টিডিএন বাংলা ডেস্ক: নীতীশ কুমারের সরকারকে কড়া ধমক সুপ্রিম কোর্টের। মুজফ্‌ফরপুর হোমে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বিহার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই রাজ্য থেকে মামলা দিল্লি আদালতে সরিয়ে নিল সুপ্রিম কোর্ট। জেডি(ইউ)-বিজেপি পরিচালিত বিহার সরকারের তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে এর আগেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে শীর্ষ আদালত। এদিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ তদন্তে ঢিলেমির জন্য কার্যত ধমক দিয়েছে রাজ্য সরকারকে। ‘‘যথেষ্ট হয়েছে, শিশুদের সঙ্গে এই আচরণ চলতে পারে না,’’ এই মন্তব্য করেই মামলা দিল্লি আদালতে সরিয়ে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। একইসঙ্গে সিবিআই’র প্রাক্তন অন্তর্বর্তী অধিকর্তা নাগেশ্বর রাওকে আগামী মঙ্গলবার আদালতে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

হোমে নির্যাতনের ঘটনায় তদন্তকারী সিবিআই আধিকারিককে কেন বদলি করা হয়েছে, সেই ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে তাঁকে। বিহার সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এদিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এ মামলা সংক্রান্ত যে কোনও ধরনের প্রশ্নে অসন্তোষজনক জবাব দেওয়া হলে মুখ্যসচিবকে সমন পাঠাতে বাধ্য থাকবে আদালত। দিল্লির আদালতে মামলা স্থানান্তরের নির্দেশের পর শীর্ষ আদালত আরও বলেছে, এখন থেকে সকেত জেলা আদালতের অধীনে পকসো আদালতে এই মামলার বিচার চলবে। বিচারপ্রক্রিয়া আগামী ছ’মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে বলেও নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। রঞ্জন গগৈ নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের আরও দুই বিচারপতি দীপক গুপ্তা এবং সঞ্জীব খান্না দু’সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত রেকর্ড দিল্লি আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিহার সরকারকে। সুষ্ঠুভাবে যেন মামলা স্থানান্তর করা যায়, সেজন্য রাজ্য সরকারকে সহায়তা করার নির্দেশও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এর আগেই সুপ্রিম কোর্ট বিহারে ১৬টি হোমে এই নির্যাতনের ঘটনায় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই’কে তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। সিবিআই’র প্রাক্তন যুগ্ম অধিকর্তা একে শর্মা ছিলেন এই তদন্তের দায়িত্বে। কিন্তু আচমকাই গত ১৭ জানুয়ারি তাঁকে সিআরপিএফ’এ বদলি করে দেওয়া হয়েছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া কেন এই বদলি? সেই প্রশ্ন তুলেই রাওকে আদালতে দাঁড়িয়ে ব্যাখার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ক্ষুব্ধ শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ মন্তব্য করে, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ নিয়ে খেলা করা হয়েছে। একমাত্র ঈশ্বরই আপনাকে বাঁচাতে পারে।’ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে হাজিরা দিতে হবে নাগেশ্বর রাওকে। পাশাপাশি শর্মার বদলির প্রক্রিয়ায় যে আধিকারিকরা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের নামও আদালতে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিহারে ক’টি হোম, তাদের পরিচালন ব্যবস্থা এবং তাতে সরকারের কী ভূমিকা— রাজ্য সরকারের আইনজীবীর উদ্দেশে প্রশ্ন করে সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু সন্তোষজনক কোনও জবাব না মেলায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতিরা, ‘‘কয়েকটা প্রশ্ন করেছি। যদি উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় থাকেন, তাহলে বলুন। না হলে আমরা আপনাদের মুখ্য সচিবকে ডেকে পাঠাতে বাধ্য হব। আমরা কোনও হলফনামা জমা দিতে বলিনি, যে দু’সপ্তাহ সময় পাবেন। এখন প্রশ্ন করেছি, পরপর নির্দিষ্টভাবে প্রশ্নগুলোর জবাব দিন।’’ মুম্বাইয়ের ‘টাটা ইন্স্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস’ (টিআইএসএস)’র এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বিহারের মুজফ্‌ফরপুরের হোমে শিশুদের উপর মারাত্মক শারীরিক-মানসিক নির্যাতন চলে। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, মারধর— বাদ নেই কিছুই। এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ তদন্তে নামলে ওই হোমেরই এক নাবালিকা অভিযোগ করে, আরেকজন নাবালিকাকে খুন করে তার দেহ পুঁতে রাখা হয়েছে। পরে হোম চত্বর থেকে একটি কঙ্কাল উদ্ধারও হয়ছিল। এই ঘটনায় অভিযোগ ওঠে বিহারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মঞ্জু ভার্মার স্বামীর বিরুদ্ধে। তিনিই হোমে নাবালিকাদের উপর এই নির্যাতনের ঘটনার মূলচক্রী বলে অভিযোগ। পরে ওই মন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। রাজ্য পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও ধৃতদের উল্লেখযোগ্য কোনও শাস্তি হয়নি।

মুজফ্‌ফরপুরের পাশাপাশি বিহারে সব মিলিয়ে ১৭টি হোমে আবাসিকদের সঙ্গে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। সবক’টি হোমই কার্যত সরকার পোষিত। কিন্তু হোমের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সবই শোচনীয়। কোথাও-কোথাও আবাসিকদের সঠিক পরিসংখ্যানও মেলেনি। মানসিক ভারসাম্যহীনদের জন্য তৈরি হোমেও আবাসিকদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।