মিজানুর, রহমান, টিডিএন বাংলা: আজ পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের দিন। কিন্তু এবছরে এমন এক সময় শ্রমিক দিবস হচ্ছে যে যখন গোটা পৃথিবী লকডাউন। এই লকডাউনের ফলে কোটি কোটি শ্রমিক কাজ হারিয়ে ঘরে বসে আছে। অনেক শ্রমিক পথেই আছে, অনেক শ্রমিক মজুরি পাননি, অনেক শ্রমিককে তাঁর মালিকেরা ফিরিয়ে দিয়েছে। এরকম অবস্থায় এবারের শ্রমিক দিবস পালিত হচ্ছে। এবার এমন একটা সময় শ্রমিক দিবস হচ্ছে যখন শ্রমিকরা দিকে দিকে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। কিন্তু এবারের শ্রমিক দিবস আর এর আগের শ্রমিক দিবসের যে-ই পার্থক্য থাকুক না কেন শ্রমিকরা যে এবারের শ্রমিকরা যে এখনও তাদের ন্যায্য অধিকার পায়নি, মালিক এবং শ্রমিকের মধ্যে এখনও যে দ্বন্দ্ব আছে তা বিভিন্ন ইস্যুতেই প্রমান পাওয়া যায়।

লকডাউন: দেশজুড়ে ৯৬ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিকই রেশন পাচ্ছেন না, বলছে সমীক্ষা

১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর ১৮৯০ সাল থেকে পহেলা মে বিশ্বব্যাপী ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন হয়ে আসছে। প্রতিবছর অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও দিবসটি পালন করা হতো। কিন্তু এবার যেন মে দিবসে করোনা ভাইরাস ভিলেন। সবকিছুকে টালমাটাল করে দিয়েছে এই অজানা, অচেনা ভাইরাস। সেই সাথে সাথে শ্রমিকদের জীবনেও নেমে এসেছে ঘন কালো অন্ধকার।

লকডাউনে বন্ধ কাজ, নেই খাবার, যমুনা সেতুর নীচে আশ্রয় নিয়েছে শত শত অসহায় পরিযায়ী শ্রমিক

১৮৮৬ সালে পহেলা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেট চত্বরে শ্রমের ন্যায্যমূল্য ও দৈনিক আট ঘণ্টার কাজের দাবিতে ধর্মঘট করেন শ্রমিকরা। এতে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক অংশ নেন। শ্রমিকদের আন্দোলন দমন করতে সেদিন সমাবেশে পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলি চালায়। এতে অনেকে নিহত হন। এছাড়া গ্রেফতার করা হয় অনেককে। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে ছয় শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয় সে সময়কার শাসকগোষ্ঠী। কারাগারে বন্দি অবস্থায় এক শ্রমিক আত্মহত্যাও করেন।

লকডাউনের মেয়াদ বাড়তেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে বিভিন্ন রাজ্যের শ্রমিকদের বিক্ষোভে এ বার উত্তাল মুম্বই

এই আন্দোলনের ফলে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের পথ প্রশস্ত হয়। মালিকরা স্বীকার করে নেয় শ্রমিকদেরও বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। কাজের সময়সীমা কমে নেমে আসে ৮ ঘণ্টায়। এরপর ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শ্রমিকের অধিকার আদায়ে একটি দিবস পালনের জন্য পহেলা মে ‘মে দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালন হয়ে আসছে।

হেঁটেও ফেরা হল না বাড়ি, পথেই লকডাউনের বলি ৫ শিশু সহ ১৭

ভারতে প্রথম শ্রমিক দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে। চেন্নাইয়ে হিন্দুস্থান লেবার কিষাণ পার্টি পালন করে শ্রম দিবস। তারপর থেকে ভারতেও বিভিন্ন ছোট বড় কারখানায় এই দিনটি শ্রম দিবস বা শ্রমিক দিবস হিসাবে পালিত হয়ে আসছে। মে দিবস শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের চরম আত্মত্যাগে ন্যায্য অধিকার আদায়ের এক অবিস্মরণীয় দিন। কিন্তু এবছর করোনা ভাইরাসের আক্রমণে জীবন হারানোর আশঙ্কা, অন্যদিকে উপার্জনহীন অবস্থায় অনাহার-অর্ধাহারে দিনযাপনের দুঃখ, কষ্ট। সব দিক মিলিয়ে দেশের শ্রমজীবী মানুষ আজ এক গুরুতর সংকটের মুখোমুখি। বেশিরভাগ শ্রমিক আজ ভিন রাজ্যে আটকে রয়েছে। তাদের থাকা খাওয়া ঠিকঠাক কোনও ব্যবস্থা নেই। অনেকবার বিরোধীরা তাদেরকে বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করার জন্য মোদী সরকারকে আর্জি জানালেও তাতে কোনও কানই দেয়নি। পরবর্তীতে সম্প্রতি যদি সেই তাদের বাড়ি ফেরানোর জন্য কেন্দ্র সায় দিয়েছে তো কিভাবে ফিরবে? কে ফেরাবে? সবকিছু অজানা।

হয় বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করুক কেন্দ্রীয় সরকার, নইলে তাঁদের পেট ভরানোর ব্যবস্থা করুক, হাজার হাজার শ্রমিকের বিক্ষোভ, পুলিশের লাঠিচার্জ

