টিডিএন বাংলা ডেস্ক: সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত অযোধ্যা মামলার রায়ে স্পষ্ট বলেছে ,১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার ঘটনা সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে হয়েছিল। এটা ছিল একটা ফৌজদারি অপরাধ এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির ওপর সরাসরি আঘাত। সিপিআই(এম) সঠিকভাবে দাবি তুলেছে যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমস্ত মামলগুলির অবিলম্বে নিষ্পত্তি করা এবং এই ধ্বংসকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের অবিলম্বে শাস্তি দেওয়া উচিত।

সেই সময় দিল্লিতে ছিল কংগ্রেসের নরসিমা রাও’র সরকার। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন ছিলেন কংগ্রেসের সাংসদ ও দিল্লির মন্ত্রী। যখন বাবরি মসজিদ ভাঙার উন্মত্ত তান্ডব টেলিভিশনে সম্প্রচার হচ্ছে, তখন গোটা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা নিরব ও স্থবির হয়ে বসেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও টু শব্দটি করেননি। এরাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বারবার নরসিমা রাওকে অনুরোধ করেছিলেন ব্যবস্থা নেবার জন্য। সিপিআই(এম) ৩৫৬ ধারা প্রয়োগের বিরোধী হলেও জাতীয় সংহতির স্বার্থে ব্যতিক্রমমী হিসাবে তিনি সেদিন ওখানে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করতে বলেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রীসভা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। দেশের মানুষ জানতেন মসজিদ ভাঙা হবে, অথচ মন্ত্রীসভা জানত না। এটা কখনও সম্ভব? গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল না?

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর কেন্দ্রীয় সরকার এই ঘটনার তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি লিবেরহানের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করে। কিন্তু কমিশন দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার বদলে গড়িমসি করে ১৭ বছর সময় নেয়। তারপর বিস্তৃত রিপোর্ট জমা দিল ২০০৯ সালে। এই লিবেরহান কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জ্যোতি বসু বলেছিলেন ‘বাবরি মসজিদ ধংসের দু’দিন আগে আমি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলাম, চারদিক দিয়ে উদ্বেগজনক সব খবর আসছে। করসেবকরা প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। তবে উনি আমায় বলেন, কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক আছে, সেখানে পরিস্থিতি আলোচনা করে তবে কেন্দ্রের তরফে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মসজিদের কাঠামো মাটিতে মিশে গেল, মানুষ দেখল তা। জানা গেছে বেশ কয়েকজন বিজেপি শীর্ষনেতা ঘটনাস্থলে ছিলেন। এখন তাদের কয়েকজন বিজেপি সরকারের মন্ত্রীসভাতেও রয়েছেন। এরপরে যখন হরকিষেন সিং সুরজিৎ, তখন সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক, আর আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম তখন জিজ্ঞাসা করি, কেন মসজিদ রক্ষায় কোনও ব্যবস্থা নিলেন না। উনি শুধু বললেন, আমি কি করে একজন মুখ্যমন্ত্রীকে (উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং) অবিশ্বাস করব। উনি আমায় কথা দিয়েছেন সেরকম কিছু হবে না’ হয়েছিল ঠিক উলটো।

লিবেরহান কমিশন ৬৮ জন বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কর্মকর্তাকে বাবরি মসজিদ ধংসের পিছনে মূল মদতদাতা বলে চিহ্নিত করেছিল। এর মধ্যে ছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানী, মুরলিমনোহর যোশী, উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতম্ভরা, অশোক সিংঘল, গিরিরাজ কিশোর প্রমুখ। বাজপেয়ী ছাড়া আর সবারই বিরুদ্ধে সিবিআই চার্জশিটও দিয়েছে। কিন্তু আজও পর্যন্ত এদের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেন হল না?

রিপোর্টের পঞ্চদশ অধ্যায়ে ১৭২ নং হতে ১৭৫ নং ধারাতে সুপারিশগুলি উল্লেখিত হয়েছে। সুপারিশের ক্ষেত্রে ১৭২ নং ধারায় বাবরি মসজিদ ধংসের ঘটনার বিষয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ (১৯ টি ),১৭৩ নং ধারায় সিভিল সংক্রান্ত বিষয়ে সুপারিশ (১১ টি),১৭৪ ধারায় সরকারের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলি সম্পর্কে মতামত ও সুপারিশ (৫ টি) এবং ১৭৫ নং ধারায় কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট সুপারিশ (৭টি) আছে। সুপারিশগুলি প্রণিধানযোগ্য এই কারণে যে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটানো হয়েছিল এবং আজও ঘটেছে, কিভাবে আমলাতন্ত্র, পুলিশ প্রশাসনের একটা বড় অংশ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মদত জুগিয়েছেল এবং আজও জোগাচ্ছে।

রিপোর্টে সঠিকভাবে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি আমলা, আধিকারিক, সাংবিধানিক সংস্থার পদাধীকারী, মন্ত্রীমন্ডলী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কোনও ধর্মীয় সংগঠন কিংবা ঐ দৃষ্টিকোণ হতে তৈরি দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা ট্রাস্টগুলির কর্মকর্তা হবেন না, কেন না তা জনগণের অপর অংশকে অসন্তুষ্ট ও আহত করবে। কিন্তু তা কি মানা হচ্ছে?

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের এটা সুনিশ্চিত করা উচিত যে, কোনও নাগরিক যদি এই অভিযোগ করে যে কোনও দল বা ব্যক্তি ধর্মীয় ভাবাবেগকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক লাভালাভের জন্য তাহলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিয়ে তা বন্ধ করা এবং প্রয়োজনে তাকে বা তাদেরকে প্রার্থীপদের অযোগ্য ঘোষণা করা।প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ দেশের আদর্শকে রূপায়িত করতে হলে জাতিবিদ্বেষমূলক বা দল নির্বাচনী ইশতেহারে সন্নিবিষ্ট করলে তাকে নির্বাচনী অপরাধ হিসাবে গন্য করতে হবে এবং সেই ব্যক্তি বা দলের নির্বাচনে প্রতিদ্বদ্বিতা করার যোগ্যতা বাতিল করতে হবে। সংসদ, বিধানসভাগুলি ও নির্বাচিত সরকারগুলি এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে এই অঙ্গীকার করতে হবে যে, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা হবে না।

লিবেরহান কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমান ব্যবস্থায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করেছে তা হলো পুলিশ এবং রাজনীতিকদের মধ্যে,আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিকদের মধ্যে অশুভ আঁতাত এবং ব্যাপক দুর্নীতি যা ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া আছে রাজনীতিবিদ,মন্ত্রীদের চাপে ওদের অসহায় অবস্থা। সারা দেশে পুলিশ ও আমলাবাহিনীর উপযুক্ত ট্রেনিং এবং উন্নত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানমূলক কৃৎকৌশলের অভাব আছে। এই ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য এবং পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য নানা কমিটি নানা সুপারিশ করেছে।কিন্তু নানা বাধার কারণে তা রূপায়িত হয়নি। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঘটনায় এটা দেখা যাচ্ছে যে, আমলা ও পুলিশ প্রশাসনের ২১ শতকের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু আজ অবধি রিপোর্টের সুপারিশ কার্যকর করার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।(গণশক্তি)