টিডিএন বাংলা ডেস্ক : গত তিন বছরে সারা দেশে ৩৬ হাজারেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন! গড়ে বছরে ১২হাজার, মাসে ১ হাজার! অর্থাৎ ‘চৌকিদার’ প্রধানমন্ত্রীর আমলে ভারতে এখন প্রতিদিন গড়ে ৩৩জন করে কৃষক আত্মহত্যা করছেন! তথ্য বলছে, নরেন্দ্র মোদীর ‘আচ্ছে দিন’এর জমানায় কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনা ৪০শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এই ভয়াল ছবি আড়াল করতে মোদী সরকার ২০১৫সালের পর থেকে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডে ‌কৃষক আত্মহত্যার তথ্য প্রকাশই বন্ধ করে দিয়েছে! তাতে অবশ্য কৃষকের আত্মহত্যার মিছিল থেমে নেই। বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ মারাঠাওয়াড়া অঞ্চলের ৮টি জেলায় গত বছর আত্মঘাতী হয়েছেন ৯০৯জন কৃষক! মারাঠাওয়াড়ার ডিভিসনাল পুলিশ কমিশনারের অফিসের হিসাব, ২০১৭সালেও সেখানে আত্মহত্যা করেছেন ৯৯১জন কৃষক! এসব তো শুধু সরকারি তথ্য। আসল সংখ্যা আরও বেশি। মানুষের দুর্দশার ছবি আড়াল করার ব্যাপারেও অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তাঁর মিত্র মোদীর বেশ মিল।

পশ্চিমবঙ্গে সাড়ে সাত বছরে চাষে লোকসান অথবা কৃষিঋণের জালে ফেঁসে বর্ধমান সহ বিভিন্ন জেলায় ১৯৭জন কৃষক এবং খেতমজুর আত্মহত্যা করলেও, একটি ঘটনাকেও স্বীকার করেনি তৃণমূল সরকার। আত্মঘাতী কৃষকের অসহায় পরিবারগুলিতে একটি পয়সাও আর্থিক সহায়তা দেননি মুখ্যমন্ত্রী। আর প্রধানমন্ত্রী তো ক’দিন আগেই দেশে বেকারি বৃদ্ধির মারাত্মক তথ্য চেপে যাওয়ার চেষ্টা করে ফেঁসে গিয়েছেন! কৃষি সঙ্কটকে কম করে দেখাতে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টে আত্মঘাতী কৃষকের সংখ্যা জানানোর ব্যবস্থাও আগেই বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে চলেছে কৃষকের সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক মিথ্যাচার আর প্রতারণা। ক্ষমতার মসনদে বসে এদেশের দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকের জন্য কিছুই করেননি নরেন্দ্র মোদী। অথচ নজিরবিহীন কৃষি সঙ্কট চলছে দেশজুড়ে। নয়া উদার অর্থনীতির কারণে কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ কমেই চলেছে। ফলে সার-বীজ-কীটনাশক-সেচ-ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী। চাষের খরচ প্রতিদিন বেড়ে যাচ্ছে। অথচ কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না। খরচ বেশি, আয় কম।

