে অব্যাহতভাবে সমর্থন ও সহায়তা দিতে সম্ভাব্য সব উপায় খুঁজে দেখবে।
১৫ সদস্যের আদালত
এই আদালতের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন সোমালিয়ার বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট চীনের বিচারপতি ঝু হানকিন। বিচারকদের নির্বাচন করেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদ। অন্য সদস্যরা হলেন স্লোভাকিয়ার বিচারপতি পিটার টমকা, ফ্রান্সের বিচারপতি রনি আব্রাহাম, মরক্কোর মোহাম্মদ বেনুনা, ব্রাজিলের অ্যান্টোনিও অগাস্টো কানকাডো ত্রিনাদে, যুক্তরাষ্ট্রের জোয়ান ই ডনোহু, ইতালির গর্জিও গাজা, উগান্ডার জুলিয়া সেবুটিন্দে, ভারতের দলভির ভান্ডারি, জ্যামাইকার প্যাট্রিক লিপটন রবিনসন, অস্ট্রেলিয়ার রির্চাড ক্রর্ফোড, রাশিয়ার কিরিল গিভরগিয়ান, লেবাননের নওয়াফ সালাম এবং জাপানের ইউজি ইওয়াসাওয়া।
বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চালানো দুটি নৃশংস জাতিনিধন অভিযানে বাড়িতে মানুষ হত্যা, নারী ও যুবতীদের ধর্ষণ, পুরো সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ তদারকি করেছে সেনাবাহিনী। এর শিকার হয়ে কমপক্ষে ৮ লাখ রোহিঙ্গা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
সামরিক জান্তার সমালোচনা করার জন্য অং সান সুচিকে ১৫ বছর গৃহবন্দী থাকতে হয়েছে। এর পরে বাইরের অনেকে, বিশেষ করে তার দীর্ঘদিনের সমর্থনদাতা পশ্চিমারা মনে করেছিলেন, সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়ি খর্ব করতে তিনি তার ক্ষমতা ও নৈতিকতার অবস্থানকে ব্যবহার করবেন। কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি দমনপীড়নের পক্ষ নিয়েছেন। দাবি করছেন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর আচরণ সম্পর্কে মিথ্যা খবরের ‘আইসবার্গ’ সৃষ্টি করছে।
তার উদ্বেগজনক অনেক চিহ্নের মধ্যে অন্যতম হলো তার ফেসবুক পেইজ। সেখানে তিনি তার আভ্যন্তরীণ সব জনসংযোগ ব্ষিয়ক পোস্টের জন্য এটা ব্যবহার করে থাকেন। যৌন সন্ত্রাসের হাত থেকে বেঁচে থাকা একটি রিপোর্টের উল্লেখ করে তাতে লাল ব্যানার দেয়া হয়েছিল। তাতে লেখা ‘ফেইক রেপ’। তার আচরণ ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অনেকে বলেছেন, স্টেট কাউন্সেলর হিসেবে সুচি এমন একজন ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন, যিনি সেনাবাহিনীর কাছে মাথা নত করে দিয়েছে। কিন্তু অন্তত কেউ তার কাছ থেকে, নীতিগত এই ভিন্নমতাবলম্বীর কাছ থেকে কিছুটা বিরোধিতা প্রত্যাশা করতে পারেন।
তার পরিবর্তে, দু’বছর পরে, আন্তর্জাতিক আদালতে তিনি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার পক্ষে কথা বলছেন। তার দেশের সন্ত্রাসের হুমকিকে সমালোচকরা খাটো করে দেখছেন এমনটা দাবি করে হেগে যাত্রাকে মিয়ানমারের ‘জাতীয় স্বার্থের’ জন্য লড়াই বলেছেন। রোহিঙ্গাদের নির্যাতনে তার সমর্থন এই নৃশংসতাকে জনপ্রিয়তা এনে দিতে সহায়তা করেছে। একটি র্যালির এক আয়োজক বলেছেন, যদি একটি দেশের নেতা বলেন যে, লেবু মিষ্টি, তাহলে আমাদেরকেও বলতে হবে তা মিষ্টি।
কিন্তু আভ্যন্তরীণ রাজনীতি কৌতূহল এবং প্রাসঙ্গিক কথা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারিক কার্য্যে কোনো উপকারে আসবে না। সেখানে প্রকৃত সত্যই মূল। এর এই প্রকৃত সত্য জমা হচ্ছেই। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তাদের রিপোর্টে বলেছে, গণহত্যা প্রতিরোধে, গণহত্যার তদন্ত করতে যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাতে ব্যর্থ হচ্ছে মিয়ানমার। একই সঙ্গে গণহত্যার জন্য বৈধভাবে ক্রিমিনালাইজিং করা ও শাস্তি দেয়ার বিষয়েও ব্যর্থ হচ্ছে মিয়ানমার।

‘গাম্বিয়া গাম্বিয়া’ স্লোগানে মুখর রোহিঙ্গা ক্যাম্প’:
গাম্বিয়া গাম্বিয়া স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠেছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প।
পশ্চিম আফ্রিকার এ দেশটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে মায়ানমারের বিরুদ্ধে গত ১১ই নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলা করেছে। এর প্রেক্ষিতে গতকাল সকালে কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইসিজে গণহত্যার বিচারের আগে ‘গাম্বিয়া, গাম্বিয়া!’ স্লোগানে মুখর করে তোলেন রোহিঙ্গারা। সাইফুর রহমান নামে এক ব্যক্তি তার টুইটে এ স্লোগানের একটি ভিডিও চিত্র প্রকাশ করেন।
হেগে রোহিঙ্গা নারীর ক্ষোভ
মায়ানমারে সেনাবাহিনী ধর্ষণ করেছে রোহিঙ্গা নারী হাসিনা বেগমকে (২২)। সেই মানসিক ক্ষত এখনও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন। আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে আশ্রয়শিবিরে। দেশ ছেড়ে আসার পর এই প্রথমবার তিনি আশ্রয়শিবিরের বাইরে গিয়েছেন। গত সোমবার পৌঁছেছেন নেদারল্যান্ডসের হেগে। তার সঙ্গে রয়েছেন আরো দু’জন নির্যাতিতা ও একজন দোভাষী। মায়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার মামলায় শুনানিতে অংশ নিতে তারা সেখানে গিয়েছেন।
