টিডিএন বাংলা ডেস্ক: গুজরাটে নরেন্দ্র মোদীর হোর্ডিং পাহারা দিচ্ছে রাজ্য পুলিশ! পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত প্রথম কোনও প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেওয়া ব্যানার প্রহরায় মোতায়েন পুলিশকর্মীরা। শুধু তাই নয়, আদিবাসীদের ক্ষোভ থেকে হোর্ডিং বাঁচাতে ছবিতে বিরাট আকারের বিরসা মুন্ডার ছবি দেওয়া হয়েছে। তার নিচে প্রধানমন্ত্রীকে বসানো হয়েছে। হই হুল্লোড় করে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের বিশাল মূর্তি উদ্বোধনের বন্দোবস্ত করলেও স্থানীয় আদিবাসীদের পাশাপাশি কৃষকদের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর বাহিনীকে।

নর্মদা বাঁধের কাছেই দাঁড়িয়ে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের বিশালাকার মূর্তি। ১৮২ মিটার উচ্চতার এই মূর্তি বুধবার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার আগে ব্যানার, হোর্ডিং, পোস্টারে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা রাজ্য। বাদ যায়নি নর্মদা জেলাও। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেই হোর্ডিংয়ে রয়েছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানির ছবিও। সম্প্রতি ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী ফলাও করে এর প্রচার করেছেন। উদাহরণ দিয়ে দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন দুনিয়ার সবথেকে বড় মূর্তি হয়েছে এটিই। ৩হাজার কোটি টাকা খরচ করে এমন একটি মূর্তি নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন প্রধানমন্ত্রী এটিকে বিরাট সাফল্য হিসাবে দেখাতে উঠেপড়ে লেগেছেন।

যদিও ভিটে মাটি হারানো আদিবাসীরা এইসব কথায় ভুলছেন না। বল্লভাই প্যাটেলের এই মূর্তি নির্মাণের জন্য আদিবাসীদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নেয় রাজ্যের বি জে পি সরকার। মেলেনি পর্যাপ্ত পুনর্বাসনও। কমপক্ষে ৭৫হাজার আদিবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, হারিয়েছেন জমি। ঘটা করে সেই মূর্তি উদ্বোধনের ব্যবস্থা করা হলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন আদিবাসীরা। জেলাজুড়ে অধিকাংশ হোর্ডিংয়ে কালো কালি লাগিয়েছেন বা ছিঁড়ে ফেলেছেন তাঁরা, অভিযোগ এমনই। এক সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গিয়েছে, ৯০ শতাংশ পোস্টার-হোর্ডিংই হয় ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে নয়ত কালো কালি লেপে দিয়েছেন ক্ষুব্ধ আদিবাসীরা। সংলগ্ন ২২টি গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানরা একটি চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছেন, ‘এই জঙ্গল, নদী, ঝরনা, জিম এবং কৃষি আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমর্থন দিয়ে চলেছে। আমরা এর উপরে ভিত্তি করেই বেঁচে আছি। কিন্তু সবকিছু ধ্বংস করে দেওয়া হলো এবং উৎসব করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আপনার মনে হচ্ছে না এটা কারোর মৃত্যুতে উৎসব করা হচ্ছে? আমাদের তেমনই মনে হচ্ছে।’ এইরকম একটি এলাকার গ্রামগুলিতে এখনও স্কুল, হাসপাতাল,পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। অথচ হাজার কোটি টাকা খরচ করে অর্থহীন মূর্তি তৈরি করা হলো। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সর্দার প্যাটেল যদি প্রাকৃতিক সম্পদের এই ব্যাপক ধ্বংস এবং আমাদের উপর এই অবিচার দেখতেন, তিনি কান্নায় ভেঙে পড়তেন। আমরা যখন এই সব কথা বলতে গেছি, তখন আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ চিঠিতে স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়েছে, আমাদের এখানে আপনি অনাহূত অতিথি। বুধবার বন্‌ধ ডেকেছে ছোট-বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ১০০টি আদিবাসী সংগঠন। বনসকণ্ঠ থেকে ডাঙ, ৯টি জেলায় হবে বন্‌ধ। ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’র উন্মোচনের দিনে ডাকা এই বন্‌ধ স্কুল, কলেজ, অফিস বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এই প্রকল্পের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত ৭২টি গ্রামের কোনও বাড়িতে রান্না হবে না বলেও জানিয়েছেন এই আদিবাসী নেতা। প্রথা অনুযায়ী, আদিবাসীদের গ্রামে কারও মৃত্যু হলে শোক জানিয়ে বন্ধ থাকে রান্না। ক্ষুব্ধ আদিবাসীরা পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার পর তড়িঘড়ি ফের নতুন পোস্টার বানিয়ে ফেলেছেন রাজ্য বি জে পি নেতৃত্ব। কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে বিরসা মুন্ডার ছবি দিয়ে এবার বানানো হয়েছে হোর্ডিং। যাতে আর আদিবাসীরা তা নষ্ট করতে না পারেন এবং পাহারায় রয়েছে পুলিশকর্মীরা।

এদিকে, সংখেদায় ১১ বছর আগে ছিল ‘সর্দার সুগার মিল’। চিনি কলেরই বোর্ড সদস্যদের আর্থিক গন্ডগোলের জেরে বন্ধ হয়ে যায় সেটি। সেই সময় থেকে ছোটা উদেপুর, পঞ্চমহল, ভদোদরা এবং নর্মদা— চার জেলার ১৫০০ কৃষক নিজেদের বকেয়া পাওনার জন্য দিন গুনছেন। এই সমস্ত কৃষক প্রায় ২ লক্ষ ৬২ হাজার টন আখ বিক্রি করেছিলেন ওই চিনিকলে। ১২কোটি টাকা পাওনা রয়েছে তাঁদের। বহুবার সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েও মেলেনি অর্থ। এবার তাঁরাও নামছেন প্রতিবাদে। বুধবার, মূর্তি উদ্বোধনের দিন জলে ডুবে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছেন এই কৃষকরা। ‘এই মূর্তি আমাদের কাছে কিছুই নয়। সরকারের ঔদাসীন্যে কৃষকরা এখনও দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ‘১১ বছর ধরে লড়াই করে যাচ্ছি’ ক্ষোভ-হতাশা মিলিয়ে বলেছেন কৌশিক প্যাটেল। তিনি ৩৮৯.৭৩ টন আখ বিক্রি করেছিলেন চিনিকলে। পাবেন ২ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা। প্রসঙ্গত, বুধবার পালটা ‘একতা যাত্রা’র আয়োজন করেছে রাজ্যের বি জে পি সরকার।