নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: কলকাতার বেনিয়াপুকুরের একটি বস্তির অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে আয়েশা নূর দেশকে তিন-তিনবার ক‍্যারাটে চ‍্যাম্পিয়ন হয়ে সোনা এনে দিয়েছেন। তারপরেও রাজ‍্য কিংবা কেন্দ্র সরকারের কাছে এখনও পর্যন্ত কোনো সংবর্ধনা ও সম্মাননা পায়নি। তাকে স্বয়ং আমেরিকা সরকার সম্মান প্রদান করেছে। ইংরেজি প্রথম সারির মিডিয়া টাইমস অফ ইন্ডিয়া সহ দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমও পুরস্কৃত করেছিল তাকে।

গত শুক্রবার রাজ‍্যের প্রথম সারির খবরের চ্যানেল জি ২৪ ঘন্টাও আয়েশাকে কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলে ‘স্বয়ং সিদ্ধা’ পুরস্কার প্রদান করে সম্মান জানায়। এবার আয়েশাকে আরও একটি বিশেষ সংবর্ধনা দিলেন রাজ‍্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র।

উল্লেখ্য, আয়েশা দিল্লির নির্ভয়া কান্ডের পরই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন কলকাতার বস্তি এলাকার কোনও মেয়েরই সর্বনাশ হতে দেবেন না। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে রাজাবাজার সাধনা সরকার উদ্যানে চালু করেছিলেন ক্যারাটে প্রশিক্ষণ শিবির। যেই শিবিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তিন বারের বিশ্ব ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন আয়েশা নূর ও তাঁর কোচ তথা আর এক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এমএ আলিকে। যাঁর উদ্যোগে এই ক্যারাটে প্রশিক্ষণ শিবির চালু হয়েছিল, তিনি আর কেউ নন রাজ্যের তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্র। তিনি অবশ্য এখন আর রাজ্যের মন্ত্রী বা বিধায়ক কোনওটিই নন। কিন্তু এখনও যে তাঁর মন পড়ে রয়েছে সেই ছোট্ট আয়েশার দিকে, আবারও তার প্রমাণ মিলল।

রবিবার বেলঘড়িয়া ভৈরব গাঙ্গুলি কলেজের অডিটোরিয়াম হলে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়েশাকে সংবর্ধিত করলেন এলাকার ‘বেতাজ বাদশা’ মদন মিত্র। এছাড়া সংবর্ধনা দেওয়া হয় রাজাবাজারের ওই ক্যারাটে প্রশিক্ষণ শিবিরের আরও পাঁচ শিক্ষার্থীকে। যাঁরা আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ক্যারাটে ওয়ার্ল্ড মিটে থাইল্যান্ডে যাচ্ছেন। তাঁদের সংবর্ধনা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় জয়ের জন্য আশীর্বাদও করেন মদন মিত্র।

এছাড়া এদিন কামারহাটি পুরসভা এলাকার মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও জয়েন্টে উত্তীর্ণ কৃতীদের পুরস্কৃত করা হয়। এদিনের অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রী তাপস রায়, কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান গোপাল সাহা, চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিল কালাম আনসারি সহ বিশিষ্টরা।
এদিনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই উত্তেজনা ছিল স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। সন্ধ্যাবেলা মদন মিত্র গিয়ে পৌঁছাতেই সেই উত্তেজনা আরও চরমে পৌঁছায়। অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও জয়েন্টের কৃতী ছাত্রছাত্রীদের সংবর্ধনা দেওয়া হলেও মূল ফোকাস ছিল আয়েশার দিকেই।

প্রাক্তনমন্ত্রী মদন মিত্র তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই আয়েশার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। বলেন, ‘আয়েশা মৃগী রোগি। পদ্মপুকুরের একটি বস্তির দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তা সত্ত্বেও ও যেভাবে আজ তিন তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তা সমস্ত মেয়ের কাছে প্রেরণা’। এর পরেই আয়েশার ভবিষ্যত জীবনের সাফল্যকামনা করেন রাজ্যের প্রাক্তনমন্ত্রী। সেই সঙ্গে আয়েশার সুবিধা, অসুবিধা, প্রয়োজনে তাঁর পাশে দাঁড়ানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
বর্তমান পৃথিবীতে যেভাবে খুন, ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে তাতে উদ্বেগপ্রকাশ করেছেন রাজ্যের পরিষদীয়মন্ত্রী তাপস রায়।

তিনি বলেন, যেকোনও ধরনের হেনস্থা থেকে বাঁচতে হলে প্রত্যেক ছেলেমেয়ের উচিত ক্যারাটে, কুংফু ও জুডো শেখা। সেই সঙ্গে এমএ আলি যেভাবে বস্তির মেয়েদের আত্মরক্ষার জন্য নিখরচায় ক্যারাটে শেখাচ্ছেন তারও ভূয়সী প্রশংসা করেন মন্ত্রী’। আয়েশার সম্পর্কে বলেন, ‘আয়েশা দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হয়েও যেভাবে হার না মানা জেদ নিয়ে লড়াই করেছে ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। রাজ্য, কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার আয়েশাকে সহযোগিতা করা উচিত’। পাশাপাশি সরকারিভাবে আয়েশাকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মন্ত্রী।

প্রাক্তনমন্ত্রীর কাছে সংবর্ধনা পেয়ে আপ্লুত আয়েশার কোচ এমএ আলি। তিনি বলেন, ‘মদনদার উদ্যোগেই আমরা রাজাবাজারে ক্যারাটে প্রশিক্ষণ শিবির চালু করেছিলাম। ওখান থেকেই ছ’জন ক্যারাটে ওয়ার্ল্ড মিটে যাচ্ছে। এটা আমাদের কাছে সত্যি গর্বের বিষয়। তবে সকলেই বস্তির মেয়ে হওয়ায় থাইল্যান্ডে যাওয়ার অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে’। এই পরিস্থিতিতে ওই দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর আর্জি জানিয়েছেন আলি।