টিডিএন বাংলা ডেস্ক: আসামে প্রকৃত ভারতীয়দের ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করে নির্যাতন চালাচ্ছে রাজ্যের বিজেপি সরকার। এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইল রাষ্ট্রসংঘ। গত ২৭ মে রাষ্ট্রসঙ্ঘের আরবিটারি ডিটেনশন সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের স্বাক্ষর করা চিঠি ভারত সরকারের কাছে এসেছে। চিঠিতে মূলত ডিটেনশন ক্যাম্পে প্রকৃত ভারতীয়দের বন্দি করে নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে তা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে জবাবদিহি চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়েছে, যে নাগরিক পঞ্জি নবায়ন (এনআরসি) উন্নীতকরণের নামে মানবাধীকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। রাজ্যের ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘু মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যদিও ডিটেনশন ক্যাম্পে নির্যাতনের ঘটনা এবং এনআরসি নামে সংখ্যালঘুদের হয়রানি করার বিষয়টি উল্লেখ করে গত বছরের ১১ জুন ও ১৩ ডিসেম্বর ভারত সরকারের কাছে দুবার চিঠি পাঠিয়েছিল রাষ্ট্রসংঘ। কিন্তু দুটি চিঠিরই কোনো জবাব দেয়নি কেন্দ্র সরকার। এবার ফের আরও একটি চিঠি এসেছে রাষ্ট্রসংঘ থেকে।

গত ২৮ জুন রাতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন তথা বর্তমানে অসম পুলিশের এএসআই মোহাম্মদ সানাউল্লাহকে বিদেশি তকমা সেঁটে জেলে পাঠায় রাজ্যে বিজেপি সরকার। এ ঘটনায় গোটা দেশে ঝড় ওঠে। দেশের বাইরেও খবরটি প্রচারিত হয়। খবরটি রাষ্ট্রসঙ্ঘের নজরেও আসে। পুলিশের কারসাজি ও ট্রাইব্যুনালের ত্রুটির জন্য সানাউল্লাহকে জেলে পাঠানোর ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় সেনাবাহিনীর মধ্যেও। সানাউল্লাহ বিদেশি নন, বলে সেনাবাহিনীর তরফে অসম সরকারকে চিঠি পাঠানো হয়। এরপরই টনক নড়ে সর্বানন্দ সোনোয়াল সরকারের। বিষয়টি জানতে সীমান্ত পুলিশের কাছে রিপোর্ট তলব করে সরকার। তখনই বেড়িয়ে আসে আসল ঘটনা। দেখা যায় পুলিশ সানাউল্লাহর যে লিখিত জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে সানাউল্লাহ দিনমজুর। তাছাড়া জবানবন্দিতে সানাউল্লাহ্’র টিপসই রয়েছে। অথচ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ সানাউল্লাহ কেনই বা টিপসই দিতে যাবেন? কোন উদ্দেশ্যে একজন সেনা অফিসারকে দিনমজুর লিখল পুলিশ? এসব প্রশ্ন সামনে আসতেই,সানাউল্লাহকে যিনি বিদেশী বলে ট্রাইব্যুনালে রিপোর্ট দিয়েছেন, সেই তদন্তকারী পুলিশ আধিকারিক চন্দ্রদাস দাসকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,কামরুপ জেলার আর এক সানাউল্লাহর নামে তিনি রিপোর্ট দিয়েছেন। ভুলবশত পুলিশ অন্য জনকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু একথা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? কারণ একই নামে দুইজন ব্যক্তি থাকলেও বাবার নাম, স্ত্রীর নাম, সন্তানের সংখ্যা সব একই রকম হওয়ার কথা নয়। এছাড়া ট্রাইবুনালও কোনো কিছু যাচাই না করে কিভাবে একজন সেনা আধিকারিককে বিদেশি ঘোষণা করল! এর পেছনে যে ক্ষমতাসীন দলের হাত রয়েছে, সে সন্দেহ জোরালো হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে চারিদিকে।

