টিডিএন বাংলা ডেস্ক: ‘করোনা ভাইরাস আমাদেরকে মারতে পারবে না, তার আগেই আমরা না খেয়ে মরে যাব’ আমি পশ্চিম দিল্লির রাস্তায় রাস্তায় বুভুক্ষু মানুষের মিছিলে এ কথা বার বার শুনেছি। যখন আমি একদল স্বেচ্ছাসেবী যুবকদের সঙ্গে লকডাউন পরবর্তী পরিস্থিতিতে গরিব মানুষদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করার জন্য উপস্থিত হয়েছিলাম। তখন বারবার শুনছি গরিব মানুষের হাহাকার- ‘আমরা না খেয়ে মরে যাব, কী করে বাঁচবো আমরা ?’ তারা বলছেন, ‘নোট বন্দি তো কিছুই নয়, এই যে অবস্থার সৃষ্টি হল তাতে আমরা আর বাঁচবো কী করে? এর এক ঘণ্টা পরেই আমি শুনলাম অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিতারমন গরিব মানুষদের জন্য আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করছেন।

তাঁর কথায়, করোনাভাইরাস মোকাবিলা এবং লকডাউন এর কারণে একটি মানুষও ক্ষুধায় মারা যাবে না। তিনি দাবি করলেন তার আর্থিক প্যাকেজ করোনা মোকাবেলা এবং গরিব মানুষদের খাদ্য সরবরাহ করার জন্য।


তিনি কি নিজেই বিশ্বাস করেন ৫ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল আর ১৫০ টাকা একটি পরিবারের তিন মাসের জন্য যথেষ্ট? তিনি বৃদ্ধ, বিধবা ও অক্ষমদের জন্য ১০০০ টাকার ত্রান ঘোষণা করেছেন। আর চাষীদের জন্য ২০০০ টাকা ট্রান্সফার এর কথা বলেছেন। সত্যিই কি এটি বাঁচার সামগ্রী? যদি যা বলেছেন তাই জনগণ পায়ও? প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী তারা কেউই অসংগঠিত শ্রমিক, ফুটপাতবাসী ও অসহায় মানুষদের জন্য কোন ঘোষণা দেননি।

প্রধানমন্ত্রী বলছেন, সম্পন্ন মানুষরা কোনরকমে সামলে নেবে কিন্তু আমাদেরকে গরিব মানুষের কথা ভাবতে হবে। সত্যিই কি গরিব মানুষদের জন্য তার এই ভাবনা? অর্থনীতির যে সুনামি শুরু হয়েছে তার হাত থেকেই বাঁচানোর জন্য এই আয়োজন কী অতিক্ষুদ্র নয়? তাছাড়া এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কি এত সহজ? কিভাবে তিনি অসহায় বৃদ্ধ বিকলাঙ্গ মানুষদের একাউন্টে টাকা পাঠাবেন? যাদের একাউন্ট নেই, যাদের কোন কাজ নেই তাদেরকে তিনি কীভাবে সাহায্য করবেন? চিন্তার বিষয় হল, অর্থনৈতিক মন্দার কথা সরকারও মানতে চাচ্ছে না।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ জয়তি ঘোষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে প্রথম দিনেই যে পরিমাণ আর্থিক পতন ঘটেছে সেটাই উদ্বেগের। অথচ সরকার করোনা মোকাবিলায় যতটা তৎপর ঠিক ততটাই উদাসীন অর্থনীতির পতন নিয়ে।


চাষিদের জন্য প্যকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কে চাষ করবে? কে কিনবে চাষির মাল? ছোট ছোট সমস্ত কারখানা বন্ধ, উদ্যোগ শেষ, নির্মাণ শিল্প ধ্বংসের পর্যায়ে, অসংগঠিত শ্রমিক, হোটেল শিল্প ধ্বংসে পর্যবসিত, এই অবস্থায় কিভাবে অর্থনৈতিক ভাবে উঠে দাঁড়ানো সম্ভব?


আমি বারবার এক ব্যক্তি কে বলতে শুনেছি ‘আমি রাস্তায় জন্মেছি, আমি রাস্তায় বড় হয়েছি্, আমি রুটি তৈরি করতে জানি এবং রুটি তৈরি করে আমি দৈনিক ৫০০ টাকা রোজগার করি, এখন দুটো রুটির জন্য আজকে আপনাদের কাছে আমার হাত পেতে দাঁড়াতে হচ্ছে। তার এই করুণ আকুতিতে সত্যিই লজ্জায় আমার মাথা হেট হয়ে গেল|

আমরা যেখানে খাদ্য দিচ্ছিলাম কাকে খাদ্য দেব? লাইনে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ বলছেন, খাবারের আশায় ৬ ঘন্টা থেকে তারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে বলছেন, তিনদিন থেকে একটিও দানা পেটে পড়েনি| যদি কোনভাবে খবর পৌঁছায়- ওখানে খাবার দেয়া হচ্ছে, তাহলে সেখানে পৌঁছানোর জন্য মানুষের ভিড় লেগে যায়। দুর্বল, অক্ষম্, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধীরা পড়ে থাকে অসহায় ভাবে। তাদের কথা কেউ ভাবেনা, ক্ষুধা মানুষকে অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে। তারা কারো করুণা চায়না। তারা কাজ চায়। কাজ করে খেতে চায়। আরও তিন সপ্তাহ এই ভাবে চললে অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে? খাবারের অভাবে অভুক্ত অবস্থায় মানুষ মারা যাবে না তো?

