টিডিএন বাংলা ডেস্ক: করোনার থাবায় নাজেহাল দেশ। মারণ করোনা ভাইরাসে দেশে এখনও পর্যন্ত মারা গেছে ৫৬ জন। আক্রান্ত প্রায় ২ হাজার। করোনা মোকাবিলায় কিছুদিন আগে দেশ পুরো লকডাউন করা হয়েছে। ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধান মন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনেকেই কোটি কোটি টাকা দান করেছে। কিন্তু সেই টাকা বা ত্রাণ এখনও পর্যন্ত দেশের কোনও একটিও মানুষ কে দেওয়া হয়নি। এই নিয়ে সরব হয়েছে কংগ্রেস সহ বিরোধীরা। করোনার তাণ্ডবে দেশ যখন গভীর সঙ্কটে তখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণ কেই হাতিয়ার করে দেশজুড়ে ফের এনআরসি করার দাবি তুললো বিজেপি। বিজেপির দাবি, সঙ্কটের দিনে দেশের দরিদ্র মানুষ ত্রাণের আওতার বাইরে থাকছে। সম্পূর্ণ নাগরিক তালিকা থাকলে এই সমস্যা হত না। সবাই ত্রাণ পেত।

আনন্দবাজারের এক খবরে প্রকাশ, বিজেপির দাবি, এনআরসি-র মতো তথ্যভাণ্ডার হাতে থাকলে তাদের খুঁজে বার করাটা সমস্যা হতো না। এখানেই না থেমে দিল্লিতে শাহিনবাগ-জামিয়ার বিক্ষোভ, উত্তর-পূর্ব দিল্লির সংঘর্ষ ও শেষে নিজামুদ্দিনের ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র জুড়ে বিজেপির দাবি, মুসলিম মৌলবাদের আখড়া হয়ে উঠেছে দেশের রাজধানী। এর জন্য দায়ী দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর তোষণনীতির কারণেই মৌলবাদীদের এই বাড়বাড়ন্ত।

কেন্দ্রের পক্ষে রাজ্যগুলিকে তাবলীগ জামাতের উপস্থিত ব্যক্তিদের খুঁজে বার করার নির্দেশ দেওয়া হলেও, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের মতে, প্রায় দেড়শো জনের খোঁজ নেই। বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্যের কথায়, নাগরিকদের একটি সার্বিক তথ্যভাণ্ডার থাকলেই আর কাউকে খুঁজে বার করতে সমস্যা হতো না। যাতে তা না-করা যায় সে জন্যই কয়েক মাস ধরে এত আন্দোলন।

ডিসেম্বর থেকেই অশান্ত ছিল দিল্লির একাংশ। সংসদে সিএএ পাশ হওয়ার পরেই ধর্নায় বসেন শাহিনবাগের মহিলারা। প্রতিবাদের সাক্ষী থেকেছে জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরও। গত মাসেই উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে হয়ে গিয়েছে রক্তক্ষয়ী গোষ্ঠী সংঘর্ষ। সব কিছুর জন্য মুসলিমদের দায়ী করে এদের বাড়বাড়ন্তের জন্য কেজরী সরকারকেই দুষেছেন মালব্য।

নভেম্বর মাসের শেষের দিকে করোনা ভাইরাস প্রথম ধরা পড়ে চিনে। কিন্তু ভারতে করোনার সংক্রমণের খবর পাওয়া যায় জানুয়ারিতে। তারপর সরকারের পক্ষ থেকে ১৮ জানুয়ারি দেশে ফেরা সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীদের স্ক্রিনিং শুরু করা হয়। ৮ মার্চ – ১৮ মার্চ প্রতিদিন গড়ে ৪০ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম তিরুপতি মন্দিরে আসতো। ১০ মার্চ যেদিন ভারতে করোনা রুগীর সংখ্যা ৪৬ জন, সেদিন হাজার হাজার লোক মিলে দেশজুড়ে দোল ও হোলি উৎসব পালন করা হয়।