এই ধারাবাহিক লোকসান বন্ধ না করতে পারলে কৃষককে বাঁচানোর কোনও পথ নেই। নয়া উদার অর্থনৈতিক নীতি চালুর পর গত ২২বছরে ৩লক্ষ ৩০হাজারেরও বেশি কৃষকের আত্মহত্যাই বুঝিয়ে দেয় এদেশের কৃষি সঙ্কটের ভয়াবহতা। একইসঙ্গে গ্রাম-ভারতে অনাহার-অপুষ্টিতে হাজার হাজার শিশু ও মহিলার মৃত্যু, ক্রমবর্ধমান কর্মহীনতা ও জমিহীনতা, দেশজুড়ে প্রকট আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্য, গ্রামীণ শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের করুণ হাল সরকারি নীতির দগদগে চেহারাটাই স্পষ্ট করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আছড়ে পড়া বিরাট বিরাট কৃষক আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা হান্নান মোল্লার কথায়, ‘‘গত কয়েক বছরে আমরা সরকারকে বারবার বলেছি, অন্তত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিটুকু পালন করো। কৃষককে বাঁচাতে এমএস স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে নাও। সরকারি-বেসরকারি-মহাজনী সমস্ত কৃষিঋণ মকুব করো। ফসলের উৎপাদন খরচের সঙ্গে আরও ৫০শতাংশ যোগ করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) হিসেবে দেড়গুণ দাম দাও। এছাড়া কৃষকের আয় বাড়ানোর অন্য পথ নেই। কিন্তু কোনও কথাই শুনল না কেন্দ্রীয় সরকার। সমস্যা সমাধানে কোনও আন্তরিক পদক্ষেপ না নিয়ে মুমূর্ষু কৃষককে কেবল প্রতারণাই উপহার দিয়ে গিয়েছে মোদী সরকার। ফলে এবার ক্ষমতার মসনদ থেকে বিজেপি’কে হটানোর ডাক দিয়েছি আমরা।’’ প্রতারণার চেহারাটা কেমন? হান্নান মোল্লা বলছেন, ‘‘২০২২সালের মধ্যে কৃষকের আয় দ্বিগুন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মোদী সরকার। এটা পুরোপুরি ধাপ্পার কথা।’’ তাঁর বক্তব্য, ‘‘একাজ করতে হলে দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির হার প্রতি বছরে গড়ে প্রায় ১৫শতাংশ রাখতে হত। কিন্তু মোদীর আমলে এই হার নেমে এসেছে মাত্র ২.৬৭শতাংশে! পূর্বতন ইউপিএ আমলের শেষ পাঁচ বছরেও এই হার ছিল গড়ে ৪.৫শতাংশ।

কৃষিক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার গত চোদ্দ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমেছে মোদী সরকারের আমলে। সুতরাং এই অবস্থায় কৃষকের আয় বাড়ার কোন সম্ভাবনা নেই জেনেও ধোঁকা দিয়ে চলেছে তারা।’’ এতেই শেষ নয়। কৃষিঋণ মকুব না করে, ফসলের লাভজনক দামের ব্যবস্থা না করে এবারে লোকসভা ভোটের মুখে কৃষককে ঠকাতে ‘প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি’ নামে একটি নতুন তামাশা ঘোষণা করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, দুই হেক্টরের কম জমির মালিককে বছরে মোট ৬হাজার টাকা করে দেবে কেন্দ্র। এই টাকা সরাসরি কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। বছরে তিন দফায়, অর্থাৎ ২হাজার টাকা করে এই টাকা দেওয়া হবে। হান্নান মোল্লা বলছেন, ‘‘এই প্রকল্পের মানে দাঁড়াচ্ছে, কৃষক পরিবারকে দিনে ১৭টাকা করে দেবে সরকার! তাও আবার সবাইকে নয়। হিসাব করলে দিনে ১৭টাকাই দাঁড়াচ্ছে। পাঁচ সদস্যের কৃষক পরিবারের ক্ষেত্রে মাথাপিছু সাড়ে তিন টাকা! এই টাকায় চাষের বিপুল লোকসান সামলানোর কথা বলা নির্মম রসিকতা নয় কি? বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের ৩থেকে ৫শতাংশ খরচও ওঠে না ৬ হাজার টাকায়। তবে এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হলেও বর্গাদার, ভাগচাষি, খেতমজুর বা ভূমিহীন কৃষক এই সহায়তা পাবেন না। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক গরিব এবং প্রকৃত কৃষককে বাদ দিয়েই এই প্রকল্প চালু করেছে মোদী সরকার। সারা দেশের ২০শতাংশ গরিব কৃষকও এই প্রকল্পের আওতায় আসেননি!’’ গণশক্তি