টিডিএন বাংলা ডেস্ক : কেজি থেকে পিজি। একেবারে প্রাক প্রাথমিক থেকে গবেষণাস্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারি খরচে শিক্ষা ব্যবস্থার দাবিতে রাজধানীর বুকে জোরালো আন্দোলন বামপন্থী ছাত্রদের। সকলের জন্য শিক্ষার দাবিতে হাজার হাজার ছাত্রের ঢল নামে দিল্লির রাজপথে। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার খরচের বোঝা লাঘব করতে, সমাজের সর্বস্তরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে কেন্দ্রীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ অথবা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৬ শতাংশ ব্যয় করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে। পাশাপাশি মোদী সরকারের জমানায় শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকীকরণের অপচেষ্টা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা সর্বশক্তি দিয়ে রোখার আহ্বান জানিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা সোমবার দলে দলে এসেছিলেন দিল্লিতে।

এসএফআই, এআইএসএফ,এআইএসবি, পিএসইউ এবং ডিএসও,এই ৫টি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের যৌথ আহ্বানে সংসদ অভিযানে শামিল হন বিভিন্ন স্তরের ছাত্রছাত্রীরা। রক্ষা করো শিক্ষা, গণতন্ত্র, দেশ— কেন্দ্রীয় এই স্লোগানকে সামনে রেখেই ‘দিল্লি চলো’র কর্মসূচিতে অংশ নেন আসাম থেকে মহারাষ্ট্র, হিমাচল প্রদেশ থেকে কেরালা,গোটা ভারতের ছাত্র আন্দোলনের কয়েক হাজার কর্মী সদস্য। এদিন সকাল ১১টা নাগাদ দিল্লির রামলীলা ময়দানে জড়ো হন ছাত্রছাত্রীরা,মাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়া থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত ছাত্রদের রঙিন এই জমায়েত ছিল নজরকাড়া। এখান থেকে শুরু হয় ছাত্রদের বিশাল মিছিল। রঙবেরঙের ব্যানার, ৫টি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের পতাকা,ফেস্টুনে মোড়া ছিল এই মিছিল। ছাত্রছাত্রীদের হাতে হাতে ছিল ভগৎ সিং এবং চে’র ছবি আঁকা বিশাল বিশাল ঝাণ্ডা। স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগানে,কখনও গানের সুরে মিছিল এগিয়ে গেছে বারাখাম্বা রোডের দিকে। তারপর রাজপথ হয়ে যন্তরমন্তরে শেষ হয় এই মিছিল। সুদূর মণিপুরের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিছিল হেঁটেছেন রাজস্থান,হিমাচল প্রদেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা। আবার তামিলনাডু,কেরালার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গেই শিক্ষার দাবিতে স্লোগান তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গ,বিহার, উত্তর প্রদেশের ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, সদস্যরা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের। মিছিল থেকে দাবি উঠেছে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলতি সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করার। স্কলারশিপের সমস্ত বকেয়া অর্থ অবিলম্বে দেওয়া এবং বঞ্চিত অংশের জন্য আরও স্কলারশিপ চালুর দাবি উঠেছে। পাশাপাশি শিক্ষার যুক্তরাষ্ট্রীয় চরিত্র রক্ষা করতে এবং শিক্ষার কেন্দ্রীকরণ রোখার দাবিতেও এদিন সোচ্চার হয়েছে হাজার হাজার কন্ঠ। দেশজুড়ে ছাত্রীদের বিরুদ্ধে লিঙ্গ বৈষম্য এবং অত্যাচার বন্ধ রোখার দাবিও উঠেছে এই মিছিল থেকে।

