টিডিএন বাংলা ডেস্ক: শার্লক হোমসের গোয়েন্দা উপন্যাসের মতো উপরের নাটকীয় শিরোনাম দেখে ভ্রু কুঁচকাবেন না । ‘মিল্লি গেজেট’  খবরের কাগজকে নিয়ে এই রহস্যময় মামলা কিন্তু এক অতি বাস্তব ঘটনা। সম্পাদক জাফরুল ইসলাম খান সাহেব বাস্তবের মাটিতে তার নিউজ পেপার নিয়ে ঘটে যাওয়া তিন বছর ধরে চলা এই নাটকীয় কাহিনী সম্বন্ধে নিজেই বর্ণনা করেছেন এক সাংবাদিকের কাছে । সচেতন পাঠককে তা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। তাই নিউজ লন্ড্রি-র এই প্রতিবেদনটি টিডিএন বাংলার  পাঠকদের সামনে পেশ করা হল-

জাফরুল ইসলাম খান তার অফিসের চেয়ারে বসলেই সেটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে শব্দ করে। বুড়িয়ে যাওয়া কাঠের চেয়ারটি এভাবেই তার জীর্ণদশা মালিকের কাছে জানান দেয়। অফিসে চারিদিকে ডাই করে রাখা কাগজপত্র,উঁচু উঁচু ফাইলের স্তুপ।এঘরটি পুরানো দিনের স্কুলের কথা মনে করিয়ে দেয়। জামিয়ানগরে তার বাড়ির একেবারে নিচের তলায় অফিস।দেওয়াল জুড়ে ট্রফি সার দেওয়া। সাপ্তাহিক ‘মিল্লি গেজেট’ পত্রিকাকে এসব পুরস্কার দেওয়া হয়েছে জাতির প্রতি অনবদ্য অবদান ও ত্যাগের কথা স্মরণ করে। দেশের ২০ কোটি মুসলিমের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশার কথা তুলে ধরে এই ‘মিল্লি গেজেট’ পত্রিকা। আর এই পত্রিকার সম্পাদক হলেন খোদ জাফারুল ইসলাম খান।

জাফারুল সাহেবের বসার চেয়ারের পেছনে একটা বোর্ড দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে লাগানো। সবুজ রঙের এই বোর্ডের উপর পিন দিয়ে আটকানো ছোট-বড় নানা কাটিং এর দরকারি নোটিশ। সেখানে মিল্লি গেজেট এর একটি সংস্করণ এর প্রথম পাতাতেই টাঙ্গিয়ে রাখা আছে। গর্বিত এই পাতাটির শিরোনাম ‘আমরা মুসলিমদের নিয়োগ করি না’ আয়ুশ মন্ত্রক।

এটি ২০১৬ সালের মার্চ মাসের একটি রিপোর্ট যা ‘মিল্লি গেজেট’ তাদের কাগজে প্রকাশ করে।রিপোর্টটিতে দেশের আয়ুশ মন্ত্রক (যার মধ্যে আয়ুর্বেদ, যোগ,ইউনানি,সিদ্ধা,হোমিওপ্যাথি সব বিভাগই অন্তর্ভূক্ত) কীভাবে ধর্মের ভিত্তিতে পক্ষপাতমূলকভাবে নিয়োগ প্রদান করছে তার স্বরুপ উন্মোচন করে দেয়।

সে সময় মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলি খবরটি হট কেকের মত লুফে নেয়।আর এই ঘটনার জের ধরেই দিল্লি পুলিশের সঙ্গে খান সাহেবের প্রকাশনীর আইনী লড়াই শুরু হয় যা পরবর্তী তিন বছর ধরে চলে।আর এই যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অভিযোগ অনুসারে, একটি জাল চিঠি,ভয় দেখানোর কিছু প্রচলিত টেকনিক এক সাংবাদিককে নিয়মবিরুদ্ধ গ্রেফতার,উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রমাণপত্র পেশ করতে দেরি করা যা উপর মহলের আধিকারিকদের দেখাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। আর এসবের মাঝেই ২০১৬ সাল শেষ হতে না হতেই ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায় ‘মিল্লি গেজেট’-এর।