হাসিনা বেগমের দৃপ্ত কন্ঠ। তাতে ক্ষোভ ঝরে পড়ছে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে তিনি বলেছেন, তারা আমার সঙ্গে, আমার আত্মীয়দের সঙ্গে ও আমার বন্ধুদের সঙ্গে এসবই করেছে। আমি তাদের চোখে চোখ রেখে এ কথা বলতে পারবো। তাদের চোখের ওপর তাকিয়ে বলতে পারবো। কারণ, আমি মিথ্যা বলছি না।
হেগে হোটেলকক্ষে অবস্থানকালে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হাসিনা বেগম আরো বলেন, আমার কাছে এখন খুব ভাল লাগছে। মায়ানমারের সেনাবাহিনী আমাদের বহু নারীকে ধর্ষণ করেছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য চাই, যেন আমরা ন্যায়বিচার পাই।
রয়টার্স লিখেছে, তিন দিনের শুনানিতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচি আদালতে গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেখাতে পারেন যে, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হামলার জবাবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নেমেছিল সেনারা।
এই শুনানি হবে আইসিজের ১৭ বিচারকের প্যানেলে। তবে তারা গণহত্যার মুল অভিযোগ নিয়ে শুনানি করবেন না। গাম্বিয়ার অনুরোধ আদালত যেন এমন একটি রায় দেন যে, মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এমন সব কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে মিয়ানমারকে। গাম্বিয়া আদালতে যুক্তি তুলে ধরবে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্সে’র সময় ব্যাপক ও পর্যায়ক্রমিক নৃশংসতা চালিয়েছে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে। এটাকে গণহত্যা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা জাতিকে পুরোপুরি অথবা অংশবিশেষকে ধ্বংস করে দিতে গণহত্যা চালানো হয়েছে। এক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে গণহত্যা, ধর্ষণ, অন্যান্য যৌন নির্যাতন, তাদের গ্রামগুলোতে অগ্নিসংযোগ, কখনো ঘরের ভিতর আটকে রেখে তাতে আগুন দেয়া হয়েছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে ২০১৭ সাল থেকে কমপক্ষে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে গাদাগাদি করে অবস্থান করছে।

গণহত্যার অভিযোগ স্বীকার করতে সু চির প্রতি ৭ নোবেলজয়ীর আহ্বান:
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ নৃশংস অপরাধের বিচারে আর কিছুক্ষণের মধ্যে হেগে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছেন মায়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি। এ আদালতে তিনি তার দেশের সেনাবাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করছেন। এ জন্য সারা বিশ্ব থেকে তার দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর হলো, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সহ চালানো অপরাধ প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিতে অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সাতজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। তারা হলেন ২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইরানের শিরিন এবাদি, ২০১১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লাইবেরিয়ার লিমাহ গোউই, ২০১১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইয়েমেনের তাওয়াক্কাল কারমান, ১৯৭৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নেদারল্যান্ডের মেইরিড মাগুয়েরে, ১৯৯২ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গুয়েতেমালার রিগোবার্তা মেনচু তুম, ১৯৯৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী জোডি উইলিয়ামস এবং ২০১৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ভারতীয় কৈলাশ সত্যার্থী।
এই সাত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এক বিবৃতিতে বলেছেন, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সান সুচির প্রতি আমাদের আহ্বান রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো গণহত্যা সহ সব অপরাধ প্রকাশ্যে স্বীকার করুন। যে অপরাধ ঘটানো হয়েছে তার জন্য সেনা কমান্ডারসহ অং সান সুচিকে অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তারা আরো বলেছেন, শান্তির পক্ষের মানুষ হিসেবে আমরা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে পর্যায়ক্রমিক বৈষম্য চালানো হয় তা নিরসনের আহ্বান জানাচ্ছি সু চির প্রতি।
একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার, ভূমির মালিকানার অধিকার, মুক্তভাবে চলাচলের অধিকার ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি। রোহিঙ্গাদের প্রতি সুচির ব্যক্তিগত ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করছি। একই সঙ্গে তার নজরদারির অধীনে গণহত্যার বিষয়টি স্বীকার করতে এবং এর নিন্দা জানাতে অনুরোধ করছি। দৈনিক সংগ্রাম