নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা: দিল্লিতে তাবলীগ জামাতের সমাবেশকে অপরাধ সাব্যস্ত করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, এক বিবৃতিতে কমিউনিস্ট ওই দলটির এমনটাই অভিযোগ। কমিউনিস্ট ওই দলটি তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলে, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে দিল্লিতে তাবলীগ জামাতের একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সমাবেশকে যেভাবে আলাদা করে বেছে নিয়ে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রচেষ্টা চলছে তা চরম নিন্দনীয়।

একথা তো জানা যে ভাইরাস প্রতিরোধে বিদেশ থেকে ভারতে আসা বন্ধ করার এবং বড় জমায়েত নিষিদ্ধ করতে নির্দেশিকা বা সতর্কতা জারি করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা কেন্দ্র সরকারের। কিন্তু কেন্দ্র সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তার বদলে, মার্চ মাসের অর্ধেকটা পেরিয়ে যাওয়ার পরও, কেন্দ্র সরকার কোভিড-১৯ এর বিপদকে অস্বীকার করছিল এবং বিরোধী দলনেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করলে উল্টে তাদেরকেই “অযথা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে” বলে অভিযুক্ত করছিল।

ভারতে কোভিড-১৯ এর প্রথম সংক্রমণের খবর পাওয়া যায় গত ৩০ জানুয়ারী। দলটির অভিযোগ, তারপরেও সমগ্র ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে কেন্দ্র সরকার ভাইরাস আটকাতে ন্যুনতম পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি সরকার জরুরি প্রস্তুতি নিতেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সিপিআই এর আরও অভিযোগ, সরকার করোনা মোকাবিলায় সেই সময় কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে তার বদলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে বড় বড় সমাবেশের আয়োজন কল যা হাজার হাজার মানুষকে ভাইরাস সংক্রমণের বিপদের সামনে উন্মুক্ত করে দেয়। ফেব্রুয়ারি মাসে বিজেপি সমর্থকরা দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক করে।

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে বিরোধী নেতারা যখন কোভিড-১৯-এর আসন্ন মহামারি সম্পর্কে বারবার সতর্ক করছিল তখন প্রত্যুত্তরে কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে আসছিল কেবলমাত্র ব্যাঙ্গ ও বিদ্রুপ।

শুধু কি তাই? বিপদ যখন সুস্পষ্ট চেহারা নিয়েছে, যখন লকডাউন ঘোষণা হয়ে গেছে, তখনও বিজেপি নেতা ও সমর্থকেরা বড় বড় জমায়েতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ৭০০ সাংসদ সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থেকেছে এবং তখনও মধ্যপ্রদেশ বিধানসভা দখল করতে বিজেপি ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে, আর শেষে ২৪ মার্চ এক বিশাল জমায়েত করে বিজয়োৎসব করছে।

দিল্লির রাজ্য সরকারও তাবলীগ জামাতের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করাকেই বেছে নিল! অথচ জমায়েতটি কোন অর্থেই বেআইনি ছিল না বলে দাবি করেছে সিপিআই। বাস্তবে দিল্লি পুলিশের এবং সংশ্লিষ্ট এসডিএম (দিল্লি রাজ্য সরকারের অধীন)-এর অনুমতি ও সহযোগিতা নিয়েই সেই জমায়েত সংগঠিত হয়েছিল। যদি সেই সমাবেশ বেআইনিই হয় তাহলে দিল্লি রাজ্য সরকার সঠিক সময়ে তা বন্ধ করার নোটিশ দেয়নি কেন? প্রশ্ন তুলেছে সিপিআই।

ওই বিবৃতিতে কমিউনিস্ট ওই দলটি আরও জানায়, তাবলীগ জামাতের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অভিযোগ আনা ও তার সাথে টিভি চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক প্রচার জুড়ে দেওয়াটা ওই জমায়েতে অংশগ্রহনকারী তথা সম্ভাব্য সংক্রমিত ব্যক্তিদের এগিয়ে এসে শারীরিক পরীক্ষা করানোর পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।

বেশ কিছু কোভিড-১৯ রোগী ও কয়েকটি মৃত্যুর সংযোগ সেই জমায়েত পর্যন্ত নির্ণীত হয়েছে। ওই সময়েই অন্যান্য যে সব বড় বড় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জমায়েতগুলি হয়েছিল সেই সংযোগে কতজনের সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে তা জানা অবশ্য খুব কঠিন। কারণ ভারতে করোনা পরীক্ষার হার খুবই ধীর।

দলটি জানায়, অন্যান্য ধর্মীয় জমায়েতগুলির মধ্যে আছে শিরডি সাইবাবা মন্দির, এক শিখ প্রচারকের জমায়েত, এবং অতি সম্প্রতি বৈষ্ণোদেবী তীর্থের যাত্রীরা, যারা লকডাউনের ফলে সেখানেই আটকে পড়েছে (এবং এঁরা প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী জনসম্প্রদায়ের মধ্যেও ভাইরাস ছড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা)। এইসব জমায়েতগুলিকে বা তাবলীগ জামাতের জমায়েতটিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিৎ নয়। সম্প্রদায়কে দোষারোপ তো আরও অন্যায়। দায়টা কেন্দ্র সরকারের ওপরই বর্তায়। প্রথম থেকেই সরকার বিভ্রান্তিকর বার্তা দিয়েছে, সুস্পষ্ট নির্দেশিকা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। জমায়েত করা না করার সিদ্ধান্ত ছেড়ে রেখেছে ব্যক্তি ও সংগঠনগুলির নিজস্ব বিচার বিবেচনার ওপর।

সিপিআই এর আরও অভিযোগ, কোভিড-১৯ সংকট সংক্রান্ত খবরাখবর চেপে দিতে কেন্দ্র সরকার আদালতকে হাতে নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের কন্ঠরোধ করতে চাইছে যাতে “সরকার অনুমোদিত” ছাড়া কোনও খবর প্রকাশ না পায়। একথা তো পরিস্কার দেখা যাচ্ছে যে, যে ভিড় এড়াতে লকডাউন ঘোষণা হল বাস্তবে লকডাউন সেই ভিড়কেই বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং অনাহার মৃত্যু ঘটাচ্ছে, পথদুর্ঘটনা বাড়িয়েছে, পুলিশী নৃশংসতার সুযোগ তৈরি করেছে, কৃষকের আত্মহত্যা বাড়িয়েছে আর গরিব কৃষক শ্রমিক পরিযায়ী দিনমজুরদের প্রাণান্তকর হয়রানিতে ফেলেছে।

ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে কোভিড-১৯কে মুসলমান ও চীনা জনতার সাথে জুড়ে দিয়ে যে বিষাক্ত ইসলামবিদ্বেষী ও জাতবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার শুরু হয়েছে তাকে আটকাতে কোনরকম উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষেরা ইতিমধ্যেই জাতিবিদ্বেষী বৈষম্য তথা কোভিড-১৯ এর নামে ঘৃণামূলক হিংসা ও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, এবারে মুসলমানদেরও সেরকম নিশানা বানানোর চক্রান্ত চলছে।

দলটির পক্ষ থেকে সকল ভারতবাসীর কাছে আবেদন জানানো হয় যে, কোভিড-১৯ মহামারীর এই পরিস্থিতিকে সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে যেন সবাই রুখে দাঁড়ায় এবং ভিড় এড়িয়ে ও সবরকম সতর্কতামূলক বন্দোবস্ত অনুসরণ করে মানুষকে সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য করে।