ঘটনার বিশদ বিবরণ এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হল-

আয়ুশ মন্ত্রক যে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নীতি হিসাবে মুসলমান কর্মচারী নিয়োগ করে না এ খবরটা পুষ্পা শর্মা নামে এক সাংবাদিক আমাদের কাছে নিয়ে আসে’, দেওয়ালের সফট বোর্ড এর উপর পিন দিয়ে আটকানো খবরের কাগজটির দিকে নির্দেশ করে জাফরুল সাহেব বলেন, সে আমাকে একটা আরটিআই উত্তরের কপি দেখায় যেখানে বলা আছে যে উক্ত মন্ত্রকের কোন মুসলিমকে নিয়োগ দেয়নি নীতিগত কারণে।’

এরপরও খান সাহেব তার যথার্থ কর্তব্য পালন করেন। তিনি তথ্য জানার অধিকার আইনে বিষয়টির সত্যতা যাচাই করার আবেদন জানান এবং তিনি আরটিআই এর যে জবাব পান তা ওই সাংবাদিকের পাওয়া জবাবের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর খবরটি মিল্লি গেজেট পত্রিকায় ছাপা হয় ২০১৬ সালের ১৬ ই মার্চ। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন যে পুষ্প শর্মার আরটিআই ফাইল করা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয় খবরটা কাগজের ছাপার পর এবং এর সত্যতা নিয়ে তদন্ত চলে।

স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সরকারের অন্দরমহলের খবর টেনে আনলে প্রত্যাঘাত আসাটা অপ্রত্যাশিত বা অভূতপূর্ব কোন বিষয় নয়। আর ঠিক তাই ঘটল। খবরটি প্রকাশিত হওয়ার পর ২৪ ঘন্টা গড়াতে গড়াতে কোনরকম বিবৃতি দেওয়া বা আপত্তি মূলক কোনো চিঠি পাঠানো (সংবাদমাধ্যম থেকে এটি করতে বলা হয়) এসব কোনটাই করা হল না। পরিবর্তে আয়ুশ মন্ত্র সোজা কোটলা মুবারাকপুর থানায় চিঠি পাঠাল ‘মিল্লি গেজেট’ ও তার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার জন্য।

খান সাহেব বলেন, তৎক্ষণাৎ থানা থেকে প্রায় এক ডজন পুলিশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সাংবাদিক পুষ্প শর্মাকে তুলে নিয়ে তারা। কোটলা মুবারাকপুর থানায় তাকে আনা হয়। সেখানে তিন,চারদিন ধরে আটকে রাখা হয় তাকে।এই কদিন ওকে জেরা করা হয়, তবে সরকারি খাতাপত্রে কিন্তু গ্রেপ্তার করা হয়নি তাকে। ইতিমধ্যে আমরাও আইনজীবীর সাহায্য নিই এবং এই অবিচার নিয়ে আওয়াজ তুলি।

এরপর পুষ্প কে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর ওকে আবার গ্রেফতার করা হয়। এবার সরকারিভাবে রীতিমত আয়োজন করে। তারা (পুলিশ অধিকর্তারা) ওর বাড়িতে রেইড করে। ল্যাপটপ, সিডি ক্যাসেট ইত্যাদি সিজ করা হয়, অভিযোগ করা হয় তিনি নাকি মিথ্যা বানোয়াট খবর প্রকাশ করেছিলেন।পুষ্পকে গ্রেফতার করে তিহার জেলে চালান করা হয় এবং দু সপ্তাহ সেখানে বন্দী থাকতে হয়। পুষ্পর ল্যাপটপ ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠানো হয়। দু’সপ্তাহ পরে আমরা ওনার জামিন করতে সমর্থ হই।

এখনও অবধি পুষ্পর আর কোন খবর নেই। যদিও তার বিরুদ্ধে মামলাটি এখনও চলছে সকেত কোর্টে। ফরেন্সিক ল্যাব থেকে জানানো হয় উনার ল্যাপটপ থেকে জাল কোনো নথি পাওয়া যায়নি এবং ওরা তাকে ক্লিনচিট দেয়’, বলেন খান সাহেব।

৩০ মে,২০১৬ ‘মিল্লি গেজেট’-কে দিল্লি পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (লাইসেন্স বিভাগ) শোকজ নোটিশ পাঠায়।নোটিশে বলা হয়, শ্রী পুষ্প শর্মা নামের জনৈক ব্যক্তি ‘মিল্লি গেজেট’এর মালিক/প্রকাশক/সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে একটি খবর ছাপা নিয়ে, যেখানে মিথ্যা দাবি করা হয় সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সমাজের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করছে। নোটিসে বলা হয়, ‘মিল্লি গেজেট’ ১৮৬৭ সালের প্রেস আইন এবং রেজিস্ট্রেশন অফ বুকস-এর ৮ (বি)ধারা অমান্য করেছে এবং ‘মিল্লি গেজেট’এর লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না সে সম্পর্কে কোনো উপযুক্ত কারণ দর্শাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

