টিডিএন বাংলা ডেস্ক : একদিকে বাঙালি বিরোধী জঙ্গি আন্দোলনের হুমকি, অন্যদিকে পুলিশের সীমান্ত শাখার তুঘলকি কান্ডে আসামের বাঙালিদের মধ্যে প্রবল আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আলফা জঙ্গিগোষ্ঠীর হুমকি এই আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আলফা নেতা মৃণাল  হাজারিকা ১৯৮৩ সালের সন্ত্রাস ফিরিয়ে আনার হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকির সঙ্গে যোগসূত্র থাকুক বা না থাকুক তিনশুকিয়ার ধলায় গুলিতে খুন হওয়া পাঁচ বাঙালিই নমঃশূদ্র জনজাতি বা দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ। এনআরসি নিয়ে উদ্ভুত সাম্প্রতিক বিতর্কের সঙ্গে এই গণহত্যার সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে দাবী করে সারা ভারত নমঃশূদ্র বিকাশ পরিষদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংকে চিঠি দিয়েছেন। বিকাশ পরিষদের হিসাবে, আসামে এনআরসি ছুট ৪০ লক্ষের মধ্যে ৩২লক্ষ হিন্দু বাঙ্গালি, তাদের ২৫ লক্ষই নমঃশূদ্র। ফলে বহু বাঙালি মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ জন বাংলাভাষী মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। যার মধ্যে হিন্দু বাঙালির সংখ্যাই বেশি। এদের প্রত্যেককেই ডাউটফুল (ডি) ভোটারের নোটিশ ধরিয়ে নাগরিকত্ব প্রমান করতে বলা হয়েছিল। 

রেলওয়ে কোয়ার্টারে ভারাটে হিসাবে থাকতেন ৫৯ বছর বয়সী পেশায় শিক্ষক বিমলচন্দ্র ঘোষ। রাজ্যের হাতিগড় এনআরসি কেন্দ্রে কর্মরত তথা টকলা মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক পদে ছিলেন তিনি। এনআরসি খসড়ায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় হতাশ হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। একইভাবে, মায়ের নাম নেই নাগরিকপঞ্জিতে। ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল-এ মামলা লড়তে লড়তে গচ্ছিত অর্থও শেষ। হাইকোর্টে মামলা লড়তে প্রয়োজন টাকার। কিন্তু পরিবারের অবস্থা নুন আনতে পানতা ফুরায়। শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথই বেছে নিলেন বাকসার বাসিন্দা ৩৭ বছরের বিনয় চন্দ। মাত্র ২০ দিন আগেই পুত্রসন্তান জন্মেছিল বিনয়ের। ওদালগুড়ি জেলার দীপক দেবনাথ (৪৯)-এর ১৯৭১ সালের লিগ্যাসি তথ্য রয়েছে। সেই হিসাবে এনআরসির প্রথম তালিকায় তার নামও ওঠে। কিন্তু দ্বিতীয় তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ে। বর্ডার পুলিশ তাকে ‘অবৈধ’ বলে নোটিশ পাঠাতে থাকে।এই অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হন দীপক। এর আগ এই ওদালগুড়িতেই আত্মঘাতী হয়েছিলেন গোপাল দাস নামে এক বাঙালি। আর গত ২১ অক্টোবর আত্মহত্যা করেছেন খারুপেটিয়ার এক আইনজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিরোদবরণ দাস।

 

এনআরসি -কে কেন্দ্র করে চলতি বছরেই যে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে, তা নয়। ২০১৫ সাল থেকেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে অঘটনের এই তালিকা। এনআরসি নবায়নের অপরিহার্য অঙ্গ লিগ্যাসি ডেটা না থাকায় তাঁর আবেদনপত্র গ্রহণ না করায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান হোযাইয়ের বাসিন্দা নারায়ণ মজুমদার। বরাক উপত্যকার সোনাই পূর্বাঞ্চলের দক্ষিন মোহনপুরের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ বিধবা সাইবুন্নেসা লস্কর গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। নথি যোগাড়ের সঙ্কট অনেক বাঙালিকেই আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তাছাড়া রয়েছে ট্রাইব্যুনালের মামলা চালানোর খরচ। কেন্দ্র সরকার  গরিব মানুষদের নিখরচায় আইনি পরিষেবা দেবার কথা বললেও, আসাম সরকারের হাতে সেই পরিষেবা দেবার পরিস্থিতি নেই। পাশাপাশি, এনআরসির চূড়ান্ত খসড়ায় যাদের নাম ওঠেনি, তাদের দাবী ও আপত্তি লিপিবদ্ধ করার সময়সীমা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। পূর্বেকার ১৫টি নথিতে দাবীর সপক্ষে প্রামাণ্য দলিল হিসাবে পেশ করার অনুমতি দিয়েছে শীর্ষ আদালত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আগেই যারা ওই ১৫ টি নথিতে এনআরসি-তে নাম তুলতে পারেনি, তারা আবার নতুন করে ওইসব নথি কোথা থেকে পাবেন? আসামে এনআরসি ছুট প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষকে এখন সরাসরি ‘অবৈধ বিদেশী ‘ বলেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর দাবীও উঠছে কোনো কোনো মহল থেকে। কেন্দ্র আশ্বাস দিয়েছে, এনআরসি ছুটরা তালিকায় নাম তোলার জন্য সুযোগ পাবেন। কিন্তু সেই সুযোগ কী শুধু নামেই?

Not available