টিডিএন বাংলা ডেস্ক : সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনও প্রশ্নহীন নয় দেশের অবস্থান। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর (আরএসএফ) স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান ১৩৮তম। দল নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের তেমন একটা দেখা মেলে না এদেশে। সম্প্রতি সেই বিপন্নতার ভয়াবহ চিত্র ধরা পড়েছে খোদ সংবাদমাধ্যমেরই ক্যামেরায়। অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম কোবরাপোস্টের ছদ্মবেশী সংবাদকর্মীর গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বিজেপির সঙ্গে মিডিয়ার আঁতাতের দৃশ্য। অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনেও বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে হিন্দুত্ববাদ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নেমেছে জাতীয় মিডিয়া। প্রমাণ মিলেছে, বিজেপিপন্থী প্রচারণা চালাতে প্রধান ধারার সংবাদমাধ্যমগুলো ডানপন্থীদের কাছে থেকে ঘুষ নিয়েছে। আঁতাতকারী দুই পক্ষ শীর্ষ ধারার মিডিয়া আর হিন্দুত্ববাদীরা কোবরাপোস্টের দাবি অস্বীকার করছে। শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলো এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ না করায় অমুনাফাভিত্তিক ও দুর্বল কোবরাপোস্টের ভিডিওগুলো জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে না। কোবরাপোস্টের একজন প্রতিনিধি ভুয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদী গ্রুপের সদস্যের ছদ্মবেশে বিভিন্ন মিডিয়া হাউসে যান। টাইমস অব ইন্ডিয়ার স্বত্বাধিকারী বেনেট, কোলম্যান এন্ড কোম্পানি লিমিটেড, ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্তান টাইমস মিডিয়ার শীর্ষ মোট ২৬টি সংবাদমাধ্যম তার ফাঁদে পা দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মিডিয়া কর্তারা হিন্দুত্বের ছদ্মবেশধারী কোবরাপোস্টের ওই রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলছেন। রিপোর্টার তাদের প্রস্তাব দিচ্ছেন কীভাবে হিন্দুত্ব ছড়িয়ে দিতে হবে। ২৬টি মিডিয়া হাউসের ভিডিওর মধ্যে ইতোমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে ১৭টি ভিডিও। বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রকাশ করবে কোবরাপোস্ট।

২০১৯ সালের মে মাসে লোকসভা নির্বাচন। নির্বাচনে জিতলে আরও পাঁচ বছর দায়িত্বে থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কোবরাপোস্ট তাদের অনুসন্ধানে দেখিয়েছে, আসছে নির্বাচনে আবারও বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে মিডিয়া ৩টি কৌশলের মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়োজিত। প্রথম কৌশল হিসেবে তারা এমন অনুষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, যেগুলো হিন্দু বার্তা ছড়ায়। দ্বিতীয় কৌশলের অংশ হিসেবে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস, ভারতে বহুদিন ধরেই নিপীড়ত গোষ্ঠী দলিতদের নেতা মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি ও উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের মতো নেতাদের বিরুদ্ধে হিন্দু নেতাদের বক্তব্য সংগ্রহ করে তা প্রচার করছে। আর তৃতীয় কৌশল হিসেবে উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার মধ্য দিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে মিডিয়া। কোবরাপোস্টের ওই ছদ্মবেশী রিপোর্টারকে বারবার বলা হচ্ছিলো, কীভাবে এই কৌশলে মিডিয়ার কাছে অনেক টাকা আসবে।

কূটনীতি বিষয়ক সাময়িকী ফরেন পলিসির এক বিশ্লেষণ বলছে, কোবরাপোস্টের ভিডিওগুলো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। কারণ, মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো এটি প্রচার থেকে বিরত থাকছে। কিছু কিছু সংবাদ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এগুলোকে বানোয়াট আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোবরাপোস্টের বিরুদ্ধে আইনি পথও অনুসরণ করেছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। কোবরাপোস্টকে আইনি নোটিশ পাঠিয়ে ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপ দাবি করেছে, ‘এই ভিডিওগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন দর্শকের ভুল বার্তা দেওয়া যায়।’ আর বিসিসিএল কোবরাপোস্টের ছদ্মবেশী ওই সাংবাদিককে ‘ধোঁকাবাজ’ আখ্যা দিয়েছে। এইচটি মিডিয়ার প্রধান নির্বাহী এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ভিডিওতে তার মন্তব্যকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে ছদ্মবেশে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকের অতীত নিয়েও।

পার্লামেন্টের এক কনজারভেটিভ সদস্য স্বপন দাসগুপ্ত কোবরাপোস্টের এই ভিডিওগুলোকে ‘মধুর ফাঁদ’ আখ্যা দিয়ে এগুলোর সত্যতাকে উড়িয়ে দেন। তবে কোনও সংবাদমাধ্যমের বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে মিডিয়ার ইতিবাচক অবস্থান থাকার মধ্যে অবাক হওয়ার মতো কিছু দেখেন না তিনি। তবে মিডিয়া সরাসরি একপাক্ষিক অবস্থান নিলে তাতে সংকট সৃষ্টি হয় বলে মনে করেন তিনি। মিডিয়ার অবস্থান নেওয়ায় তিনি অবাক নন বলেও জানান। তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ মোদির পক্ষে আর কিছু মানুষ মোদিবিরোধী। তবে সংবাদমাধ্যমে একপাক্ষিক মতামত প্রকাশ পেলে সংকট সৃষ্টি হয়।’ কোবরাপোস্টের সংবাদকর্মী ছদ্মবেশে ও যে প্রক্রিয়ায় গোপন ক্যামেরায় ভারতীয় মিডিয়া আর ডানপন্থীদের আঁতাত তুলে এনেছে, তা স্টিং জার্নালিজম নামে পরিচিত। এই ধারার সাংবাদিকতার পথপদ্ধতি বিতর্কিত। তবে স্বপন দাশগুপ্তও বলছেন, ভিডিওগুলো সত্য হলে, সহজেই অনুমান করা যায়, যেকোনও একটা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কতটা মরিয়া। ভিডিওগুলো সত্য হলে ভারতীয় ইতিহাস পরম্পরার আরেকটা ভয়াবহ দিক উন্মোচিত হয়। তা হলো, ধর্ম আর রাজনীতির মিশ্রণ সবসময়ই সম্প্রদায়গত সংঘাতকে উসকে দিতে সক্ষম।