খান সাহেব ও তার প্রকাশনীকে জবাব পেশ করার জন্য পরবর্তী ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। নোটিশে জানানো হয়, নির্দেশের অন্যথা হলে ধরে নেওয়া হবে যে বিষয়টি নিয়ে আপনার কোন বক্তব্য নেই। সেক্ষেত্রে, মামলাটি তার নিজের পথে চলবে।

নোটিশটি হাতে পাওয়ার পর খান সাহেব হকচকিয়ে যান।এটা বেমালুম মিথ্যা যে পুষ্প শর্মা মিল্লি গেজেট বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। সে আমাদের কাছে লিখিত এফিডেভিটে শপথ করে জানিয়েছে যে, সে এধরনের অভিযোগ কোনও সময় করেনি। আমি পুলিশের কাছে প্রত্যুত্তরে ৭ জুন ২০১৬ লিখে পাঠাই যে অভিযোগের একটি কপি আমাকে দেওয়া হোক, যাতে করে আমি যথাযথ নিয়ম মেনে তার উত্তর দিতে পারি। কিন্তু আমাকে কিছুই দেওয়া হয়নি।

এরপর খান সাহেব এই অভিযোগপত্রটি আসলে যে কি, তা জানার জন্য তথ্য জানার অধিকার আইন মারফত আরটিআই ফাইল করেন বিশদ জানার জন্য। আরটিআই এর জবাবে আমাকে জানানো হল যেহেতু আমি তৃতীয় পক্ষ, সেহেতু আমার হাতে বিস্তারিত কিছু দেয়া যাবে না। আমি পুনরায় চিঠি লিখলাম যে এই ক্ষেত্রে আমি প্রথম পক্ষের অথবা দ্বিতীয় পক্ষের হয়ে জানতে চাই। তারপরও আমাকে বিস্তারিত কোনও কপি দেয়া হল না। আমি তখন ওই একই অফিসের উচ্চ কর্তৃপক্ষকে আবেদন জানাই।এবারও প্রচেষ্টা নিষ্ফল হল এবং আজ অবধি আমি এই তথাকথিত অভিযোগপত্রটি যে আসলে কি তা চোখেই দেখিনি। পুলিশ আধিকারিকরা সময় নিল, তারপর উত্তরে খান সাহেবকে এফআইআর একটি কপি পাঠায়, কিন্তু সেখানে চিঠির কোন চিহ্ন ছিল না। ওরা আমাকে একগুচ্ছ কাগজপত্র পাঠাল, কিন্তু সেখানে চিঠির কোন কপি ছিল না। আমি মনে করি, এই অভিযোগপত্রের আসলেই কোনো অস্তিত্ব নেই,বলেন খান সাহেব।

১২ অক্টোবর ২০১৬, খান সাহেব ওদের কাছে চিঠি লেখেন,আপনারা আমাকে যে এফআইআর (নং ০২২৫১৬) কোটলা থানায় দায়ের করা হয়েছে তার কপি পাঠিয়েছেন, তা পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক এবং আপনাদের ও আমার সময়ের অপচয়ও বটে….গত ৩০ মে ২০১৬’য় আমাকে পাঠানো আপনাদের আসল শোকজ নোটিশে আপনারা জনৈক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন, যিনি আমাদের নিউজ পেপারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। এই প্রেক্ষিতে আমার পূর্বের চিঠিতে আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ জানাই নিম্নলিখিত তথ্য আমাকে প্রদানের জন্য যাতে আমি যথাযথভাবে আপনাকে শোকজ নোটিশের জবাব দিতে পারি ১) অভিযোগের ভিত্তিতে আপনারা আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন।

২) এবং কিসের ভিত্তিতে আপনারা ১৮৬৭ সালের প্রেস রেজিস্ট্রেশন আইনের ৮ (বি) ধারায় আমাকে নোটিস পাঠিয়েছেন তার একটা কপি।’ খান সাহেব চিঠির অন্তিম অংশে লেখেন, ‘অনুগ্রহপূর্বক আমাদেরকে উপরে উল্লেখিত ডকুমেন্ট দুটি প্রদান করুন, যার দরুন আমরা আমাদের নিউজ পেপারের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে স্পষ্ট ভাবে যথার্থ সংক্ষিপ্তরূপে আমাদের অবস্থান জানতে সক্ষম হই।