যন্তরমন্তরে সমাবেশের শুরুতেই গত বৃহস্পতিবার জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদীদের আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত জওয়ানদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করে গোটা সমাবেশ। এই সমাবেশে ভাষণে এসএফআই’র সাধারণ সম্পাদক ময়ূখ বিশ্বাস বলেন, ছাত্রদের এই কর্মসূচিকে বানচাল করতে খোদ মোদী সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছিল। এমনকি সমাবেশের জয়াগার অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল না। ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের কাছে হার মেনেছে সরকারের ষড়যন্ত্র। এদিনের কর্মসূচিকে সামনে রেখে প্রচার আন্দোলন চলাকালীন বামপন্থী ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন ময়ূখ বিশ্বাস এদিনের ভাষণে। সম্প্রতি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশনে লিফলেট বিলি করতে গিয়ে এবিভিপি’র নৃশংস হামলার শিকার হন ছাত্ররা। কিন্ত হার মানেননি বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা। মোদী সরকারের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করে ময়ূখ বলেন, ২ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল এই সরকার। কিন্তু মেয়াদ শেষ হতে চললেও কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ছাত্রসহ দেশের সব অংশের মানুষকে ধাপ্পা দেওয়া হয়েছে। জুমলাবাজি চালানো হয়েছে এই সরকারের আমলে। মোদী সরকারের নীতির কারণেই শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্র মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিনের সমাবেশে অন্যতম বক্তা ছিলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের প্রাক্তন সভাপতি কানহাইয়া কুমার। ভাষণের শুরুতেই নিহত জওয়ানদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হামালার ঘটনাকে সমানে রেখে দেশজুড়ে ঘৃণার পরিবেশ তৈরির ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সজাগ এবং ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান কানহাইয়া। আরএসএস এবং বিজেপি’কে তীব্র আক্রমণ করে কানহাইয়া কুমার বলেন,স্বাধীনতা আন্দোলন কিংবা দেশের হয়ে আত্মত্যাগের কোনো ইতিহাস যাঁদের নেই, আজ তাঁরাই দেশপ্রেমের বুলি আওড়াচ্ছেন। জওয়ানদের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ভোটের রাজনীতি করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান কানহাইয়া। সম্প্রতি যন্তরমন্তরে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন জওয়ানদের সঙ্গে মোদী সরকারের প্রশাসনের অমানবিক আচরণ ও তাঁদের ওপর লাঠি চালানোর ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। ওই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, যারা প্রাক্তন সেনা কর্মীদের লাঞ্ছিত করেছিল আজ তারাই জওয়ানদের হয়ে মেকি ভাষণ দিচ্ছে। পাশাপাশি মোদী সরকারের কর্পোরেট স্বার্থবাহী নীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হন কানহাইয়া। তিনি বলেন, ভারতীয় সংবিধানে দেশের সমস্ত অংশের মানুষকে সমান অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই সরকার দেশের সিংহভাগ মানুষকে বঞ্চিত করে শুধুমাত্র আম্বানি, আদানিসহ বড় বড় শিল্পপতি, ধনী পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে।

এদিনের সমাবেশ বক্তব্য রাখেন এসএফআই’র সর্বভারতীয় নেত্রী দীপ্সিতা ধর। তিনি বলেন, প্রশাসন,জেল, আদালতকে ব্যবহার করে দমনপীড়ন চালিয়ে ছাত্রযুবদের ক্ষোভকে দমানোর কৌশল নিয়েছে মোদী সরকার। ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে তারা। কিন্তু তাঁদের এই অপচেষ্টা কখনই সফল হবে না। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন এআইএসএফ’র সভাপতি শুভম ব্যানার্জি, এআইএসএফ’র সাধারণ সম্পাদক ভিক মেহর্ষি,এআইডিএসও’র অশোক মৈত্র,এআইএসবি’র শৌর্যদীপ সরকার,এআইপিএসইউ’র এন এম সৈফুল্লা। সভা পরিচালনা করেন এসএফআই’র সভাপতি ভি পি শানু। বুধবারই শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন অংশের সংগঠন মোদী সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাবে দিল্লিতে। ছাত্রদের সঙ্গেই শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং অভিভাবকদের মঞ্চের আহ্বানে দিল্লিতে বিশাল সমাবেশ হবে।