টিডিএন বাংলা ডেস্ক: তিনি যে দলের বাইরে থাকার খেলোয়াড় নন তা বিশ্বকাপ সেমি-ফাইনালে প্রমাণ করে দেখিয়ে দিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন‍্যতম ক্রিকেটার রবীন্দ্র জাদেজা। তিনি বিশ্বকাপের স্কোয়াডে থাকলেও কিন্তু জায়গা হচ্ছিলো না দলে। এমন একজন অলরাউন্ডারকে বসিয়ে রাখছে ভারত যার ব্যাট সেমিফাইনালে ভারতকে ম্যাচে রেখেছিলো। ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মাঞ্জরেকারের মতো মানুষ যাকে ছোটখাটো খেলোয়াড় বলে অপমান করেছে। সেই রবীন্দ্র জাদেজা সেমিতে খেললেন অনবদ্য। রোহিত, কোহলি, কার্তিকদের ব্যাট যেখানে খাবি খেলো সেখানে এই তরুণ জাদেজা খেললো সময়পযোগী ইনিংস খেললেন।

জিমি নিশামের বলে দ্রুত দুই রান পূর্ণ করেই ব্যাট হাতে নিয়ে তলোয়ারের মতো করে ঘুরাতে শুরু করলেন। ফিফটি বা সেঞ্চুরি করলে এটি রবীন্দ্র জাদেজার ট্রেডমার্ক উদ্‌যাপন। কিন্তু আজকেরটি যেন নিছক এক উদ্‌যাপনের চেয়েও বেশি কিছু। পরোক্ষে কাউকে যেন একটা জবাব দিতে চাচ্ছিলেন। বোঝাতে চাচ্ছিলেন দলে নিজের কার্যকারিতা।

জবাবটা কার উদ্দেশ্যে, গত কিছুদিনের খবরাখবর অনুসরণ করে থাকলে আন্দাজ করতে একদমই কষ্ট হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের বিপক্ষে জাদেজাকে খেলানো উচিত ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় ধারাভাষ্যকার সঞ্জয় মাঞ্জরেকার বলেছিলেন, ‘আমি বিটস অ্যান্ড পিসেস (যারা সব কাজই টুকরো টুকরোভাবে করতে পারেন, কিন্তু কোনো কাজেই বিশেষজ্ঞ নয়) খেলোয়াড়দের খুব একটা ভক্ত নই। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এ মুহূর্তে জাদেজা ঠিক এ অবস্থাতেই আছে। সে টেস্ট খেলে শুধুমাত্র বোলার হিসেবে। ওয়ানডেতে আমি এমন খেলোয়াড় চাই, যে ব্যাটিংটা জানে, সঙ্গে বোলিংটাও।’

পাল্টা টুইট করে জাদেজা নিজের ক্ষোভ জানিয়েছিলেন বটে, তবে ক্রিকেটারের জবাব কী আর মুখে হয়! আজ ব্যাট হাতেই যোগ্য জবাবটা দিয়ে দিলেন তিনি। বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে কী দুর্দান্ত ব্যাটিংটাই না করলেন! ২৪০ রানের লক্ষ্যে নেমে ৯২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ভারত তখন রীতিমতো কাঁপছে। ওভারও পার হয়ে গেছে ৩০ টি। নিউজিল্যান্ড তখন ফাইনালের সুবাস পাচ্ছে বেশ ভালোভাবেই। সেখান থেকে কী অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ম্যাচটা প্রায় ঘুরিয়েই দিয়েছিলেন! শেষ পর্যন্ত যদিও তিনি পরাজিতে দলে, কিন্তু এমন ইনিংসের পর জাদেজার একটা বড়সড় স্যালুট প্রাপ্যই।

শুরু থেকেই ব্যাটিংয়ে ছিলেন আক্রমণাত্মক। ষষ্ঠ বলেই নিশামকে ছয় মেরে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, আজ দিনটা হতে চলেছে তাঁর। ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে গ্যালারি, সব জায়গাই তখন ভারতীয়দের মলিন মুখ। অসাধারণ ব্যাটিংয়ে জাদেজা হাসি আনলেন সবার মুখে, ম্যানচেস্টারের ঝিমিয়ে পড়া গ্যালারিতে আনলেন প্রাণ। জাদেজা একটি করে বাউন্ডারি মারছিলেন, আর ড্রেসিংরুমে রোহিত শর্মার উল্লসিত মুখই বলে দিচ্ছিল, নতুন করে আশার সঞ্চার করেছেন জাদেজা।