এদিকে চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য, খান সাহেবকে প্রেস কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (পিসিআই) থেকে তলব করা হয়। ঘটনার বিবরণী আগে পিছু কী ঘটেছিল সব কিছু জানতে চায় তারা। তিনি বলেন, আবারও আমরা আইনজীবী নিয়োগ করলাম এবং ওদেরকে জবাব দেয়া হল। এরপর তারা ১৬-১৭ মধ্য তিন থেকে চারবার শুনানির জন্য ডাকে। অবশেষে মামলা খারিজ হয়।

খান সাহেব জানান, পিসিআই-এর সঙ্গে তৃতীয় শুনানির সময় তাকে কিছুটা হয়রানির শিকার হতে হয়। তার সঙ্গে ঔদ্ধত্যমূলক আচরণ করে। যাই হোক শেষ পর্যন্ত কেসটা বাতিল হয়। ইতিমধ্যে ২০১৬ সালে মিল্লি গেজেট বন্ধ হয়ে যায়। এর অনলাইন ভার্সানটি কেবল চালু থাকে।খান সাহেব জানান, অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি এই মামলা-মোকদ্দমা ও হয়রানি কাগজটি বন্ধ হওয়ার পিছনে অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছিল।

জাফারুল খান জানান, এরপর বিষয়টি নিয়ে তিনি কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের দ্বারস্থ হন (সি আই সি)। তারা সময় নেয়। এক বছর পর আবার শুনানির জন্য নোটিশ পাই। প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ৪ জুলাই ২০১৮ জেএনইউ ক্যাম্পাসের সামনে সিআইসি-র অফিসে। সেখানে দিল্লি পুলিশ এবং তাদের আইনজীবীরাও উপস্থিত হন।

তার কথায়, সিআইসি কমিশনার পুলিশের উপর বেজায় চটে যান এবং তাদেরকে নির্দেশ দেন খান সাহেবকে  অভিযোগের কপি দেখাতে।কমিশনার পুলিশকে আরও বলেন যে,এই তথ্যটি নিয়ে আর বেশি দিন চুপচাপ থাকতে পারে না তারা, যেহেতু অনেকদিন থেকেই শোকজ নোটিশটি ঝুলে আছে।

এতদ্বসত্ত্বেও, সেই কথিত পুষ্প শর্মার দায়ের করা অভিযোগপত্রটি তাকে দেওয়া হয়নি। খান সাহেব বলেন,আমি আবারও সিআইসিকে পত্র লিখে জানাই যে পুলিশ কিভাবে সিআইসির আদেশ উপেক্ষা করেছে, বেঁধে দেওয়া নির্ধারিত সময় তারা না মেনেছে, না জরুরী পেপার পত্র নিয়ে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করছে।

এরপর পরই, খান সাহেবকে প্রশাসন তরফে ফোন করা হয় এবং তাকে তাদের সামনে হাজিরা দিতে বলা হয়। তিনি যেতে অস্বীকার করে জানান, তিনি কোন অপরাধী নন যে হাজিরা দেবেন।

তখন তারা আমাকে ফর্মাল নোটিশ পাঠায় ২০১৮, অক্টোবরের ৯ তারিখে এবং আমাকে ১২ অক্টোবর, ২০১৮ ওদের অফিসে আসতে বলা হয়।২০১৬ সালের এপ্রিলে ‘মিল্লি গেজেট’ নিউজ পেপারের লাইসেন্স বাতিল সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলার জন্য। কিন্তু আমি এই চিঠি হাতে পাই ২৩ অক্টোবর,২০১৮।

চিঠিটি হাতে পাওয়ার পরের দিনই খান সাহেব আবারও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখেন, আমি আপনাদের প্রেরিত উপরে উল্লেখিত ৯-১০-২০১৮ তারিখের চিঠিটি হাতে পাই ২৩-১০-২০১৮। এই চিঠি মারফত আমাকে ৩০-০৫-২০১৬ তারিখে পাঠানো শোকজ নোটিসের প্রেক্ষিতে ১২-১০-২০১৮ আপনাদের অফিসে যেতে বলেন কাঁটায় কাঁটায় বৈকাল চারটার সময়। তার মানে দাঁড়ায় আপনাদের পাঠানো চিঠিটি আপনাদের অফিসে দেখা করার যে নির্ধারিত তারিখ ধার্য করা হয় তার থেকে ১১ দিন পরে আমার কাছে এসে পৌঁছায়।