ফরেন পলিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রায়শই বিভিন্ন দুর্নীতির চিত্র ফাঁস করে আসছে কোবরাপোস্ট। এর আগে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, মানিলন্ডারিংয়ে অভিযুক্ত ব্যাংক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল তারা। এর সম্পাদক অনিরুদ্ধ বলেন, ‘যখন মিডিয়া নিজেই সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে চায় ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মানহানি করতে চায় তখন সেটা অবশ্যই অপরাধ।’ কোবরাপোস্টের এই অভিযানকে ‘অপারেশন ওয়ানথার্টিসিক্স’ নাম দিয়েছেন অনিরুদ্ধ। সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের করা ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সের ২০১৮ সালের তালিকা তখনও প্রকাশিত হয়নি। ২০১৭ সালের তালিকায় ভারতের অবস্থান ছিল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৩৬ তম। সেখান থেকেই এই নামকরণ। তবে ২০১৮ সালে এসে এই অবস্থান পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৮তম। আফগানিস্তানও সূচকে ভারতের থেকে এগিয়ে আছে। তাদের অবস্থান ১১৮তম। বহুত্ববাদ, স্বআরোপিত-সেন্সরশিপ, স্বাধীনতা আর স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি করা হয়। অনিরুদ্ধ বাহাল বলেন, তিনি টাকার বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশের ভারতীয় সংস্কৃতিকে জনসম্মুখে আনতে চান। সেই উদ্দেশ্যেই ২০০৩ সালে তিনিই ওয়েবসাইটটি প্রতিষ্ঠা করেন।

দেশের রাজনৈতিক ও সংস্কৃতি বিষয়ক সাময়িকী দ্য ক্যারাভান-এর রাজনীতি বিষয়ক সম্পাদক হারতোষ সিং বাল ফরেন পলিসিকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে জাতীয় মিডিয়াগুলো ঘুষ না নিয়েও সরকারের কাছে নতজানু হয়ে পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা এমন না যে কংগ্রেস তাদের সুবিধার জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করেনি। তবে বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধিতার পরিসর আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সরাসরি মোদির নামোল্লেখ না করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের ক্ষমতায় এখন একজন স্বৈরশাসক বসে রয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে তার কোনও সমালোচনাই তিনি মানতে পারেন না।’ তার মন্তব্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহকে মিডিয়ার বর্জন করা উচিত।

দ্য ওয়্যায়-এর আইনি পরামর্শক পামেলা ফিলিপোজ বলেন, ‘গত কয়েক বছরে বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো রাজনৈতিক শক্তির কাছে নতজানু হতে বাধ্য হয়েছে।’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিলস ভার্নিয়ার এক্ষেত্রে খোদ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিক ভূমিকাকে গুরুত্ব দিতে চান। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভ্যালেকে তিনি বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে আমরা সরকারের খুব বেশি সমালোচনা দেখতে পাই না, তার কারণ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নিজে। মিডিয়া এজেন্ডাকে প্রতিহত করার দারুণ ক্ষমতা আছে তার। জনগণের সামনে মিডিয়াকে নিয়ে ঠাট্টা করেন তিনি। তার রসবোধ ও কণ্ঠ তার এই অবস্থানের সহায়তা করে।

প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া প্রকাশিত ‘সেফটি অব জার্নালিস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৮০ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সাজা পেয়েছেন মাত্র একজন। এতেই বোঝা যায় রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে সাংবাদিকরা কতটা কোণঠাসা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যভিত্তিক সংবাদপত্র মিন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা রাজু নারিসেটি মনে করেন, মোদি প্রশাসনের অধীনে সংবাদমাধ্যম ৭১ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতাহীনতায় ভুগছে এমন আলামত স্পষ্ট। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন রাজু। উপ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালেরও। রাজু নারিসেটি বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরকার ও বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সাংবাদিকরা। তবে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ প্রক্রিয়া বজায় রাখে। ওপরে ওপরে মুক্ত বিতর্কের পরিবেশের ছদ্মবেশ থাকলেও চূড়ান্ত অর্থে ভারতীয় মিডিয়া স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপে ভরপুর।’ রাজুর দাবি, সেই স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের বাইরেও অনেক বিষয়ই আছে যেসব সংবাদ পরিবেশনায় কেন্দ্রীয় ইস্যুটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

কোবরাপোস্টের এই ভিডিওগুলোতে অর্থ বিনিময়ের আলাপ হলেও সরাসরি কোনও অর্থ বিনিময় হতে দেখা যায়নি। তবে অনিরুদ্ধ বাহাল বলছেন, তাদের ভিডিও উদাহরণ হাজির করেছে যে কতটা সহজে দেশের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াকে টাকা দিয়ে প্রভাবিত করা যায়। তার মতে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে সংবাদমাধ্যম কতটা প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তাদের ফাঁসকৃত ভিডিও সেই বিষয়কেই সামনে এনেছে।

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট