শেখ সালিক, টিডিএন বাংলা, জম্মু : আসিফা প্রায় সময়ই ফ্লোরাল প্রিন্টের ফ্রক পরতে পছন্দ করত। তাঁর মোটা ভ্রুর চোখ এবং ঘন ও কালো চুল প্রতিবেশীদের কাছে ছিল অত্যন্ত প্রিয়। একজন প্রতিবেশীর কথায়, সে খুবই মিষ্টি একটি মেয়ে ছিল। রাসনার গ্রামে তাঁকে সবাই চিনত। ভাঙাচোরা ও ধুলোবালিময় রাস্তা পেরিয়ে তবেই কাঠুয়ার হীরা নগর লাগোয়া এই গ্রামে পৌঁছানো যায়। আসিফা এই গ্রামের সরু অলিতে গলিতে নিজের ঘোড়া নিয়ে প্রায়ই ঘুরে বেড়াত। ঘোড়াগুলি নিয়ে পাশের জঙ্গলে খাওয়াতে নিয়ে যেত সে। এই জঙ্গলেই দিনের প্রায় সময় অতিবাহিত করত আসিফা। কখনও সে ভাবতেও পারেনি যে, সেই জঙ্গলই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। সেদিন সন্ধ্যায় গ্রামের সেই অলিগলি পেরিয়েই নিজের বাড়ি ফিরছিল সে। গ্রামের এই গলিগুলি প্রায় সময়ই ফাঁকা থাকে, কেননা গ্রামের পুরুষেরা বাইরে কাজে চলে যায় এবং মহিলারা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকে।
এখন সেই ফাঁকা গ্রামের বাইরে টিভি চ্যানেলগুলির ওবি ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সেই ফ্রক পরিহিতা ৮ বছরের মেয়েটির ধর্ষণ ও হত্যার পর এই গ্রাম দেশ তথা বিশ্বের নজরে পরিচিতি লাভ করেছে। গ্রামের এক কোনায় অবস্থিত তাঁদের বাড়িটি এখন ফাঁকা পড়ে আছে। বিশেষত শীতের সময় এখানে থাকতে আসত তাঁর পরিবার। বাড়ির দরজা পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তাটি পাকদণ্ডী ঝোপঝাড়ে ভর্তি। যখন গ্রামে ওবি ভ্যান আসা শুরু করে, তখন ওই ধর্ষিতার পরিবার সবকিছু বেঁধে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। মেয়ের সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যাওয়া এবং তারপর খুন হওয়ায় পাড়া পড়শিরা কেউই তাঁদের আটকানোর সাহস পায়নি। একজন গ্রামবাসীর কথায়, ‘ভালোই হয়েছে যে তাঁরা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে।’
জম্মু ও কাশ্মীরের এই রাসানা গ্রামে এখন আর কোনো মুসলমান নেই বললেই চলে। দু-একজন যারা কোনো উপায় না পেয়ে সেখানে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন, তারাও ভয় ও শঙ্কা নিয়ে বসবাস করছেন। ধর্ষণ ও হত্যার ভয়ে কন্যাশিশুদের তারা একা বাইরে যেতে দেন না। রাসানা গ্রামেরই বাসিন্দা ছিল আট বছর বয়সী ধর্ষিতা ওই শিশুকন্যা। গত জানুয়ারিতে তাঁকে গ্রামটির একটি মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ও দুই পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে আটজন মিলে ধর্ষণের পর পাথর ছুড়ে হত্যা করেছে। পুলিশ বলেছে, কাবরাওয়াল মুসলিম যাযাবর সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করতেই ওই শিশুকন্যাকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে।
গ্রীষ্মের সময় এসব যাযাবর পাহাড়ে গবাদিপশুকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যান। তবে শেষ পর্যন্ত মুসলিম যাযাবরদের উচ্ছেদের কৌশলে কাজ দিয়েছে। আসিফার পরিবার পুলিশ প্রহরায় কাশ্মীরের পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। জানুয়ারির ওই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর অন্য মুসলিম পরিবারগুলো সেখান থেকে একে একে চলে যাচ্ছে। আসিফার পরিবারের বাড়িটি খালি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। সেটাতে এখন আর কেউ থাকেন না। পাঁচ সশস্ত্র পুলিশ সেখানে পাহারা দিচ্ছেন। তাদের সেখানে চেয়ারে বসে ঘুমাতে দেখা গেছে।
জম্মুর মূল শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে কাঠুয়া জেলার একটি গ্রামে আসিফার কবরের অর্ধেকটা ঘাসে ঢাকা পড়েছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তাকে সেখানে কবর দিতে বাধা দিয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীর দেশের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। কিন্তু জম্মু অঞ্চলের দক্ষিণে হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিপত্য বেশি। এ ধর্ষণ ও হত্যার আগে সেখানে দুই সম্প্রদায়ের লোকজন শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করে আসছিলেন। যদিও পুলিশের কাছে পরস্পরের বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে অভিযোগ করেছেন।
রাসানা গ্রামে এখন যারা আছেন, তাদের বেশিরভাগ লোকজন বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন। ৩৯ বছর বয়সী ইয়াশ পল শর্মা বলেন, এই মর্মান্তিক ঘটনার পর গ্রামটি শূন্য হয়ে গেছে। গ্রামটি এখন এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পাঞ্জাব থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ছয়জনের একটি মুসলিম গ্রুপ এসেছে রাসানায়। তারা আসিফার পরিবারকে সাহায্য করতে চায়। তাদের মধ্যে একজন মুবিন ফারুকি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উসকানিতে এ ধরনের বৈরিতা ও নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনার পর ভারতীয়দের মনোভাবে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। লোকজন এখন এই অসুস্থ মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন।
রাসানায় দু-একজন মুসলিম অবস্থান করলেও তাদের মধ্যে মারাত্মক শঙ্কা কাজ করছে। ছয় সন্তানের মা কানিজা বেগম তার ১০ বছরের শিশুকন্যাকে বাইরের মাঠে খেলতে দিতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। তিনি বলেন, তাকে এখন বাইরে যেতে দিই না। স্কুলে গেলে তার ভাইকে সঙ্গে দিয়ে দিই। আবার তার ভাই গিয়ে স্কুল থেকে নিয়ে আসে।
(লেখাটি একটি জনপ্রিয় হিন্দি দৈনিক থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।)