আসলেই পুলিশ কবে চিঠিটি ডাক বিভাগে ফেলেছে খান সাহেব এর মধ্যে বিষয়টি তলব করার জন্য নিজেই সার্চ করে ফেলেন। তিনি লেখেন, ‘যেহেতু স্পিড পোষ্টের মাধ্যমে আপনাদের চিঠিটি পাঠানো হয়… আমি indiapost.govt.in (ডাকবিভাগের অনলাইন ওয়েবসাইট) খুলি চিঠির ট্রাক রেকর্ড দেখার জন্য। আমি অবাক হলাম,ট্রাকিং রেকর্ড বলছে চিঠিটি সাউথ দিল্লীর উপ ডাকবিভাগে ফেলা হয় ১৭ অক্টোবর ২০১৮তারিখে, সময় বিকাল ২.৩১ এবং চিঠিটি নিউ ফ্রেন্ড কলোনি উপবিভাগে এসে পৌঁছায় ১৮ অক্টোবর, ২০১৮। তার মানে এই দাঁড়ায় যে উপর উল্লেখিত চিঠিটি আপনার অফিস চিঠির উপর লেখা পাঠানোর যে তারিখ তা থেকে পুরো আট দিন দেরিতে ডাকে ফেলে।অর্থাৎ যে তারিখে আমাকে আপনাদের অফিসে আসতে বলা হয় তার পাঁচ দিন পর চিঠিটি পোস্ট করা হয়েছিল।

এরপর কতৃপক্ষ পুনরায় খান সাহেবকে চিঠি লিখে পাঠায়। তাকে ৭ জানুয়ারি ২০১৯ ওদের অফিসে ডেকে পাঠায়।মি প্রভাকর যিনি লাইসেন্স বিভাগের জয়েন্ট  পুলিশ কমিশনার তার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের জন্য ওয়েটিং লাউঞ্চে আমাকে পুরো এক ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয়। এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে আমি তার অফিসের বাইরে বসে থাকা ক্লার্কের কাছে গেলাম এবং তাকে জানালাম আমার দ্বারা আর বসে থাকা সম্ভব নয়। এ সময় মি প্রভাকর অফিস থেকে বাইরে এলেন এবং ব্যাপার কি তা জানতে চাইলেন। আমি তাকে জানালাম যে আমাকে আসতে বলা হয় তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। আর সে কারণে আমি গত এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছি।

প্রভাকর খান সাহেবকে তার অফিসের মধ্যে নিয়ে গেলেন এবং বিষয়টি জানতে চাইলেন।খান সাহেব বিষয়টা খোলসা করে জানালেন যে তিনি খবরটি ছাপার পর আরটিআই করে যে তথ্য সংগ্রহ করেন তা প্রমাণ করে ‘মিল্লি গেজেট’ যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তা ভুল নয় তুমি জানতে চাইলেন যদি ভুল রিপোর্ট ছাপা হয় যে ভুল রিপোর্ট ছাপা হয় সেক্ষেত্রে কি হয়।প্রত্যুত্তরে আমি জানালাম, ‘কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্কে কোনও ভুল খবর ছাপা হয়েছে, তখন তিনি বা প্রতিষ্ঠানটি আমাদেরকে চিঠি লিখে জানায় আমরা সেটা ছেপে দিই, এটাই নিয়ম।এই নিয়ম মেনে যদি আমরা ওদের চিঠি ছাপি তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ প্রতিকার চেয়ে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে পারে। আমি তাকে এও বলি যে আমি আয়ুশ মন্ত্রককে চিঠি লিখেছিলাম, ওদের বক্তব্য কি তা লিখে পাঠাতে। কিন্তু ওরা কখনোই তা করেনি। পরিবর্তে ওরা পুলিশের কাছে জানাল ব্যবস্থা নিতে, খান সাহেব বলেন। এর অল্পক্ষণ পর বৈঠক সমাপ্ত হয়।

অবশেষে পুলিশের যুগ্ম কমিশনার এই খবরের কাগজকে জারি করা দীর্ঘ তিন বছর পুরানো যে শোকজ নোটিশ তা ২৫ জানুয়ারি একটি আদেশনামা মারফত প্রত্যাহার করে নেন। যদিও তার অনেক আগে কাগজটি প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায় এবং অনলাইন জগতে তার কাঠামোকে কোনরকমে ধরে রাখে।