এক পাশে ধোনি ছিলেন বটে, কিন্তু জাদেজার সাহসী ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিংয়েই ম্যাচের চাকা ঘুরেছে ভারতের দিকে। যে পিচে রান তুলতে হিমশিম খেয়েছেন রোহিত-কোহলিরা, সেই একই পিচে কী অবলীলায় খেলে গেলেন তিনি। ঝুঁকি না নিয়েও কীভাবে দ্রুত রান তোলা যায়, সেটির চমৎকার প্রদর্শনী করলেন জাদেজা। বাঁ হাতি স্পিনার মিচেল স্যান্টনারকে এগিয়ে এসে যেভাবে দুটি ছয় মারলেন, তা এক কথায় অনন্য।

ধোনি সাহস আর বুদ্ধি জুগিয়ে গেছেন, আর রান তোলার কাজটি করেছেন জাদেজা। ইনিংসের শুরুর দিকে যে কিউই বোলারদের অপ্রতিরোধ্য মনে হচ্ছিল, তাদের সামলেই মাত্র ৩৮ বলে তুলে নিয়েছেন এ বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ফিফটি। ফিফটির পরেও থামেননি, চালিয়ে গেছেন একই তালে। যে ম্যাচটাকে ভারতের জন্য জেতা অসম্ভব মনে হচ্ছিল, আউট হওয়ার আগে সেটিকেই এনে দিয়ে গেছেন হাতের নাগালে। সপ্তম উইকেটে ধোনির সঙ্গে মিলে মাত্র ১০৫ বলে যোগ করেছেন ১১৬ রান। শেষ পর্যন্ত ৪৮তম ওভারে ট্রেন্ট বোল্টের বলে যখন ফিরছেন, জাদেজার নামের পাশে তখন জ্বলজ্বল করছে ৫৯ বলে ৭৭ রানের ঝকঝকে এক ইনিংস। চার মেরেছেন ৪টি, ছক্কাও সমান ৪টি। কঠিন পরিস্থিতিতেও মনোবল ও আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে কীভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়, সেটাই যেন দেখালেন জাদেজা।

শুধু ব্যাট হাতে নয়, জাদেজা উজ্জ্বল ছিলেন পুরো ম্যাচেই। বোলিংয়ে ছিলেন দলের সবচেয়ে কিপটে বোলার। পুরো ১০ ওভার বল করে মাত্র ৩৪ রান খরচায় নিয়েছিলেন হেনরি নিকোলসের উইকেটটি। এরপর দুর্দান্ত এক থ্রোতে রান আউট করেছেন রস টেলরকে। উইলিয়ামসন ও ল্যাথামের ক্যাচ দুটিও নিয়েছেন। সব করেও জাদেজা যেন এ ম্যাচের ট্র্যাজিক হিরো!

ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত জেতাতে পারেননি, ভারতকেও তুলতে পারেননি ফাইনালে। কিন্তু তাতেও রবীন্দ্র জাদেজার ইনিংসের মাহাত্ম্য কমছে না এতটুকু। ইনিংসের অর্ধেক পর্যন্তও যে ম্যাচটিকে একতরফা বলে মনে হচ্ছিল, সেটিতে এমন টানটান উত্তেজনা এনে দিয়েছে তো জাদেজার ইনিংসটাই!

ম্যাচ শেষে বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার হর্ষ ভোগলের টুইট, ‘জয়ী দলের কাউকে ম্যাচ সেরা করাই রীতি। ম্যাট হেনরি দুর্দান্ত ছিলেন আজ। কিন্তু ম্যাচের সেরা পারফরম্যান্সটা এসেছে জাদেজার কাছ থেকেই। আমার ম্যাচসেরা তাই জাদেজাই।’

কেবল ভোগলেই নয়, জাদেজাই যে আজ ম্যাচের সেরা এটি মেনে নেবেন প্রায় সবাই-ই।