টিডিএন বাংলা ডেস্ক :  ক্যালেন্ডারের অনেকগুলো পাতা উল্টে গেছে। সময় গড়িয়েছে। কিন্তু ইতিহাস তো লেখা থেকে যায় কালের কষ্ঠিপাথরে। এতগুলো বছর পরেও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আজাদের মতো মহান নেতাকে সালাম জানাচ্ছে দেশ। ১৯৫৮ সালের আজকের দিনেই তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন। কিন্তু সারা জীবন ধরে সংগ্রাম, আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ভারতের ইতিহাসে কয়েকটা মূল্যবান অধ্যায় যোগ করে দিয়েছিলেন আবুল কালাম মহিউদ্দিন আহমেদ। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ নামেই বেশি পরিচত ছিলেন তিনি। দেশ কোনোদিন বিস্মৃত হবে না এই মহান নেতাকে।

 ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর উল্লেখযোঘ্য ভূমিকা ছিল। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি। মৌলানা আজাদ ইসলামি ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। তরুণ বয়সে তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। জাত-পাত-এসব থেকে অনেক দূরে ছিলেন তিনি। তাই দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ভারতরত্নে (মরণোত্তর) সম্মানিত করা হয়। স্বাধীন ভারতের শিক্ষাবিস্তারে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা মাথায় রেখে তাঁর জন্মদিনটি সারা দেশে “জাতীয় শিক্ষা দিবস” হিসেবে পালন করা হয়।

তরুণ বয়স থেকে মৌলানা আজাদ উর্দু কবিতা এবং ধর্ম ও দর্শন-সংক্রান্ত নিবন্ধ রচনা করতে শুরু করেন। তিনি সাংবাদিকতার পেশা গ্রহণ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেন।

আজাদ খিলাফৎ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সেই সময় তিনি মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে আসেন। আজাদ ১৯১৯ সালের রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে গান্ধীজির অহিংস অসহযোগের ধারণায় অণুপ্রেরিত হয়ে আন্দোলন  সংগঠনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯২৩ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই ছিলেন কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সভাপতি।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় সময় পাঁচ বছর (১৯৪০-৪৫) তিনি কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিন বছর তিনি কারারুদ্ধ ছিলেন। যে সকল ভারতীয় মুসলমান পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবির বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন মৌলানা আজাদ।

স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার জন্য আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি চালু করেন।

আরবি মাতৃভাষা হওয়ায় এবং ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠ ও দৃঢ় বিশ্বাসী পারিবারিক পটভূমিকায় ইসলামী শিক্ষার চর্চা করা ছাড়া আজাদের অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষা লাভ না করলেও ব্যক্তিগতভাবে ব্যাপক পড়াশুনোর মাধ্যমে তিনি উর্দু, ফারসি, হিন্দি ও ইংরেজিতে জ্ঞান অর্জন করেন।

যে পারিবারিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন এবং যে ধরণের শিক্ষা লাভ করেছেন, তাতে তাঁর ধর্মীয় নেতা হওয়ারই কথা ছিল। তাঁর পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই `ধর্মবেত্তা’ ছিলেন বলে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন। রাজনীতির প্রতি আজাদের ঝোঁক ছিল। খুব অল্প বয়সেই তিনি রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেন। জামালউদ্দীন আফগানির প্যান ইসলামী মতবাদ ও স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলীগড় চিন্তাধারার প্রতি তিনি বিশেষভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। প্যান ইসলামী চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আফগানিস্তান, ইরাক, মিশর, সিরিয়া ও তুরস্ক সফর করেন। কিন্তু জীবন ও রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন এক উপলব্ধি নিয়ে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। ধর্ম ও জীবনের সংকীর্ণ ধারণার শৃঙ্খলমুক্তির স্মারকস্বরূপ তিনি লেখক হিসেবে ‘আজাদ’ নাম গ্রহণ করেন।

নিজের জীবন, সংগ্রাম, ঔদার্য দিয়ে তিনি যে ইতিহাস লিখে দিয়েছেন ভারতের পাতায়, তা সম্ভবত কোনোদিন ভুলতে পারবে না দেশ।