নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, জঙ্গিপুর : আঠারো পেরোনোর আগে মেয়েদের বিয়ে না দেওয়ার পক্ষে অনেক প্রচার হলেও গরিব দেশে সেসবের তোয়াক্কা করে কজন? ষোল বছরের সাফিনা ও নারিফার বিয়ে আটকাতে বাড়িতে গিয়ে হাজির নূর জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসা মীনা দল। প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে বছর চারেক আগে এই মাদ্রাসায় মীনা নামে মঞ্চ করেই একজোট হয়েছে ছাত্রীরা৷ তখন থেকেই এই মঞ্চ এলাকায় জনপ্রিয়৷ এলাকার মেয়েরা স্কুলছুটদের ফিরিয়ে আনা, এলাকার সমস্যা ও কুসংস্কার দূর করা, এমন প্রচুর কাজের পাশাপাশি এখন মীনা মঞ্চের ছাত্রীরা বাল্যবিবাহ রুখে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে ফারাক্কার প্রত্যন্ত নদী ভাঙ্গন প্রবণ গ্রাম মহেশপুরে।

মহেশতলার বটতলার নারিফা ও সাফিনা নামে ফুলের মত পবিত্র দুই সিক্সটিন এর বিয়ে ঠিক হয়। দুই পাত্র মমরেজপুরের বিশ বছর বালক হাজিকুল ও জয়রাম পুরের মাহফুজ। শুক্রবার রাতেই তাদের বিয়ে হবার কথা ছিল। তার আগেই সব জল্পনায় জল।

শিক্ষক মেহবুব আলম বলেন, বাল্য বিবাহ আইনত অপরাধ। আপনারা এ বিয়ে বন্ধ করুন। মেয়েদের মাদ্রাসায় পাঠান। তারা আমাদের সন্তানের মত। কি ভাবে বাল্যবিবাহ রুখে দেওয়া যায় তা মীনাদের ট্রেনিং দেওয়া আছে।

নারিফার মা জুলেখা বিবি বলেন, আমার পাঁচ মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তা হয়। তাদের সুপাত্রস্থ করতে পারলে শান্তি। ভালো ছেলে পেয়ে বিয়েতে রাজি হয়ে গেছিলাম। গত রাতেই মেয়ের বিয়ে হত। শাড়ি জামা কাপড় সব কেনা হয়ে গেছে। শিক্ষকদের দেখে লজ্জাও পাচ্ছি। তবে মেয়ের বিয়ে এখন বাধা হয়ে দাঁড়াল।

সাফিনার মা হাসিনা বিবি বলেন, গ্রামে অনেক লোক আছে যারা বিয়ে ভাঙার কাজ করে? কিভাবে জেনে যাচ্ছে বিয়ের দিনক্ষণ? তবে আজ শিক্ষা হলো আঠারোর আগে আর বিয়ে ঠিক করবো না। মেয়ে এখন মাদ্রাসায় পড়ুক।

মীনা মঞ্চের এক ছাত্রীর কথায়, ‘‘বাবা-মায়েরা মেয়েদের বোঝা ভাবেন৷ তাই তাড়াতাড়ি মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিতে পারলেই খুশি হন৷” মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জানে আলম ছাত্রীর সঙ্গে একমত৷ তিনি বলেন, ‘‘বাল্যবিবাহ আটকাতে বহু ক্ষেত্রে বাবা-মা কে ডেকে জিজ্ঞেস করি, এত অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন কেন? একবার এক ছাত্রীর মা উত্তর দিয়েছিলেন, মেয়ে বড় হচ্ছে, একি পোষার জিনিষ? হাতি পোষা যায় কিন্তু মেয়ে পোষা যায়না। দিন আনি দিন খায়। ভালো পাত্র পাওয়াও কষ্টকর৷ একটা ভালো পাত্র হাতছাড়া হলে আবার কতদিন অপেক্ষা করতে হবে!

তিনি বলেন, তবে আমরা নারিফা ও সাফিনার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে মীনা মঞ্চ সঙ্গে নিয়ে ওদের বাড়ি যাই৷ বোঝাই, মাদ্রাসায় এখন মিড ডে মিল, ইউনিফর্ম দেওয়া হচ্ছে, স্কলারশিপ ও কন্যাশ্রী রয়েছে৷ আঠারোর পরে বিয়ে করলে রূপশ্রীও রয়েছে৷ তাছাড়া অল্প বয়সে বিয়ে দিলে শারীরিকভাবে সমস্যায় পড়তে হয়৷ তিনি বাল্যবিবাহ কু ফল সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, আঠারো বছর অপেক্ষা করলে মেয়ে প্রতি বছর এক হাজার করে এবং আঠারো বছর পরে ২৫ হাজার টাকা কন্যা শ্রী থেকে পাবে আর রূপশ্রী ২৫ হাজার মোট ৫০ হাজার টাকা পাবে তাতে ধুমধাম করে মেয়ের বিয়েতে খরচ করতে পারবেন। তিনি আরো বলেন মিনা থেকে আমার কাছে খবর এলো যে দুটি বাল্যবিবাহ হচ্ছে। আমি তাদের সাথে সভা করে সিদ্ধান্ত নিই, থানা পুলিশ হবার আগেই আমরা ছুটে এলাম যাতে বিয়ের সময় আপনার অপমান না হন।

মাদ্রাসার মীনা মঞ্চের এই সাফল্যে ফারাক্কা আইসি উদয় শংকর ঘোষ খুশি হয়ে মঞ্চ কে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং আগামীতে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। নারিফা ও সাফিনা বলেছে আমরা বুঝতে পারেনি যে বড় ভুল পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিলাম। প্রধান শিক্ষক অফিসে ডেকে বোঝালেন তাই আমরা বাড়িতে মাকে জানাই আরও পড়তে চাই, আঠারো ছাড়া বিয়েই নয়।