১০ – ১২ মার্চ পাঞ্জাবের আনন্দপুরায় তিনদিনব্যাপী “হোলা মহল্লা” উৎসব হয়। সেই উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন করোনায় মৃত বলদেব সিং যিনি জার্মানি থেকে আসেন এবং তার করোনা ধরা পড়ার পর ২০ টি গ্রামের ৪০ হাজার লোককে আইসোলেশনে পাঠানো হয়। ১৩ – ১৫ মার্চ দিল্লিতে নিজামুদ্দিনের তাবলীগ জামাতের জমায়েত হয়। ১৪ মার্চ অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভার গোমুত্র পার্টির আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রায় ২০০ জনের সমাবেশ হয়।

এদিকে আবার ১৭ই মার্চ পর্যন্ত খোলা ছিল ভারত বিখ্যাত শনি মন্দির। ১৮ মার্চ পর্যন্ত খোলা ছিল বৈষ্ণোদেবীর মন্দির। ২০ মার্চ পর্যন্ত খোলা ছিল কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির। ২২ মার্চ জনতা কারফিউ দেশজুড়ে পালন। সেইদিনই বিকেল ৫ টার আগে থেকেই দলে দলে মানুষের জমায়েত এবং থালা বাটি বাজানো হয়। ২৩ মার্চ কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্ধের ঘোষণা করা হয়।

ওইদিন পর্যন্ত খোলা ছিল পার্লামেন্ট। সেই দিনই আবার বেশকিছু মানুষের সমাগমে মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকারের শপথগ্রহন অনুষ্ঠান। ২৪ মার্চ সারা দেশ লকডাউন করা হয়েছিল। ২৫ মার্চ লকডাউনের নিয়ম না মেনেই রামলীলা যাত্রা যাত্রা করে খোদ বিজেপি নেতা ও উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। ২৮শে মার্চ দিল্লির আনন্দ বিহার বাসস্ট্যান্ডে হাজার হাজার লোক সমাগম হয় নিজের নিজের বাড়ি ফেরার বাস ধরার উদ্দেশ্যে।

সেই দিনই খবর প্রকাশ হয়, দেশে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও ২০ মার্চ তীর্থভ্রমনে বের হন প্রায় ৪৫০ জন মানুষ এবং বৈষ্ণোদেবী দর্শনে গিয়ে তারা জম্মু-কাশ্মীরে আটকে পড়েন। তারা সরকারের কাছে সাহায্য চান বাড়ি ফেরার জন্য ঠিক যেমন নিজামুদ্দিনে আটকে পড়া মানুষরা সরকারের সাহায্যপ্রার্থী হয়েছিলেন।

তবে দেশে এমন সময়ে বিজেপির এই রাজনীতির সমালোচনা করেছে কংগ্রেস। তাদের বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনীতি শিকেয় তুলে একজোট হয়ে করোনা-বিপদের মোকাবিলা করা উচিত। তাবলীগদের সমাবেশ যেমন উচিত হয়নি, তেমনই লকডাউন ঘোষণার পরে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সদলবলে রামের মূর্তি স্থাপন ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানও অনুচিত ছিল। কিন্তু বিজেপি সরকার শুধু তাবলীগকেই টার্গেট করেছে। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে বিজেপি সরকার দেশে ধর্মীয় বিদ্বেষের রাজনীতি করতে চাইছে।

উল্লেখ্য, ডিসেম্বর মাসে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সরকার সংসদে পাশ করানোর পর প্রতিবাদে পথে নামে মুসলিমদের একাংশ। তাদের অভিযোগ, মুসলিম সমাজকে নিশানা করতেই ওই আইন আনা হচ্ছে। যদিও শুরু থেকেই সরকারের যুক্তি ছিল, সরকারি সুবিধার লাভ সত্যিকারের অভাবি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেই ওই পদক্ষেপ। করোনা সংক্রমণের আবহে যখন গোটা দেশে লকডাউন, প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ যখন নিত্যদিনের খাবার জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন এনআরসি-র মতো তথ্যভাণ্ডার থাকলে মানুষের সুবিধা হত বলে দাবি অমিতের। তাঁর বক্তব্য, সরকারের চেষ্টা সত্ত্বেও বহু মানুষ সরকারি ত্রাণের পরিধির বাইরে রয়ে গিয়েছে।