মুহাম্মদ সানাউল্লাহ সেনা আধিকারিক হওয়ায় তার বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় হওয়ার পর দেখা যায়, মিথ্যা রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে অসংখ্য ভারতীয়কে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে একজন হলেন চিরাং জেলার মধুমালা (৬০)। মধুবালা তিন বছর ধরে কোকরাঝাড় ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি। তার নাম ১৯৭০ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে এছাড়া তার বাবার নামে ১৯৬০ সালের জমির দলিল রয়েছে। ভারতীয় হওয়ার পরেও তিনি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী কেন? বিষয়টি খোঁজ নিতে গিয়ে ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ বেরিয়ে আসে। দেখা যায় ২০১৬ সালে চিরাং জেলার মধুমালা নামে একজন মহিলাকে বিদেশি ঘোষণা করে ট্রাইবুনাল। ওই মহিলার স্বামীর নাম মাখন দাস। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে মধুবালা দাসকে গ্রেফতার করে আনতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে ওই মহিলা ও তার স্বামী মারা গিয়েছেন। এর পরেই ফেরার পথে পুলিশ মধুমালা মন্ডলকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। গ্রেফতার হওয়া মধুবালা বিধবা। একমাত্র মেয়ে ফুলমালাকে নিয়ে তার সংসার। অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে সংসার চলে তার। গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভারতীয় হিসেবে প্রমাণ পত্র ট্রাইব্যুনালে জমা দেন তিনি। কিন্তু ট্রাইবুনাল তাকে জেলে ফেরার নির্দেশ দেয়। অথচ ট্রাইবুনাল যাকে বিদেশী বলে রায় দিয়েছে তার নাম মধুমালা দাস আর যিনি জেল খাটছেন তার নাম মধুমালা মন্ডল। নাম ও পদবী তার বিস্তর ফারাক থাকলেও ট্রাইবুনাল ও পুলিশের ত্রুটির জন্য প্রকৃত ভারতীয় আজ জেলে! শুধু মধুমালাই নন, এভাবে প্রকৃত ভারতীয় হয়েও জেলবন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছে অকশীগুড়ি গ্রামের রবীন্দ্র বিশ্বাস (৫০), অগ্রং গ্রামের সাধনা সরকার (৮০), সোনাইপুরি গ্রামের গোপাল মন্ডল (৫৫)। ভারতীয় হিসাবে এদের প্রত্যেকের কাছেই প্রমানপত্র রয়েছে। এগুলি ট্রাইব্যুনালে জমা দিলেও কাজ হয়নি। এর থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, আসলে সংখ্যালঘুদের হয়রান করতেই সরকারি নির্দেশে খেয়ালখুশি মতো যার তার নামে বিদেশি তকমা সেঁটে ট্রাইব্যুনালে রিপোর্ট জমা দিচ্ছে পুলিশ। তারপর ট্রাইবুনাল বিবাদী ব্যক্তির নথি যাচাই না করে বিদেশী ঘোষণা দিচ্ছে। বিদেশী তকমা প্রাপ্তদের বেশিরভাগই নিরক্ষর ও গরিব। ফলে আইনি লড়াইয়ে ভয় পাচ্ছেন তারা। এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে পুলিশ-ট্রাইবুনাল। একজনের নামে বিদেশি ঘোষণা করছে আর একজনকে জেলা পুরছে! এভাবেই একেকজন মানুষের জীবন শেষ করে দিচ্ছে বিজেপি সরকার। সেনা আধিকারিক সানাউল্লাহকে জেলে পাঠানোর বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হওয়ায় বাকিদের ঘটনাও সামনে এসেছে। আপাতত ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সানাউল্লাহ ও অনান্যরা হাইকোর্টে আপিল করেছেন। সম্ভবত ৭ জুন হাইকোর্টে শুনানি শুরু হবে।

এদিকে,এনআরসি’র নামেও চলছে নির্যাতন। যার তার নামে আপত্তি দাখিল করেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও উগ্র আঞ্চলিকতাবাদী সংগঠনের কর্মকর্তারা। ফলে তাদের শুনানিতে হাজির হতে হচ্ছে। কিন্তু শুনানির দিন গরহাজির থাকছেন খোদ আপত্তিকারীরাই। যে ৪০ লক্ষাধিক নাম খসড়া থেকে বাদ পড়েছে, তার পুনরায় আবেদন করলেও আসাম সরকার তাদের বায়োমেটিক করছে। এজন্য দূর-দূরান্তের সেবা কেন্দ্রে তাদের যেতে হচ্ছে। রাত অবধি চলছে এই কাজ। কো-অর্ডিনেটর প্রতীক হাজেলা বলেছেন, যাদের নাম খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাদের মধ্যে অনেকের নথী ভুয়ো। ফলে আরও অনেকের নাম বাদ পড়বে। বাদ পড়াদের তালিকা আগামী ১৫ ই জুন প্রকাশ করা হবে। বারকয়েক নথী যাচাই শেষে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরেও আবার ভুল ধরা পড়ে কিভাবে? নাকি প্রকৃত ভারতীয়দের নাম বাদ দেওয়ার জন্য এও এক চক্রান্ত। কারণ কেন্দ্রে মোদি সরকার জানিয়েছে, তারা অসমে আরও ১০০০ ট্রাইবুনাল খুলবে। আগামী মাসের বাজেটে এজন্য অর্থ বরাদ্দ করা হবে, বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন। এতেই পরিষ্কার হয়ে যায়, এনআরসি থেকে বিরাট সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরপর তাদের ট্রাইবুনালে দৌড়-ঝাঁপ করতে হবে। টাকার অভাবে যদি তারা ট্রাইব্যুনালে দৌড়াতে না পারেন বা উচ্চ আদালতে আপিল করতে না পারেন তাহলে তাদের বাকি জীবন ডিটেনশন ক্যাম্পেই কাটাতে হবে।

এদিকে গোয়ালপাড়ায় বিরাট ডিটেনশন ক্যাম্পের কাজও প্রায় শেষের পথে। এককথায় বিজেপি সরকারের আমলে অসমের সংখ্যালঘুদের জীবনে দূর্যোগের ঘনঘটা নেমে এসেছে। সূত্র: গণশক্তি