টিডিএন বাংলা ডেস্ক, লিখছেন উপন্যাসিক এবং নাট্যকার শৈবাল দাশগুপ্ত, সৌজন্যে – ন্যাশনাল হেরাল্ড : সেদিন ছিল ২০১৬ সালের গ্রীষ্মকাল। আমি ছিলাম সেই নাটকের একটা অংশ যেখানে একজন মন্ত্রী তাঁর ব্যাক্তিগত সহকর্মীকে বলছিলেন, ভগবান গনেশই পৃথিবীর সর্বপ্রথম সফল মাথার প্রতিস্থাপনা। নাটকের অন্য লিপিতে মন্ত্রী বলছিলেন কুতুব মিনার আসলে বিষ্ণু স্তম্ভ। এটা শ্রোতাদের মধ্যে চিড় ধরিয়ে চলে গেল। তারপরে আমি অন্য একটা আর্টিকেল পড়ে হোঁচট খেলাম। যেটা ছিল আরএসএসের স্কুলে পড়ানো পাঠ্যবই এর থেকে নেওয়া।

আমি ভাবলাম এটাকে আমি আমার  উপন্যাসে কাজে লাগাতে পারি, যে উপন্যাসটা আমি এখন লিখতে চাইছি। আমি স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন মনে করলাম। কিন্তু যা জানলাম তাতে বাইরের কাউকে আরএসএসের স্কুলের চৌহদ্দির ভিতরে প্রবেশের অনুমতি নাই। তখন একমাত্র রাস্তা ছিল সংঘের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে শিক্ষকদের সাথে বার্তালাপ করা। সৌভাগ্যক্রমে আরএসএস বাংলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মরিয়া প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল এবং পরিবর্তিত লোক খুঁজছিল।

   আমি অনলাইনে দরখাস্ত করলাম এবং স্বয়ংক্রিয় একটা আর এস এসের সদস্য নাম্বার পেলাম। পরের দিনই আমাকে এক বিশাল টেলিফোনিক স্বাক্ষাতকারের মুখাপেক্ষী হতে হল। তার পর অনেকের ফোন কল। তারা কেউ জানতেও চায়নি যে আমি একজন নাট্যকার। সবাই সন্দেহ করছিল যে আমি একজন সাংবাদিক কি না!

  আমাকে প্রায় বলা হত আমার পছন্দমত  স্থানীয় আর এস এসের ‘শাখা’তে যোগ দিতে। অবশ্য আমি আগে থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করেছিলাম। দরখাস্তে আমার নাম দিয়েছিলাম ‘শৈবাল মজুমদার’ (Saibal Majumdar)। যদি তারা Saibal Dasgupta নাম সার্চ করে (আমি আমার নামের বানানে ‘O’ লিখি)। তাহলে তারা আমার মিতাকে খুঁজে পেত শৈবাল দাসগুপ্ত, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সাংবাদিক। সইবাল মজুমদার নামটা আগে থেকেই একশ শতাংশ গুগল প্রমানিত ছিল। যাতে স্বাভাবিকভাবে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার ছদ্মবেশ গোপন থাকবে।

   চিনার পার্কের ‘শাখা’তে গিয়ে আমরা গান করতাম এবং মাটি লাগা গেরুয়া পতাকা স্যালুট করতাম। আমার অনুমান ওই পতাকা এক- দুবছর কেউ পরিষ্কার করেনি। সেখানে আমরা হাল্কা শরীরচর্চা ও করতাম।

বিজনানা ভারতী ও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বিজয় ভাটকারের সঙ্গে লেখক

আমরা সেখানে ধর্ম চর্চা করতাম না,খুব বেশি রাজনীতি চর্চা করতাম। সেখানে স্থায়ী রুটিন ছিল। বক্তব্য চলতো কিভাবে আরএসএস নিয়মশৃঙখলার মাধ্যমের মানুষের উন্নতি করে,আর জাতির জন্য আর এস এসের প্রয়োজন কতটা।

    সেশনের শেষে যাইহোক, নরেন্দ্র মোদীর গুণকীর্তন হেতু প্রানিত  সংলাপ (Animated Conversation) শেখানো হবে এবং আনঅফিসিয়ালি সংস্কৃতি, দেশপ্রেম ও জাতীয়াবাদের উপর মোহন ভগবতের বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপ আমাদের দেওয়া হবে।

   আমি স্বীকার করছি প্রথম ক’দিন সংঘের প্রতি আমার অনুরাগ জন্মেছিল। সেই সময় আমি উগ্র হিন্দুত্ববাদী  সাহিত্য পড়তেই বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছি। এইভাবে দিন যত গড়ায় আমি বাংলায় আরএসএসের অন্দর মহলে প্রবেশ করতে থাকি। তখন আমি আর বাইরের লোক নয়, একেবারে আর এস এসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তাদেরই একজন।

  এটা উতকন্ঠার ছিল যে তাদের অনেকেই বাংলা ও বাঙালীদের অবজ্ঞা করতো। তারা মনে করে যে সব বাংলাভাষীরাই বাংলাদেশী। এবং তারা বাংলায় সংঘের এই কর্মকান্ড বন্ধের মূল হোতা।

আমি একবার ভুপালের বাসিন্দা এবং মায়াঙ্ক জৈন নামকরা আইন কলেজের প্রথম বর্ষের আশুতোষের মত এক তরুণ ছাত্রকে বাগাড়ম্বরভাবে বলতে শুনেছিলাম, “হয় পঞ্চাশ জন বাংলাদেশীকে হত্যা কর আর না হয় সংঘ ছাড়ো।” অন্যরা আবার সদস্যদের অস্ত্র সংগ্রহ করে মুসলিম ও পুলিশের উপর আক্রমন সানাতে বলতো।

   আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম। সঙ্ঘের অনেক সিনিয়র সদস্যদের বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সঙ্ঘের অনেক ইন্টেলেকচুয়ালকে আমি খুব ভালোভাবে চিনতাম। প্রশান্ত ভট্ট থেকে ডঃ বিজয় পি ভাটকর। সবাই হিন্দুত্বের উপর আমার কাজের প্রশংসা করতেন।

     আমি অবশ্যই স্বীকার করি যে সংঘকে ছারখার  জন্য আমি নিজে খুব প্রলুব্ধ ছিলাম। আমি অনির্ভরশীল অশিলার এক লড়াকু লেখক।

এই ভাবনাটা আমার মনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে আমি আমার মানবতাকে হত্যা করে সংঘকে কাজে লাগিয়ে বই লিখে বিক্রি করবো। একটা বৃহত  সংখ্যক লোক  সংঘ ঘনিষ্ঠ লেখকের বই ভেবে এগুলো কিনবে।

    কিন্তু আমি তখন ভাবলাম মানবতা এমন একটা নীতি যাকে বিক্রি করা যায় না। আমি সংঘের সব নেতাদের কথা বার্তা রেকর্ড করতে লাগলাম। আমার উদ্দেশ্য হল আমি যে উপন্যাসটা লিখছি তাতে কাজে লাগাবো। যার পরিবর্তনশীল নাম “আনফেটেরড” (বন্ধনমুক্ত) যেটা এই বছরের শেষদিকে প্রকাশিত হবে।

(বাকিটুকু পরের পর্বে)

(এই লেখায় প্রকাশিত বক্তব্য বিখ্যাত ন্যাশনাল হেরাল্ড এর। প্রকাশিত ছবিও সেখান থেকে নেওয়া। টিডিএন বাংলার পক্ষ থেকে এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।)