পহেলা মে ‘শ্রমিক দিবস’ শুধুই খাতা কলমে রয়ে গেছে। শ্রমিকরা আজও বঞ্চিত, অবহেলিত। যোগ্য সম্মান আজও তারা পায়নি। প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষক শুধুমাত্র ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করেন। কিন্তু সরকারের তারপরেও তেমন কোনও হেলদোল নেয়। এদিকে করোনার জেরে কেন্দ্র সরকার বাইরের দেশে আটকে থাকা পড়ুয়া, ব্যবসায়ী, আমলা ও উচ্চশ্রেণীর সবাইকে প্লেনে করে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার সুযোগটুকুও না দিয়ে লকডাউন করা হয়েছে। যখন তারা না খেতে পেয়ে অসহায় অবস্থায় হাজার হাজার কিমি পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন তাদের কপালে জুটেছে সরকারি ডাণ্ডা ও জেল জরিমানা।

খিদের জ্বালায় কুকুরের সঙ্গে দুধ নিয়ে কাড়াকাড়ি মানুষের! তবে কি খাদ্যদাঙ্গার আশঙ্কা?

সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ (সিএসডিএস) এবং আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা রিপোর্টে বলছে, লকডাউনে ভিনরাজ্যে ১০ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক আটকে পড়েছেন? তবে কত শ্রমিক সহায়সম্বলহীন হয়ে লকডাউনে ভিনরাজ্য থেকে নিজের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন? এ নিয়ে সরকারি কোনও তথ্যই মিলবে না। কারণ পরিযায়ী শ্রমিকরা সরকারের চরম উপেক্ষার শিকার।

দেশে লকডাউনের ফলে মারা গেছে ২০০ আর করোনায় মৃত তিন শতাধিক

অন্যদিকে, ‘দ্য হিন্দু’ সংবাদমাধ্যমের করা এক সমীক্ষায় দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিকদের আর্থিক সঞ্চয়ের বেহাল দশাও ফুটে উঠেছে। ওই সমীক্ষার সময় দেশ জুড়ে ১১ হাজারের বেশি পরিযায়ী শ্রমিকদের ৭০ শতাংশই জানিয়েছেন, তাঁদের হাতে ২০০-রও কম টাকা রয়েছে, যাতে হয়তো দিন দুয়েক কাটানো যেতে পারে। লকডাউনের মাঝে দেশ জুড়ে মোট ১১ হাজার ১৫৯ জন পরিযায়ী শ্রমিকের উপর করা একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ওই শ্রমিকদের ৯৬ শতাংশই ৮ থেকে ১৩ এপ্রিল— এই পাঁচ দিন সরকারের কাছ থেকে কোনও রেশন পাননি। ২৫ মার্চ দেশ জুড়ে লকডাউন শুরু হওয়ার পর ওই শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের বেশি মজুরি পাননি মালিকপক্ষের কাছ থেকে। ফলে ২৭ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ৭০ শতাংশের হাতে ছিল মাত্র ২০০ টাকা, সেটাই একমাত্র ভরসা।

লকডাউনের জের, দেশে ১০ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্যে আটকে: রিপোর্ট

লকডাউনের মধ্যেই এপ্রিলের মাঝামাঝিতে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমির রিপোর্ট জানিয়েছে, দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ২৬.১%। লকডাউনে সরাসরি কর্মচ্যুত সাড়ে ৭ কোটি মানুষ। আরও সাড়ে ৮ কোটি কাজের খোঁজে হন্যে। এই পরিসংখ্যান আর নিত্য-অভিজ্ঞতাকে তুড়ি মেরেই রাজস্থান, গুজরাট, পাঞ্জাব এবং হিমাচল প্রদেশ সরকার ১১-২১ এপ্রিলের মধ্যে ‘শ্রমিক কম পরিয়াছে’র ধুয়ো তুলে ১৯৪৮-এর ফ্যাক্টরিজ অ্যাক্টই বদলে ফেলেছে। দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টার শ্রম-সময় বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা করেছে! শিল্পমহলের আর্জিতে এই মর্মে শ্রম-আইনে স্থায়ী সংশোধন ঘটিয়ে অর্ডিন্যান্সের ভাবনা রয়েছে কেন্দ্রেরও।

লকডাউনে বন্ধ কাজ, দিল্লীতে অনাহারে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু বাংলার যুবকের

প্রতি বছরই পহেলা মে আসবে। শ্রমিক দিবস পালিত হবে কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থার কোনও পরিবর্তন হবে না। যোগ্য সম্মান পাওয়ার আশায় শ্রমিকরা তাকিয়ে থাকবে। তাদের কাছে শ্রমিক দিবস টা আনন্দের চাইতে আরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠবে। যদিও হজরত মোহাম্মদ বলেছেন শ্রমিকদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে, তাদেরকেও যোগ্য সম্মান দিতে। তাঁর কথায়, “তোমরা শ্রমিকদের গায়ের ঘাম শোকানোর আগেই তাদের মুজুরি পরিশোধ করে দাও।”

অভিবাসী শ্রমিকদের উপরে জীবাণুনাশক স্প্রে, সরব প্রিয়ঙ্কা