টিডিএন বাংলা ডেস্ক: সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকের অপবাদ বয়ে নিয়েই এই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রয়াত প্রাক্তন কর্মী যশোদাজীবন চত্রবর্তীর পত্নী প্রতিমারানি চক্রবর্তী । গত কুড়ি বছর ধরে তিনি ডি ভোটার ছিলেন। এরমধ্যেই ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে করিমগঞ্জ বিদেশি ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের হয়। আগামী ২১ জানুয়ারি তাঁর সাক্ষ্য ছিল, কিন্তু তার আগেই তিনি মানসিক অবসাদে ভুগতে ভুগতে গত ১৩ জানুয়ারি করিমগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে ৫৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রতিমারানি মারা যাওয়ার আগে তাঁর চরম ভোগান্তির জন্য ভারতীয় শাসন ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন।

প্রতিমারানি, তাঁর বাবা সত্যনারায়ণ ও মা সদয়লক্ষ্মী অধিকারী আপাদমস্তক ভারতীয়। তাঁদের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নানুর থানার রুইপুর গ্রামে। এই গ্রামেই প্রতিমারানির জন্ম ১৯৬১ সালে। পড়াশোনাও সেখানে।

১৯৭৭ সালের ১৪ মার্চ তাঁর বিয়ে হয় করিমগঞ্জ জেলার পাথারকান্দি বিধানসভা কেন্দ্রের লোয়াইরপোয়া ব্লকের হাতাইরবন্দ গ্রামের বাসিন্দা যশোদাজীবন চক্রবর্তীর সঙ্গে। যশোদাবাবু ওই সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মী ছিলেন এবং বীরভূমে কর্মরত ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর যশোদাবাবু চলে আসেন লোয়াইরপোয়ায় নিজের বাড়িতে। ইতিমধ্যে তিন মেয়ের জন্ম দেন প্রতিমারানি। ভালই চলছিল তাঁদের সংসার। বীরভূমের মেয়ে হয়েও করিমগঞ্জের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন প্রতিমারানি।

কিন্তু ১৯৮৯ সালের ২৯ অক্টোবর যশোদাবাবু হঠাৎই মারা যাওয়ার পর তাঁদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। এরপর প্রতিমারানি মেয়েদের নিয়ে করিমগঞ্জে চলে আসেন। এখানে কিছুদিন বাস করে ১৯৯৭ সালে চলে যান দক্ষিণ করিমগঞ্জের সুপ্রকান্দি গ্রামের এক ভাড়া বাড়িতে। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সেখানেই থাকতেন।

কিন্তু ১৯৯৭ সালে তাঁদের জীবনে আরেকবার বিপর্যয় নেমে আসে। সে বছরই প্রতিমারানিকে ডি ভোটার ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তাঁর অপরাধ হল ভোটার তালিকায় প্রতিমারানির কোনও লিংক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই থেকেই বহু চেষ্টা করে ভোটার তালিকায় তাঁর নাম উঠাতে পারছিলেন না প্রতিমারানি । এমনকী তাঁর নিকটাত্মীয় বিজেপি নেতা রথীন্দ্র ভট্টাচার্যও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।

প্রতিমারানি যতই বোঝাবার চেষ্টা করেছেন তিনি ও তাঁদের বাপের বাড়ির সবাই আপাদমস্তক ভারতীয় নাগরিক , বাংলাদেশের সঙ্গে নাড়ির যোগও নেই, কিন্তু কেউ তাঁর কথা কানে তোলেনি। আইনের দোহাই দিয়ে সবাই দায়িত্ব সেরেছেন। তাঁকে ডি ভোটার করে ঝুলিয়ে রাখা হয়, ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়। এবং এই কারণেই তিনি নাগরিকপঞ্জিতে নাম উঠাতে পারেননি।

নাগরিকপঞ্জি নবায়নের প্রক্রিয়া চলাকালীনই ২০১৭ সালে সন্দেহভাজন নাগরিক হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় করিমগঞ্জ বিদেশি ট্রাইব্যুনালে। এক্ষেত্রে একজন প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকের যা হওয়ার তাই হয়েছে প্রতিমারানির , তিনি প্রচণ্ড মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেন। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না কোন অপরাধে তাঁকে বিদেশি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। মানসিক অবসাদে ভুগতে ভুগতেই তিনি ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত হন। লাগাতার টেনশনে থাকতে থাকতে শেষের দিকে এই দুটি রোগই তাকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে।

গত ১২ জানুয়ারি তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে করিমগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়, কিন্তু বাঁচানো যায়নি, মকর সংক্রান্তির প্রাক্কালে ১৩ জানুয়ারি তিনি হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এক করুণ অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে আত্মীয় ও পরিচিতজনরাও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

তাঁদের দুঃখ এটাই যে , প্রতিমারানির সঙ্গে পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের সরাসরি কোনও যোগাযোগ ছিল না। তাঁর পরিবার পশ্চিমবঙ্গের আদি বাসিন্দা। সিলেটি যশোদাজীবনের সঙ্গে বিয়ের পরই এ অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র ঘটে। কিন্তু সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকের অপবাদ বয়ে নিয়েই এই দুনিয়া থেকে তিনি বিদায় নিলেন। মারা যাওয়ার আগে তাঁর এই দুরবস্থার জন্য অসম ও ভারত সরকারকে দায়ী করে গেছেন প্রতিমারানি । দেশের শাসন ব্যবস্থায় নানা গলদ থাকার জন্যই একজন সেনাকর্মীর পত্নী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সন্দেহভাজন বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এর চেয়ে বড় আক্ষেপ কিছু হতে পারে না।

প্রতিমারানিকে যে সন্দেহভাজন বিদেশি হিসেবে দেখা হচ্ছে , এটা খণ্ডন করে ২০১৯ সালের ৪ সেপ্টেম্বর করিমগঞ্জ বিদেশি ট্রাইব্যুনাল – ৩ এ তিনি লিখিত জবাব দাখিল করেন । এতে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় নিজেকে একজন একশ শতাংশ ভারতীয় নাগরিক বলে দাবি করেছেন । এর প্রমাণ হিসেবে তিনি বীরভূমের নানুর থানার রুইপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জমা দিয়েছেন।

এতে পরিষ্কার উল্লেখ আছে, প্রতিমারানি ১৯৬১ সালের ২৯ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছিলেন । তার স্বামী ১৯৮৯ সালের ২৯ অক্টোবর প্রয়াত হওয়ার পর ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার করিমগঞ্জ শাখা থেকে ফ্যামিলি পেনশন তুলছেন। তিনি যদি ভারতীয় নাগরিক না হতেন, তা হলে কি কেন্দ্র সরকার থেকে বিভিন্ন সুবিধা তিনি পেতেন ? আগামী ২১ জানুয়ারি বিদেশি ট্রাইব্যুনালে তার সাক্ষ্য গ্রহণ হওয়ার কথা ছিল , ভাগ্য তাঁকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করল । সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিকের অপবাদ বয়ে নিয়েই এই পৃথিবী থেকে তিনি বিদায় নিলেন । মানুষের জীবনে এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে ?