তাবড় রাজনীতিকদের মধ্যে গত ৫ বছরে বিদ্বেষী মন্তব্যের প্রবণতা প্রায় ৫০০ % বেড়েছে

টিডিএন বাংলা ডেস্ক : পাকিস্তানের পঞ্জাবের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ফৈয়াজুল হাসান চৌহান তাঁর বক্তৃতায় হিন্দু বিদ্বেষী মন্তব্য করেছিলেন। প্রথমে দেশের সংখ্যালঘুরা তাঁর সামালোচনায় মুখর হন। পরে সিনিয়র নেতারাও সমালোচনা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। তারপর তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জোরালো হতে থাকে। এরপ পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নির্দেশে তাঁকে সরাসরি বরখাস্ত করা হয়।

ভারতের সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী ভারতের নাগরিকরা যেকোনো ধর্মাচরণ করতে পারেন। ভারত বহুত্ববাদে বিশ্বাসী। এখানে সব ধর্মের সমান অধিকার। পাকিস্তান কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্র। উদাহরণ- অমুসলিম নাগরিক রাষ্ট্রপতি হতে পারেন না। সংখ্যালঘুরা এদেশের বুকে অনেক স্বচ্ছন্দে থাকতে পারেন বলে গর্ব অনুভব করে ভারত। ভারত ভূখণ্ডে সংখ্যালঘুরা পাকিস্তানের চেয়ে স্বচ্ছন্দে বাস করতে পারে বলে গর্ব অনুভব করে ধর্ম নিরপেক্ষ এই রাষ্ট্র। হিন্দু বিদ্বেষী মন্তব্যের পর খোদ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তত ভারতের চেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার পাকিস্তান। নরেন্দ্র মোদী যদি ইমরান খানের পথ অনুসরণ করতেন তাহলে এক বিপুল তালিকায় মন্ত্রীদের বরখাস্ত করতে হত তাঁকে।

ভারতের বুকে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের পর কার্যত যাঁদের টিকিটি কেউ স্পর্শ করেন না, কারা তাঁরা দেখে নেওয়া যাক।

১. মহেশ শর্মা
সালটা ২০১৫। ইন্ডিয়া টুডে টিভি কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী মহেশ শর্মা বলেছিলেন, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম একজন মহান মানুষ ছিলেন। তিনি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও জাতিয়তাবাদী, মানতাবাদী ছিলেন। তিনি কি বলতে চেয়েছিলেন? মুসলিম হলেও মানে? মুসলিম হওয়া এবং জাতীয়তাবাদী ও মানবতাবাদী হওয়ার মধ্যে কি কোনো বিরোধ আছে? একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির ধর্ম নিয়েই বা তিনি কী করে কটাক্ষ করেন? এরপরেও কেন তাঁর সমালোচনা হয় না?

২. অনন্ত কুমার হেগড়ে
অনন্ত কুমার হেগড়ে তিনি তখন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৬ সালের বিস্ফোরক মন্তব্য। বললেন, বিশ্বে ইসলাম থাকলে, সন্ত্রাসবাদ থাকবে। ইসলামের মূল না উৎপাটন না করলে, সন্ত্রাসবাদকে হটানো যাবে না। তিনি আরে বলেন, বিশ্ব শান্তি বাতাবরণে ইসলাম একটা বোমা। ৫ বারের এই সাংসদ এরপর তাঁর এই মন্তব্যের জন্য পুরস্কৃত হলেন। পরবর্তী রদবদলের সময় তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী করা হয়।

৩. সাধ্বী নিরঞ্জন
দিল্লিতে তখন বিধানসভা ভোটের প্রচার চলছে। সাধ্বী নিরঞ্জন সেই সময় প্রচারে এক বিতর্কিত মন্তব্য করলেন। কী বললেন? আপনারা রামের উত্তরাধিকার চান না অবৈধ কোনো জাতক চান? আপনারাই ঠিক করুন কাকে চান? এরপরে বিতর্ক ওঠা স্বাভাবিক। তিনি অবৈধ জাতক বলতে কাকে বোঝাতে চেয়েছেন? এই নিয়ে বহুত্ববাদের দেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে যাওয়া উচিত। প্রবল চাপের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংসদে বললেন তাঁর এই মন্তব্য করা উচিত হয়নি। কিন্তু এর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

৪. গিরিরাজ সিং
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পপ্রতিমন্ত্রী গিরিরাজ সিং ঝাড়খন্ডের দেওঘরে নির্বাচনী সভায় বলেছিলেন, মোদীর বিরোধিতা করলে পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর হয়। পরে তিনি জামিন পেয়ে যান। ২০১৬ সালে তিনি মুসলিমদের অধিক সন্তান জন্ম নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেন তিনি।

৫. সাধনা সিং
বিজেপি বিধায়ক সাধনা সিং মায়াবতী সম্পর্কে একসময় আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। বলেছিলেন, তিনি নারী জাতির লজ্জা। তাঁকে রূপান্তরকামীর সঙ্গেও তুলনা করেন। পরে সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি এই মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন।

৬. অনুপ্রিয়া প্যাটেল
কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া প্যাটেল। ট্যুইটারে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, ১০০ কোটিকে কেন ২০ কোটি মোল্লার (মুসলিম)দের ভয়ে থাকতে হবে? এরপর ভুয়ো খবর ছড়ানোর জন্য তিনি একটি এফআইআর –ও করেন। যদিও পরে অনেক বিজেপি মন্ত্রীই তাঁকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন, নিন্দা বাক্য তো দূর অস্ত।

৭. শোভা কারান্ডলাজে
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বিদ্বেষী মন্তব্যের জন্য গ্রেফতার হয়েছিলেন বিজেপি সাংসদ শোভা কারান্ডলাজে। তাঁর মন্তব্যের জন্য ২ গোষ্ঠীর মধ্যে অশান্তি শুরু হয়। যার জেরে এলাকার শান্তি নষ্ট হয়। তিনি সিদ্দারামাইয়াকে ট্যুইট করে ট্যাগ করেন কেন তিনি `জেহাদি’-দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

৮. যোগী আদিত্যনাথ
২০১৫ সালের নভেম্বর। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, শাহরুখ খান ও হাফিজ সঈদের মন্তব্যের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। শাহরুখ দেশে অসহিষ্ণুতা নিয়ে মুখ খোলায় তাঁর বিরুদ্ধে এই মন্তব্য করেন আদিত্যনাথ।

৫ বারের লোকসভার সংসদ আরো বলেন, বিশাল সংখ্যক মানুষ সমর্থন তাঁর ওপর থেকে সরে গেলে তিনি এক সাধারণ মুসলিমের মতো পথে ঘুরবেন। বলিউড তারকাকে তিনি পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরামর্শও দেন। ২০০৭ সালে বিদ্বেশপূর্ণ মন্তব্য করার তালিকায় মুখ্যমন্ত্রীর নাম ছিল। কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব উত্তর প্রদেশ সরকার ক্ষমতায় এসে পুলিশকে কোনও ব্যবস্থা নিতে নিষেধ করেন। এলাহাবাদ হাই কোর্ট তাঁর নির্দেশই বহাল রাখে। যদিও আদিত্যনাথ স্বীকার করেছিলেন বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের কথা।
আবেদনকারী বলেছিলেন, তিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার বার্তা দেওয়ায় তা গোরক্ষপুরে সাম্প্রদায়িক হিংসার জন্ম দেয়।

৯. টি রাজা সিং
তেলেঙ্গানার বিজেপি বিধায়ক টি রাজা সিং একসময় বলেছিলেন, অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রের পথে বাধা ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দুত্বের ধারণা। গত বছর নভেম্বরে তিনি বলেছিলেন, যাঁরা গোমাংস খান, সেরকম মুসলিমদের ভোট তিনি চান না। কারণ তাঁরা তাঁর আবেগে আঘাত করেন। এরপরে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

১০. বিনয় কাটিয়া
বজরং দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিনয় কাটিয়ার বলেন, মুসলিমদের তাঁদের অংশ, অর্থাৎ জমি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানে চলে যান। তিনি দেশভাগের জন্য মুসলিমদের দায়ী করেন।

১১. তথাগত রায়
মেঘালয়ের রাজ্যপাল ও একজন সিনিয়র নেতা তথাগত রায় কাশ্মীরিদের বয়কটের ডাক দেন। ট্যুইটারে তাঁর এই আবদেন নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

১২. বিক্রম সিং সাইনি
উত্তর প্রদেশের বিধায়ক বিজয় সাইনি বলেছিলে, সাম্প্রদায়িকভাবে স্পর্শকাতর এলাকা মুজফ্ফরপুর ২০১৩ সালের দাঙ্গার কেন্দ্র ছিল। তিনি আরো বলেন, কিছু নেতা জন্য আজকে আমরা সমস্যায় আছি। না হলে পুরো ভূখণ্ড আমাদের হত। জানুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, যাঁরা এই দেশে নিরাপদ বোধ করেন না, তাঁদের বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া উচিত।

পরিসংখ্যান বলছে, বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের হিড়িক বেড়েছে। ইউপিএ জমানায় ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ২১ জন রাজনীতিতের দেওয়া ২১ টি বিদ্বেষী মন্তব্যের দৃষ্টান্ত সামনে এসেছিল। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৪৪ জন রাজনীতিকের ১২৪ টি বিদ্বেষী মন্তব্যের নমুনা সামনে এসেছে। এনডিএ আমলে এই প্রবণতা ব্যাপক ভাবে বাড়ছে। রাজনীতিকদের মধ্যে বিদ্বেষী মন্তব্যের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত চোখে পড়ছে না।