টিডিএন বাংলা ডেস্ক: এক দশকে দলিত নির্যাতন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ, এমনটাই বলছে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো। ২০০৭ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত রিপোর্ট বলছে, প্রতি ১৫ মিনিটে অপরাধের শিকার হন দলিতরা। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন ধর্ষিত হন ৬ দলিত মহিলা। এক দশকে দলিত নির্যাতন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ।

এদেশে একাধিকবার দলিত নির্যাতনের খবর সামনে এসেছে। পায়েল বা রোহিত ভেমুলার মৃত্যু,সমাজকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

২০১৫ সালে উচ্চবর্ণের বিকৃত মানসিকতার শিকার হয়েছে তামিল নাড়ুর ২০ বছরের যুবক এম অরবিন্দন। ২ মার্চ কৃষ্ণগিরি জেলার করুভানুরে একটি মন্দিরে উৎসব চলাকালীন হঠাত্‍ই তার ওপর চড়াও হয় একদল উচ্চবর্ণের যুবক।

ওই একই সালে উত্তরপ্রদেশে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ৯০ বছরের এক বৃদ্ধকে। তাঁর ‘অপরাধ’ দলিত হয়েও মন্দিরে ঢুকতে চেয়েছিলেন তিনি। উচ্চবর্ণের স্বঘোষিত নীতিপুলিসরা এই ‘অনাচার’ মেনে নেয়নি। তাই ‘শাস্তি’ দিতে দিনের আলোয় প্রকাশ্যে গায়ে কেরসিন ঢেলে পুড়িয়েই খুন করা হয়েছে তাঁকে।

চিম্মা নামের ওই বৃদ্ধ হিন্দুরীতি অনুযায়ী পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে স্ত্রী, পুত্র ও ভাইয়ের সঙ্গে গয়ায় এসেছিলেন। সকালে ময়দানি বাবা মন্দিরে সস্ত্রীক পুজো দিতে গিয়েছিলেন তিনি। মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়েই সঞ্জয় তিওয়ারি নামের উচ্চবর্ণের এক যুবক তাঁদের রাস্তা আটকে দাঁড়ায়। তাঁদের সিঁড়ি থেকেই ফিরে যেতে বলে। চিম্মা প্রাথমিকভাবে সঞ্জয়ের তিওয়ারির কথায় কান দেননি। এরপরেই খেপে ওঠে ওই যুবক।

ধারালো অস্ত্র দিয়ে চিম্মার উপর ঝাঁপিয়ে পরে তাঁকে কোপাতে শুরু করে সে। ঘটনার আকস্মিকতায় আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন চিম্মার স্ত্রী। কান্নায় ভেঙে পড়ে ওই বৃদ্ধা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আশেপাশের সবার কাছে সাহায্যের আবেদন জানাতে থাকেন। কিন্তু, দুঃখের হলেও সত্য, একজনও এগিয়ে আসেনি ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্য করতে।

এ বছরের মে মাসে ইটভাটার কর্মী ১৪ বছরের এক দলিত কিশোরীকে গণধর্ষণের পর পুড়িয়ে মারা হয়েছে উত্তরপ্রদেশের মুজফ্‌ফরনগরে।

এমন বহু উদাহরণ এখন এদেশে ঘুরছে। আসলে সংখ্যালঘু মুসলিম আর দলিত নির্যাতন যেন এখন একশ্রেণীর ধর্মান্ধ মানুষের কাছে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই নিয়ে আলোচনা, সমালোচনার মাঝে ফের দলিত খুনের ঘটনা প্রকাশ্যে এল। শুধুমাত্র দলিত হওয়ার কারণে মরতে হল আরও এক তরতাজা যুবককে। শ্বশুরবাড়ির উচ্চবর্ণের লোকজনেরা একজোট হয়ে দলিত জামাইকে তলোয়ার ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে খুন করল। এমনটাই অভিযোগ। পুলিশের সামনেই এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। গুজরাটের আহমেদাবাদ জেলার মন্ডল থানার অন্তর্গত ভারমর গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটেছে।

জানা গিয়েছে, গুজরাতের কচ্ছ জেলার বাসিন্দা সোলাঙ্কি(২৫) নামের ওই দলিতকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন তলোয়ার ও রড দিয়ে আক্রমণ করে। পুলিশের সামনে এই ঘটনা ঘটে। প্রাণ বাঁচাতে আর্তচিৎকার করেন হরেশ। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ ছিল না পুলিশের। ঘটনাস্থলে মারা যান ওই দলিত যুবক। পুলিশের দাবি, তারাও হামলার শিকার হয়েছে। পুলিশের গাড়ির কাচ ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন, পুলিশের সামনেই যদি দলিতদের উপর এই হামলা চলে,তাহলে তারা নিরাপত্তা পাবেন কীভাবে?

প্রসঙ্গত এ দলিত যুবক তার দুই মাসের গর্ভবতী স্ত্রী নিয়ে যাবে সরকারের মহিলা হেল্পলাইন ‘অভয়ম’-এর দারস্থ হন। উল্লেখ্য,ছমাস আগে হরেশের সঙ্গে বিয়ে হয় উর্মীলার। তিনি অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু তার বাবা-মা দলিত যুবকের সঙ্গে মেয়েকে পাঠাতে রাজি ছিলেন না।

বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে রাজি করাতে রাজ্য সরকারের মহিলা সহায়তা কেন্দ্র ‘অয়ভম’-এর ১৮১ নাম্বারে ফোন করেন। সেইমত সোমবার অভয়মের কর্মী ভবিকা তার সঙ্গে একজন মহিলা পুলিশ কনস্টেবল নিয়ে পৌঁছে যান হরেশের শ্বশুরবাড়ি। উর্মিলার পরিবারের লোকজনকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে তারা উর্মিলাকে নিয়ে যেতে রাজি করাতে পারেনি। ভবিকা বলেন, কাউন্সেলিং শেষ করে তারা সন্ধে সাতটা নাগাদ যখন গাড়িতে ওঠেন,তখনও হরেশের উপর আক্রমণ করা হয়। এমনকি তাদেরও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

সুত্রের খবর,ওই দলিত যুবককে নিয়ে মহিলা হেল্পলাইনের লোকেরা যখন সরকারি গাড়িতে অপেক্ষা করছিল, তখনই তার উপর আক্রমণ করা হয়।

কমপক্ষে আটজন তলোয়ার, লাঠি,ছুরি ও রড নিয়ে ওই যুবকের উপর আক্রমণ করে। এদিকে পুলিশ মেয়ের বাবাকে মূল অভিযুক্ত করে ৮ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে। আহমেদাবাদের ডেপুটি পুলিশ সুপার পি ডি মানভর বলেন, আমরা সমস্ত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে কয়েকটি টিম তৈরি করেছি। তাছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীদেরও সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আর কতদিন এই নির্যাতন চলবে?