প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস , টিডিএন বাংলা, কলকাতা : ২০১৬ সালের ১৭ই জানুয়ারী ঘৃণ্য জাত ব্যবস্থার বলি হতে হয়েছিল হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ছাত্র রোহিত ভেমুলাকে। “My birth is my fatal accident. I can never recover from my childhood loneliness. The unappreciated child from my past”. মৃত্যুর আগে রোহিত ভেমুলার এই চিঠির মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে ভারতের সেই ঘৃণ্য ব্যবস্থার কথা যা জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ি ও ভেদভাবের নিগড়ে বাঁধা। রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা এবং তার পরবর্তীকালের ঘটনা প্রবাহ দেশবাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ভারতবর্ষে সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে এই ঘৃণ্য জাতপাতের শিকড় কতটা গভীরে প্রথিত। একটি স্বৈরাচারী এবং ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অনুকূল পরিবেশে এই জাত ব্যবস্থা কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে তার নমুনা আমরা সমগ্র ভারতবর্ষের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি।
রোহিতের ঘটনায় নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে সারা দেশে। মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গেছে। সংসদে পর্যুদস্ত হয়েছে বর্তমান সরকার। ধিক্কার জানিয়ে পত্র লিখেছেন নোয়াম চামস্কি সহ শতাধিক আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবিরা। ধিক্কার এসেছে আমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে। ইউনেস্কোর বিশেষ সভায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম নমুনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে রোহিতের প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। কিন্তু তাতেও শিক্ষা গ্রহণ করেনি বর্তমান ব্রাহ্মন্যবাদী সরকার। নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি জাতপাতের ধ্বজাধারী ভারত বিধ্বংসী শক্তিকে। উল্টে তারা প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা সাজিয়েছে। গ্রেপ্তার করে জেলে পুরে দিয়েছে প্রতিবাদী কবি সাহিত্যিক, বুদ্ধিজিবিদের। মানুষকে সন্ত্রস্ত করতে দাভোলকর, পানসরে, কালবুর্গি এবং গৌরী লঙ্কেশ হত্যা করা হয়েছে। ঘোড়া চড়া বা গোঁফ রাখার অপরাধে দলিত যুবককে যে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে, যে ভাবে আফরাজুলকে কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে এবং জীবন্ত জ্বালিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। কাঠুয়তে ৮ বছরের শিশু আসিফাকে ধর্ষণ, উন্নাওএর দলিত যুবতীর গ্যাংরেপ ভারত সরকারের বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও প্রকল্পকে প্রহসনে পরিণত করে দিয়েছে। আকলাখ, নাজিব, জুনায়েদ, মধুর হত্যা যে ভয়ঙ্কর বাতাবরণের সৃষ্টি করেছে তা স্বৈরাচার ছাড়া কিছু নয়। এইরকম পরিবেশে একদল দেশদ্রোহী ভারতের সংবিধান জ্বালিয়ে প্রমান করে দিয়েছে যে ভারত দুষ্কৃতির দ্বারা আক্রান্ত এবং নৈরাজ্যের কবলে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষকে বেনাগরিক করে দেবার জন্য এরা এনআরসি এনে মানবতা ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠেছে। আর্থিক ভাবে এগিয়ে থাকা মানুষকে ১০% সংরক্ষণ দিয়ে এরা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকেই ধ্বংস করে দিতে চাইছে।

আশার কথা যে, দুষ্কৃতিদের এই নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ভারতের ছাত্র-যুব সমাজ এবং প্রগতিশীল মানুষেরা। রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার বিরুদ্ধে সমগ্র জাতি যে ভাবে গর্জে উঠেছিল তার থেকে জন্ম নিয়েছে নিও-পেশওয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক নতুন দিশা। এই সম্মিলিত লড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষেতখামারে, কলে কারখানায় এবং শোষণের সমস্ত স্তরে। ভীমা কোরেগাও, সাহারনপুর, তুতিকোড়ি, গড়চিরৌলি, কোভাদিয়ার আন্দোলন ব্রাহ্মন্যবাদী নিও-পেশওয়াদের বিরুদ্ধে বজ্রকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এই শক্ত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রোহিত ভেমুলা হয়ে উঠেছে “জনগণতান্ত্রিক আন্দোলনের” প্রতীক। ব্রাহ্মন্যবাদী নিও-পেশওয়াদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ এবং রোহিত ভেমুলার হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবীতে জোরাল আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আগামী ২০শে জানুয়ারী দুপুর ২টোয় জয় ভীম ইন্ডিয়া নেটওয়ার্ক, প্রকৃতি সেবাশ্রম সংঘ এবং জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি ফর সোশ্যাল জাস্টিস এর পক্ষ থেকে গড়িয়ার অনুকূল চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে “ রোহিত ভেমুলা স্মরণ সভা”র আয়োজন করা হয়েছে।

শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং রোহিত ভেমুলা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতৃবর্গের সমন্বয়ে এই স্মরণ সভাকে সফল করতে সমস্ত প্রগতিশীল এবং আম্বেদকরবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বহুজন নেতা শরদিন্দু উদ্দীপন, মিলন নির্ঝর মৃধা এবং সুশীল মান্ডি । ‘ঘৃণ্য জাত ব্যবস্থার বলি রোহিত ভেমুলা,জাতপাতের উৎস, প্রকার ভেদ এবং তার ব্যপ্তি’ বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। সেই সাথে জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধিকরণআর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়াদের ১০% সংরক্ষণ নিয়েও আলোচনা করবেন বক্তারা। সভায় উপস্থিত থাকবেন অধ্যাপক ডঃ সনৎ কুমার নস্কর, অধ্যাপক সুধাকর সরদার, প্রকৃতি সেবাশ্রম সঙ্ঘের সভাপতি মিলন নির্ঝর মৃধা, বিজ্ঞানী পার্থ সারথি রায়, যাদবপুরের গবেষক ছাত্র সুশীল মান্ডি, জামায়াতে ইসলামী হিন্দের সভাপতি মুহাম্মদ নুরুদ্দীন, চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র ঘোষ দস্তিদার ও সুমিত চৌধুরী, নৃতাত্ত্বিক কাঞ্চন মুখোপাধ্যায়, কবি মোকতার হোসেন মণ্ডল, দলিত সাহিত্যিক দিলীপ গায়েন,অধ্যাপক নুরুল হক, আইনজীবী আনিসুর রহমান, লেখক গোলাম মোর্তুজা , দলিত নেতা পরেশ দেবনাথ প্রমুখ। জয়ভীম নেটওয়ার্কের নেতা শরদিন্দু উদ্দীপন টিডিএন বাংলাকে বলেন,’রোহিত ভেমুলা আমাদের ভাই। তাঁর মৃত্যু আমাদের দেশের ব্রাহ্মণ্যবাদী নেতাদের মুখোশ খুলে দিয়েছে। রোহিতের মৃত্যু আমাদের দেশের দলিত বহুজন আন্দোলনের গতিপথ দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা রোহিতের দেখানো পথেই জাতপাতহীন,সাম্যবাদী ভারত বর্ষকে গড়তে চাই। যাতে আর কোনও আখলাক জুনাইদ, আফরাজুলকে খুন হতে না হয়,নাজিবকে হারিয়ে যেতে না হয়।’