টিডিএন বাংলা ডেস্ক: সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কেড়ে নিয়েছিল তাদের বাড়ি-ঘর। আর দ্বিতীয়বার তাদের ‘ ঘর ’ কেড়ে নিল লকডাউন। দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক হিংসা তাদের ঘরছাড়া করেছিল। দাঙ্গায় তাদের বাড়িঘর লুঠ, ভাঙচুর হওয়ার পর তারা প্রাণ বাঁচাতে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড পরিচালিত ঈদগাহ ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করার পর তাদের সেই আশ্রয়ও হারাতে হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে দাঙ্গা দুর্গত এই ৩৬ জন মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছে মুস্তাফাবাদের একটি মাদ্রাসায়। মাত্র দু’টো রুম ও একটি হলঘরের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হচ্ছে তাদের।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ রুখতে যেখানে সরকারের তরফে মানুষকে বারবার করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে মাদ্রাসার এই ছোট্ট পরিসরে এভাবে ভিড় করে থাকা নিয়ে রীতিমতো আতঙ্ক বোধ করছেন তারা। এমনই এক মহিলা হলেন ৫৬ বছরের শামা পারভিন। একটি ঘরে আরও ১৩ জন মহিলা ও তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকছেন তিনি। সামার সঙ্গে সেখানে থাকছেন তার বোন জারিনা ও তাদের সন্তানরা। দাঙ্গার সময় প্রাণ বাঁচাতে তারা গোবিন্দ বিহার এলাকায় নিজেদের বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। শামার সঙ্গে পালিয়েছিলেন তার পরিবারের আরও ১৪ জন সদস্য। তার মধ্যে রয়েছে তিনমাসের শিশুও। তারা প্রত্যেকেই মাদ্রাসার এই ঘরে রয়েছেন। এভাবে একসঙ্গে থাকাটা এই করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক হতে পারে তা বিলক্ষণ বোঝেন তারা। সেইমতো তারা আলাদা থাকবেন বলে নিজেদের গোবিন্দ বিহারের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু, প্রতিবেশী হিন্দুরা তাদের সেখানে থাকতে দিতে চায়নি, থাকলে পরিণতি ভয়ংকর হবে বলে হুমকি দিয়ে তারা বলে, কোনও মুসলিমকে এলাকায় আর থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন: মসজিদে তবলিগ জামাতের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে করোনায় প্রাণ গেল তেলেঙ্গানার ৬ বাসিন্দার

পারভিনের কথায়, ‘ চারদিন আগে আমরা বাড়ি ফিরে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানকার লোকজন আমাদের হুমকি দেয় থাকলে পরিণতি খুব খারাপ হবে। ওরা বলে একজন মুসলিমকে ফিরতে দেবে না। এখন আমরা কী করব? আমাদের কাছে কোনও টাকাও নেই। কেউ কাজেও যেতে পারছে না। পারভিনের ছোট বোন জারিনার ঘটনাও ঠিক এমনই। স্বামী, তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে রয়েছেন জারিনা। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে রীতিমতো আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ এই ছোট জায়গা থেকেও যদি আমাদের বের করে দেওয়া হয় তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে জানি না। লকডাউন চলায় আমার স্বামীর উপার্জন সম্পূর্ণ বন্ধ। তাই নতুন কোনও জায়গা খোজা আমাদের পক্ষে অসম্ভব।”

জারিনার কথা শেষ হওয়ার আগেই তার ১৫ বছরের মেয়ে বলে ওঠে, “ আম্মি আমরা ফিরব না। ওরা (দাঙ্গাকারীরা) আমাদের পোষা মোরগকেও পর্যন্ত রেহাই দেয়নি।” পাশের ঘরে স্বামী ও ১৮ বছরের ছেলেকে নিয়ে থাকা নাসরিন বলেন, “ মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের উপর অসন্তুষ্ট। না হলে উন্নত দেশগুলোও এই করোনা রোগের সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না। একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনাই আমাদের বাঁচাতে পারে। আমাদের হাতে কোনও টাকা নেই। কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই। আমাদের অন্য জায়গা খোঁজার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তেমন কোনও জায়গা আমরা এখনও খুঁজে পাইনি। তাছাড়া শংকর বিহারে নিজেদের বড়িতে ফিরে যাওয়াও অসম্ভব।”

আল্ হিন্দ হাসপাতাল সংলগ্ন এক ত্রাণশিবির থেকে আসা অন্য একটি পরিবারের কাহিনিও একদম একই রকম। তারা জানাচ্ছে, দাঙ্গাবাজদের তলোয়ারে মরার থেকে করোনায় মৃত্যু অনেক ভালো। পরিবারের ১৮ বছরের এক যুবতী জানাচ্ছেন, তাদের বাড়ি শিববিহারে। বাড়ি ফিরতে তারা ভয় পাচ্ছেন। তার প্রশ্ন, ‘ ঘরে ফিরলে ফের যদি দাঙ্গাবাজরা আক্রমণ করে তাহলে সরকার এবং পুলিশ কি আমাদের সুরক্ষা দেবে। না ওরা (পুলিশ) দাঙ্গাবাজদেরই পক্ষ নেবে। আর আমাদের মরতে হবে।

তবে সবথেকে বড় সমস্যা হল গত ২১ মার্চ থেকে দাঙ্গা দুর্গতদের ত্রাণ দেওয়ার কাজ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। ওয়াকফ বোর্ড এই ত্রাণ বিলির দায়িত্বে ছিল। কিন্তু বোর্ডের চেয়ারপার্সন পদটি ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। ওখলার বিধায়ক আমানাতুল্লাহ খান অবসর নেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এমনকী ওয়াকফ বোর্ডের তরফে যে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ বরাদ্দ করা হয়েছিল তাও বিতরণ করা হয়নি। সবমিলিয়ে চরম আতান্তরে পড়েছেন দাঙ্গাদুর্গতরা।

মাদ্রাসার কেয়ারটেকার মুহাম্মদ সাকিব কাজেমি জানান, এখানে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে অন্যত্র জায়গা খুঁজতে বলার কোনও মানে হয় না। কারণ সেই সামর্থ্য তাদের নেই। তবে কাজেমি জানান, করোনা সতর্কতা হিসেবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলে স্থানীয় পুলিশ – প্রশাসন মাদ্রাসা খালি করে দেওয়ার জন্য তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। (সৌজন্য- পুবের কলম)