টিডিএন বাংলা ডেস্ক: ভারতীয় জনতা পার্টির মূল চালিকা শক্তি হল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আদর্শ। সেই আদর্শ মেনেই ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার জোরদার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। আরএসএস এ দেশের মুসলিমদের ‘ঘর ওয়াপসি’ চাইছে। তাদের দ্বিতীয় শ্রেনির নাগরিক বানাতে চায়। আরএসএস এদেশে মুসলিমদের অস্তিত্ব মেনে নিতে চায় না। মব লিনচিংয়ের মাধ্যমে মুসলিমদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। নির্মম হত্যার ভিডিয়োগ্রাফি করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির জন্য। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম খ্রিস্টানদের জন্য আরএসএস এর আলাদা গোপন কর্মসূচি রয়েছে।’ আর এই বিষয়গুলি ভালোভাবে জানেন জমিয়তে উলিমার প্রধান মাওলানা আরসাদ মাদানি। তবুও তিনি নিজে থেকে নয়াদিল্লিতে আরএসএস হেড কোয়ার্টার কেশবকুঞ্জ-এ গেলেন সংঘপ্রধান মোহন ভাগবতের সঙ্গে গোপন বৈঠকে। মাওলানা বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেও এই বৈঠক করলেন কেন এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মুশাওয়ারাতের এক সদস্য। মাদানি-ভাগবত গোপন বৈঠক নিয়ে এবার উঠেছে নানা ধরনের প্রশ্ন। জমিয়তের পক্ষ থেকে এইসব প্রশ্নের কোনও সদুত্তরও দেওয়া হচ্ছে না, সে কারণে ভারতের মুসলিম সমাজ ক্রমশই এই বৈঠকের পক্ষে ও বিপক্ষে দু’ ভাগ হয়ে পড়েছেন প্রকাশ্যেই। এই বৈঠক নিয়ে প্রথম মুখ খোলেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম মজলিশ -এ-মুশাওয়ারাত।
মুশাওয়ারাত এর সক্রিয় সদস্য ও প্রাক্তন সাংসদ মুহাম্মদ আদীবা মাওলানা আরসাদ মাদানির উদ্যেশ্যে বলেন, আপনি এমন এক সংগঠনের প্রধানের সঙ্গে কথা বলতে তাদের অফিসে গেলেন, যারা আপনার এবং মুসলিমদের অস্তিত্ব কোনওদিন মেনে নিতে চায়নি। গণপিটুনি বা মব লিনচিং -এর মাধ্যমে ‘জয় শ্রীরাম’ বলিয়ে নিয়ে তাদের হত্যার ভিডিয়ো ছড়ানো হচ্ছে। আরএসএস মনে করে তারা দেশ থেকে মুসলিমদের উচ্ছেদ কোনও দিন ও করতে পারবে না সে কারণে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। মুসলিমদের মর্যাদা দলিতদের থেকেও নিচে আসুক এটা চায় সংঘ পরিবার। তারা সরকারকেও তোয়াক্কা করছে না। সেই সংস্থার সঙ্গে কথা বলতে গেলেন মাওলানা মাদানি।
মুহাম্মদ আদীব একসময় অলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তিনি জানান, মাওলানা মাদানি ভাগবতের সঙ্গে কথা বলার আগে অন্যান্য মুসলিম সংগঠনগুলির সঙ্গে এই বিষয়ে আলাপ করে নিতে পারতেন। অন্যান্য দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন। মুহাম্মদ আদীবের মতে, তাই নিজের প্রচার বাড়াতে মাওলানা একাই গিয়েছেন কেশবকুঞ্জে। অথচ এই মাওলানা ৪ মাস আগে বলেছিলেন আরএসএস দেশের সংখ্যালঘুদের সবচেয়ে বড় শত্রু।
মুহাম্মদ আদীবের মতে, যদি এত বড়মাপের একজন নেতা আরএসএস কৌশলের কাছে মাথানত করে দেন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে?
এসডিপিআই নেতা ও এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী শারফুদ্দিন আহমদ এই প্রসঙ্গে বলেন, মাওলানা মাদানি ভালো করেই জানেন আরএসএস একটি আদর্শবাদী সংগঠন। তারা এখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের সেই রাষ্ট্রে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের কোনও স্থান নেই। তারা মুসলিম-খ্রিস্টানদের মানবিক অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায়। তাদের নীতি কট্টর পন্থার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। তাই এই সংস্থার সঙ্গে ততক্ষণ কোনও ধরনের বৈঠক করা উচিত নয়,যতক্ষণ না তারা তাদের কট্টরপন্থা বর্জন করছে।
ইন্দিরা গান্ধী ওপেন উননিভার্সিটির প্রাক্তন উপচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আসলাম জানান, কেশবকুঞ্জে এই হাই প্রোফাইল মিটিং অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না। একজন অপরজনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, কে কি বলে দেবেন, তা জানার জন্য। মুহাম্মদ আসলাম জানান, ইতিমধ্যে এ ধরনের অনেক বৈঠক হয়েছে আরএসএস -দের সঙ্গে। অনেক বৈঠকে বায়োডাটা পর্যন্ত জমা হয়েছে। কিন্তু আলোচনায় কোনও সুফল হয়নি গত পাঁচ বছরে।
দিল্লি সংখ্যালঘু কমিশনের প্রধান ড.জাফরুল ইসলাম অবশ্য সমালোচকদের পক্ষে নন। তিনি বলেন, মাওলানা আরসাদ মাদানি বড়মাপের নেতা। তিনি এসব ব্যাপারে নবীশ নন। ডাঃ ইসলাম বলেন, তবে আমি মনে করি কেশবকুঞ্জের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী জমিয়তে আহলে হাদিস সহ বড় মুসলিম সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা থাকলে ভালো হত। এ ধরনের কথাবার্তা চালানোর প্রয়োজন রয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে। আলোচনা না হলে মতের আদান-প্রদান হবে কি করে ?মাওলানা মাদানি ও ভাগবত বৈঠক নিয়ে কিছু নির্বোধ টাইপের মানুষ নানা ধরনের কটাক্ষ করেন, এটা অনভিপ্রেত। মাওলানা মাদানি একজন প্রজ্ঞাবান ব্যাক্তি তিনি ভারতীয় রাজনীতি সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। জাফরুল ইসলাম মনে করেন আরএসএস-কে বুঝতে হবে সংখ্যালঘুদের অবজ্ঞা করে গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না। আর সব মুসলিম সংগঠনগুলিকে এক হয়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। সেই পরিবেশ তৈরি হতে চলেছে বলে মনে করছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ৩০ আগষ্ট এই বৈঠক হলেও আরএসএস কোনওভাবে এই বৈঠকের কথা প্রচার করতে চায়নি। জমিয়তের পক্ষ থেকে ৩ দিন বাদ প্রথম জানানো হয় ভাগবতের সঙ্গে মাদানির বৈঠকের কথা। তারপর থেকে সমালোচনার সুর চড়তে শুরু করেছে। ভাতিজা মাহমুদ মাদানিও তাঁর চাচার এই বৈঠকের সমর্থন করে বলেছেন, এই ধরনের বৈঠকের যৌক্তিকতা রয়েছে। মাহমুদ মাদানিও গতকাল বলেছেন, শিবাজি একজন নির্ভীক সুশাসক ছিলেন। আওরঙ্গজেবকে শিবাজির কাছে খাটো করে দেখালেন মাহমুদ মাদানি। সৌজন্য: পুবের কলম