মানুষ চিৎকার করছে খাবারের জন্য। শহরে তাদের জন্য কাজ নেই, খাদ্য নেই। কোনরকমে গ্রামে ফিরে যেতে পারলেই হয়তো প্রাণে বাঁচা যেত। বন-বাদাড় খাল-বিল থেকে হয়তো পেটের ক্ষুধা মেটানো যেত। কিন্তু সেখানেও বিপদ। প্রধানমন্ত্রীর লকডাউন ঘোষণা করার সাথে সাথেই বাস-ট্রেনসহ সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্তব্ধ।

সরকার বিদেশ থেকে প্রবাসী নাগরিকদের নিয়ে আসার জন্য প্লেন পাঠালেন। তাদের জন্য মেডিকেল টিমের ব্যবস্থা হল। তাদেরকে যত্ন করে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হল। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে থাকা লক্ষ লক্ষ অসহায় মানুষ আটকে পড়ে গেলেন দেশেরই ভিন্ন ভিন্ন শহরে। তারা যাবে কিভাবে, ফিরবে কিভাবে, সরকারের কোন মাথা ব্যাথা নেই? তারা যখন পায়ে হেঁটে শত শত কিলোমিটার অতিক্রম করে গ্রামে ফেরার জন্য উদ্যোগ নেয় তখন বর্ডার পুলিশের লাঠি তাদের জন্য অপেক্ষা করে। ক্ষুধার্ত পেটে ক্লান্ত পায়ে পুলিশের লাঠি খেতে খেতে তারা হতাশ হয়ে পড়ে। বাড়ি ফিরতে পারে না। পেটের ক্ষুধা, পুলিশের মার কোনটা সহ্য করবে তারা? তবুও মন মানে না, কেউ কেউ উদ্যোগ নেয় সাইকেল নিয়ে চোরাপথে শত শত মাইল অতিক্রম করে দেশে ফেরার। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ সফর এই বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি সত্যিই আমাদেরকে লজ্জিত করে।


ফিনান্সিয়াল প্যাকেজ ঘোষণা করার আগে সরকার কোনভাবেই গরিবদের কে আশ্বস্ত করেনি। তারা ভাইরাস আক্রান্ত হলে কোথায় চিকিৎসা করবেন? কোথায় তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে? তাদের বাঁচানোর জন্য কি ব্যবস্থা? কোন ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। আমরা নিউজিল্যান্ড, ইতালি থেকে কিছু শিখতে পারি না? সরকারের সমস্ত পরিকল্পনা অর্থ বানদের জন্য, তাদের জন্য সমস্ত ব্যবস্থা। ক্ষুধার কথা ছাড়ুন, যদি ক্ষুধার হাত থেকে বেঁচেও যায় কিন্তু যদি তারা ভাইরাস আক্রান্ত হয়, যদি তারা পথে ঘুরতে ঘুরতে করোনার গ্রাসে পড়ে তাহলে তাদেরকে কে বাঁচাবে? কোন উত্তর নেই|

প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে পি চিদাম্বরম বলেছেন বিপর্যয় মোকাবেলায় আমরা প্রধানমন্ত্রীর অনুগত সৈনিক। বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী উঠে পড়ে লেগেছেন। কিন্তু আমি আতঙ্কিত হচ্ছি। এই সরকারের সমস্ত জায়গায় পরিকল্পনার অভাব। আমরা কি তাইওয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার থেকে শিক্ষা নিতে পারতাম না? তারা কিন্তু লকডাউন ঘোষণা না করেও করনা ভাইরাসের মোকাবেলা করেছে। আর যদি সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করতেই হয় তাহলে তার আগে কি প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই? কোটি কোটি মানুষ অসহায়, বেকার, ক্ষুধার্ত, গরীব তারা কোথায় যাবে? কিভাবে বাঁচবে? সে নিয়ে কোনো রোডম্যাপ, ভাবনা চিন্তা করার কোনো দায় নেই সরকারের? রাষ্ট্রের কাজ ধনী-গরীব সকলের জন্য ব্যবস্থা করা।

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, যখন রাষ্ট্রের একদম প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত উন্নয়ন পৌঁছে যাবে তখনই বোঝা যাবে রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীর এই কথা আজকের রাষ্ট্রের বাস্তবতার সঙ্গে মেলালে কোথায় যায়? আজকের প্রান্তিক মানুষরা যেভাবে অবহেলিত তাতে সত্যিই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার কী কোন অর্থ আছে?