নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলা, মুর্শিদাবাদ: আজ ৭৩ তম স্বাধীনতা দিবস। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দেশ জুড়ে যখন স্বাধীনতা দিবস পালিত হবে তখন ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার মুহুর্তে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস প্রায় বিস্মৃতির অন্তরালে চাপা পড়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই অজানা মুর্শিদাবাদের স্বাধীনতার ভিন্ন ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট সারাদেশে তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা উড়লেও ওড়েনি মুর্শিদাবাদে। তিনদিন পর ১৮ ই আগস্ট মুর্শিদাবাদ জেলাজুড়ে পতপত করে উড়ে তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা। খুলে ফেলা হয় পাকিস্থানের সবুজের মাঝে চাঁদতাঁরার জাতীয় পতাকা। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট থেকে ১৭ ই আগস্ট এই তিনদিন মুর্শিদাবাদ জেলা পাকিস্থানের মধ্যে ছিলো। অন্যদিকে বর্তমান বাংলাদেশের সাবেক খুলনা জেলা ১৫-১৭ ই আগস্ট তিনদিন ভারতের মধ্যে ছিলো। ১৮ ই আগস্ট বিনিময় পদ্ধতিতে মুর্শিদাবাদ জেলা ভারত কে দেওয়া হয়, বিনিময়ে পাকিস্থান পায় খুলনা জেলা। এখন অবশ্য খুলনা পাকিস্থানেও নেই রয়েছে বাংলাদেশে।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় দেশভাগে ততকালিন কংগ্রেস নেতৃত্ব, মুসলিম লিগ এবং ব্রিটিস শাসক আলোচনার টেবিলে বসে আলোচনার সময় ভুল বুঝাবুঝিতে মুর্শিদাবাদ জেলাকে দেওয়া হয় পাকিস্থানের অন্তর্ভুক্ত করে। খুলনা থেকে যায় ভারতের মধ্যে। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট মুর্শিদাবাদ জেলাজুড়ে প্রথম স্বাধীনতা দিবসে পাকিস্থানের পতাকা তোলা হয়। বহরমপুর শহরে সরকারি অনুষ্ঠান টি হয় ব্যারাক স্কোয়ার মাঠে। এই অনুষ্ঠানে পাকিস্থানের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ততকালিন মুর্শিদাবাদের জেলা শাসক আইএখান (আইসিএস)। স্বাধীনতা দিবসের এই অনুষ্ঠানে ততকালিন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির যুব নেতা বর্তমানে প্রয়াত সিপিএমের তাত্বিক নেতা সুধীন সেন গান গেয়েছিলেন, “আমার সোনার পাকিস্থান আমি তোমায় ভালোবাসি।” অবশ্য তখন কমিউনিস্ট পার্টি ও তাদের নেতারা দেশের স্বাধীনতাকে প্রথম থেকেই মেনে নেন নি। অনেকেই তখন বলেছিলেন এ আজাদি ঝুটা হ্যায়। শুধু বহরমপুর নয় মুর্শিদাবাদ ঐতিহাসিক হাজার দুয়ারি প্যালেসেও পাকিস্থানের পতাকা উত্তোলন করা হয়। সেই সাথে জেলার বিভিন্ন প্রান্তেও ওড়ানো হয় পাকিস্থানের জাতীয় পতাকা। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট প্রথম স্বাধীনতা দিবসে কিছু মুসলিম লিগের উগ্র নেতৃত্ব বহরমপুর শহরে অস্ত্র ও তলোয়ার হাতে উগ্র মিছিল করে। দেশভাগ ও পাকিস্থানের পক্ষে স্লোগান দেওয়া হয়। এরই মধ্যে মুর্শিদাবাদের নবাব ওয়াসেফ আলি মির্জার মতো ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্ব ময়দানে নামেন এভাবে ভাগাভাগি করার বিরোধীতায়। নবাব ওয়াসেফ আলি ইংল্যান্ডে পড়াশুনা করায় উচ্চ শিক্ষিত ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৩৭ সালে নবাব ওয়াসেফ আলি মির্জা তৈরি করেছিলেন হিন্দু মুসলিম ইউনিটি আসোসিয়েশন। আঞ্জুমানই মুসলমানই বাংলা। এই নবাব দাবি তোলেন মুর্শিদাবাদ কে ভারতভুক্ত রাখতে হবে। কংগ্রেস ও মুসলিম নেতৃত্ব আলোচনায় বসে কোনো সুরাহা হয় নি। পাকিস্থান পন্থী মুসলিম লীগ নেতারা একটা জেলা তার উপর মুর্শিদাবাদের মতো ঐতিহাসিক জেলা ছাড়তে রাজি হন নি। তখন বিনিময় পদ্ধতির জন্য আলোচনা হয়। মুর্শিদাবাদ জেলাকে ভারত ভুক্ত করার বিনিময়ে খুলনা জেলাকে ছাড়তে হয়। সিদ্ধান্ত হয় দুই দেশের বর্ডার যত বেশি নদী বর্ডার হবে ততইই শাসনকাযে ও সীমানা নির্ধারণে সুবিধা হবে। এই যুক্তিতে একদিকে গঙ্গা পদ্মা নদীকে সীমান্ত করে দেশভাগ করে মুর্শিদাবাদ জেলাকে ভারতভুক্ত করা হয় ১৯৪৭ সালের ১৭ ই আগস্ট রাতে। ১৮ ই আগস্ট সকালে মুর্শিদাবাদ জেলায় তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। যা আজও গর্বের সঙ্গে পতপত করে উড়ছে।

মুর্শিদাবাদ ও খুলনা জেলার এই নাটকীয় পরিবর্তন প্রক্রিয়া শেষ হয় ১৭ ই আগস্ট রাতে। ১৮ ই আগস্ট জেলাজুড়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে উতসবের মতো স্বাধীনতা দিবস পালন করে মুর্শিদাবাদ বাসী। ততকালিন জেলা শাসক আই এ খান ১৯৪৭ সালের ১৭ ই আগস্ট পদত্যাগ করে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে চলে যান। একই রকম ভাবে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে ততকালিন পুর্ব পাকিস্থানে চলে গেছেন।