কমিশনারের আদোশনামায় বলা হয়, ‘যেহেতু, নিম্নে স্বাক্ষরিত আধিকারিকের কাছে আপনি সন্তোষজনকভাবে বোঝাতে পেরেছেন যে আপনি সংশ্লিষ্ট (ক্ষুব্ধ/ব্যথিত) পক্ষ যদি রিজয়েন্ডার (অভিযোগ-অনুযোগ) পাঠায়, তাহলে আপনার তা প্রকাশ করতে কোনও বাধা নেই। এমনকি যদি এখন অবধি রেকর্ড অনুযায়ী তারা তেমন কোন স্পষ্টীকরণের জন্য অনুরোধ করেননি। আদেশনামার শেষে বলা হয়, ‘অতএব, আমি প্রভাকর, নয়াদিল্লির লাইসেন্স বিভাগের যুগ্ম কমিশনার উপরে আলোচিত বিষয়াদি বিবেচনা পূর্বক এতদ্বারা আপনাকে প্রদত্ত শোকজ নোটিশ নাকচ করলাম।’

যাই হোক মামলাটির কিন্তু এখন কোনো বিহিত হয়নি।পুষ্প শর্মা কর্তৃক কথিত সেই অভিযোগের চিঠি কিন্তু খান সাহেব এখনও দেখতে পাননি। খান সাহেব বলেন, বাক প্রকাশের স্বাধীনতাকে অবদমিত করা ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, যদি আয়ুশ মন্ত্রক তাদের দাবিতে সৎ থাকে, তাহলে তারা আমাকে চিঠি(রিজয়েন্ডার) পাঠাতে পারত এবং আমি সেটা প্রকাশ করতে সবসময় প্রস্তুত ছিলাম। আমি ওদেরকে (আয়ুশ মন্ত্রককে) বারংবার মেল পাঠিয়ে সে কথা বলেছি। কিন্তু ওরা কোন উত্তর দেয়নি। এমনকি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি।কেবল পুলিশ দিয়েই ওরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করল।

খান সাহেব বলেন,’মিল্লি গেজেট’ প্রিন্ট মিডিয়া হিসেবে প্রায় ১৭ বছর তার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে, তবে এখন তা অনলাইন জগতে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ২০১৬ সালের শেষের দিকে ‘মিল্লি গেজেট’-এর প্রিন্ট ভার্সন বন্ধ হয়ে যায়। দিন দিন বেড়ে ওঠা অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি এই অনভিপ্রেত ঘটনা কাগজ বন্ধ হওয়ার পিছনে অন্যতম কারণ।

এই পত্রিকা সবসময়ই আরএসএস, বিজেপির নীতির বিরোধিতা করেছে এবং মুসলিম কেন্দ্রিক তথাকথিত সন্ত্রাসী প্রচারণাকে বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরে। এই সন্ত্রাসের অভিযোগগুলি ৯৮ শতাংশ এই ধরনের ঘটনাই ভুয়ো, সাজানো। গল্প নয়, তথ্যপ্রমাণ দিয়েই আমরা এগুলো বলে আসছি। আমাদের এহেনে অবস্থান উপরমহলের পছন্দ হচ্ছিল না। তাই এইভাবে আমাদেরকে শিক্ষা দিতে চায়।

মিল্লি গেজেট এর দীর্ঘ তিন বছরে এই আইনী ও কূটনৈতিক স্তরের যুদ্ধ শেষ হয় এভাবেই।পত্রিকাটি এখনো মুসলিম মিল্লাতের জন্য তাদের সাংবাদিক সূলভ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। তবে পরিসর এখন অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে। উপস্থিতি অনলাইনে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে যা নিয়ে জাফারুল ইসলাম খান দুঃখ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, মিডিয়ার ওপর এই হস্তক্ষেপ নিয়ে তথাকথিত জাতীয় মিডিয়াগুলি তার পাশে দাঁড়ায়নি।

তার পত্রিকাটি সরকার বিরোধী কি? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মোদি বা সরকারের বিরোধী নই। তবে কোথাও অবিচার হলে আমরা তার বিরুদ্ধে কথা বলি।আমরা কংগ্রেসের আমলেও তাদের বিভিন্ন নীতি নিয়ে সমালোচনা করেছি এবং প্রতি তাদের অর্ধেক হৃদয় সম্পন্ন মনোভাবের বিরুদ্ধে আমরা কথা বলেছি।