টিডিএন বাংলা ডেস্ক : পুলওয়ামায় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে সিআরপিএফ জওয়ানদের হত্যার ঘটনাকে ঘিরে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি চলছে। কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার চলছে। হামলা,আক্রমণ এবং মিথ্যাচার করে উত্তেজনাও তৈরি করা হচ্ছে জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে থাকা কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন সরাসরি বা নেপথ্যে এই সব ঘটনায় ইন্ধন জোগাচ্ছে। দেশপ্রেমের নামে জম্মুতে দাঙ্গা পরিস্থিতি যেমন তৈরি করা হয়েছে, তেমনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাশ্মীরিদের উপরও চলছে হেনস্তা। তারই প্রতিবাদে রবিবার কাশ্মীরে বন্‌ধের ডাক দেন ব্যবসায়ীরা। স্তব্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক জীবন। এদিনও জম্মুতে কারফিউ বলবৎ ছিল।
কাশ্মীরিদের উপর আক্রমণে এদিন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো। শ্রীনগরে প্রতিবাদ মিছিল করে পিপল্‌স ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি)। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) নেতা ওমর আবদুল্লাহ। শনিবার সর্বদলীয় বৈঠকেও সিপিআই (এম)’র পক্ষ থেকে জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে কাশ্মীরিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পুলওয়ামার হামলার পর থেকেই কাশ্মীরের মানুষজন শঙ্কিত হয়ে পড়েন। দিল্লিতে কাশ্মীরের ছাত্ররা নিজেদের সুরক্ষার দাবি তোলেন। দেরাদুনে এক হস্টেলে কয়েকজন কাশ্মীরি ছাত্রীকে আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ, তারা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলছিলেন। ওই ছাত্রীদের ক্ষমা চাইতে হবে বলেও দাবি করা হয়। এক ছাত্রী অভিযোগ করেন, ‘‘শনিবার সন্ধ্যায় হঠাৎই কয়েকজন যুবক হস্টেলে চড়াও হয়ে বলতে থাকে আমাদের ক্ষমা চাইতে হবে। আমরা নাকি পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলেছি। কিন্তু এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা এরকম কিছুই বলিনি।’’ একইভাবে জয়পুরে ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স’র চার ছাত্রীকেও হেনস্তা করা হয়েছে।
রবিবার পুলিশ জানিয়েছে, প্যারা মেডিক্যালের দ্বিতীয় বর্ষের ওই চার ছাত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা পুলওয়ামায় হামলা ‘উদ্‌যাপন’ করেছেন। যদিও ছাত্রীরা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হোয়াটস অ্যাপে এই ধরনের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে বলেও দাবি করে পুলিশ। তার জেরে ওই চার ছাত্রীকে বরখাস্তও করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিহারে এক কাশ্মীরি ব্যবসায়ীর উপরও আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে। তাঁকে রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এরকমই বিভিন্ন রাজ্যে হামলার শিকার হচ্ছেন কাশ্মীরিরা। সোশ‌্যাল মিডিয়ায়ও তাঁদের হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছে। কাশ্মীরিদের উপর ক্রমশ বাড়তে থাকা হামলার ঘটনার জেরে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এক নির্দেশিকা জারি করেছে। কোনও কাশ্মীরি ছাত্র যেন ক্যাম্পাসের বাইরে না যান, সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এরই মধ্যে সোশ‌্যাল মিডিয়ায় বহু সাধারণ মানুষ পোস্ট করেছেন,কাশ্মীরিদের জন্য তাঁদের বাড়ির দরজা খোলা। নির্দ্বিধায় আসতে পারেন কাশ্মীরিরা। একসঙ্গে রান্না করে খাবেন, এমন কথাও লিখেছেন অনেকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কাশ্মীরি ছাত্রছাত্রী,কিংবা অন্য কাজে যাওয়া কাশ্মীরের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। হুমকি-হামলার শিকার হচ্ছেন। এর প্রতিবাদে ‘কাশ্মীর ট্রেডার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স ফেডারেশন’ (কেটিএমএফ) এবং ‘কাশ্মীর ইকোনমিক অ্যালায়েন্স’ (কেইএ) ধর্মঘটের ডাক দেয়। শনিবার দুপুর তিনটে থেকে তাঁরা সমস্ত দোকানবাজার বন্ধ করে দেন। শ্রীনগরের উপকণ্ঠে লাল চকে ধরনায়ও বসেন তাঁরা। রবিবার দিনভর ধর্মঘটের ডাক দেন। কাশ্মীরের বিখ্যাত ‘সানডে মার্কেট’ও এদিন বন্ধ ছিল। প্রতি রবিবার কোটি টাকার ব্যবসা হলেও এদিন কাশ্মীরিদের উপর আক্রমণের প্রতিবাদে বিকিকিনি বন্ধ রাখেন দোকানদাররা। দোকান-বাজার যেমন বন্ধ ছিল,তেমনই রাস্তাঘাটে দেখা মেলেনি গাড়ির। কার্যত মরুভূমির চেহারা নেয় রাস্তাঘাট। রাস্তার ধারে যে ফল এবং সবজি বিক্রেতারা বসেন,তাঁরাও এদিন শামিল হন বন্‌ধে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বন্ধ ছিল দোকান। ঐতিহাসিক জামিয়া মসজিদও ছিল বন্ধ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় উপত্যকাজুড়ে মোতায়েন করা হয় প্রচুর পরিমাণে নিরাপত্তারক্ষী। উত্তর কাশ্মীরের সমস্ত বড় শহর এবং মহকুমায়ও এদিন ধর্মঘট পালিত হয়েছে। ঝিলমের উপর দিয়ে নির্মিত সেতুগুলিতে এদিন বাড়িয়ে দেওয়া হয় নিরাপত্তা। শ্রীনগর-বারামুলা-উরি জাতীয় সড়কেও মোতায়েন ছিলেন প্রচুর নিরাপত্তারক্ষী।
একইভাবে দক্ষিণ কাশ্মীর এবং মধ্য কাশ্মীরেও এদিন ধর্মঘট সফল হয়েছে। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এদিন প্রশ্ন তুলেছেন, কাশ্মীরিদের এর মধ্যে জড়িয়ে কার লাভ হচ্ছে? তিনি টুইটারে লিখেছেন, ‘‘জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে পড়তে যাওয়া ছাত্রছাত্রীরা এই রাজনীতি, দ্বন্দ্বের থেকে দূরে রয়েছেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলায় সাহায্য না করে এভাবে তাঁদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে, ভীত সন্ত্রস্ত করে দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে কাশ্মীরের বাইরে তাঁদের আর কোনও জায়গাই নেই।’’ কাশ্মীরিদের সুরক্ষার দাবি তুলে এদিন রাজধানী শহরে মিছিলে নামে পিডিপি। রবিবারও জম্মুতে কারফিউ ছিল। বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ করেছে সেনাবাহিনী। দফায় দফায় বৈঠকে বসেছে প্রশাসনিক কর্তা এবং পুলিশ আধিকারিকরা।
শনিবারও বিভিন্ন জায়গায় সঙ্ঘর্ষের খবর পাওয়া গিয়েছে। তার জেরেই এদিনও কারফিউ জারি রাখা হয়েছে। গুজ্জর নগর,জানিপুর, শাহিদি চক, তালাব খাটিকা সহ বিভিন্ন জায়গায় টাইর ডিভিসনের নিরাপত্তারক্ষীদের মোতায়েন করা হয়েছে। জম্মুতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি করার পর থেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।