টিডিএন বাংলা ডেস্ক : মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দলের বার্ষিক সভায় বি জে পি-র বিরুদ্ধে যা যা অভিযোগ করেছেন, তার সবকটিই তাঁর বিরুদ্ধেও প্রযোজ্য বলে মন্তব্য করলেন সি পি আই (এম)’র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। শুক্রবার তিনি বলেছেন, তফাৎ একটাই। ওরা কেন্দ্রে তিন বছর ধরে করছে, আর উনি এখানে গত ছয় বছর ধরে একই কাজ করছেন। মিশ্র এদিন কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী আজকের ভাষণে রাজ্যের আসল সমস্যাগুলিকেই এড়িয়ে গিয়েছেন। রাজ্যের অর্থনীতির যে বেহাল অবস্থা, শিল্পের যে সঙ্কট, কৃষিতে যে খুবই খারাপ অবস্থা, কর্মসংস্থান যে হচ্ছে না, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের যে অবনতি, সেসব নিয়ে কোনও কথাই তিনি বলেননি। পাহাড়, বসিরহাট ও রায়গঞ্জের ঘটনা, এস এস সি-র টেটে দুর্নীতি, কৃষক আত্মহত্যা, অনাহারে মৃত্যু নিয়ে কোনো কথা নেই। এমন কী সারদা-নারদাকাণ্ড থেকেও উনি হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন।
এদিন তৃণমূলের একুশে জুলাইয়ের সমাবেশে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সূর্য মিশ্র বলেন, উনি এদিন বলেছেন যে, গোটা দেশে অঘোষিত জরুরী অবস্থা চলছে। উনি ঠিকই বলেছেন। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আরও যা যা অভিযোগ করেছেন, সঠিক অভিযোগ। তবে এরাজ্যে উনি যে গত ছয় বছর ধরে এর পথপ্রদর্শক, সেকথা উনি বলেননি। কীভাবে বিরোধীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা জারি করতে হয়, বিরোধীদের মিথ্যা মামলার ভয় দেখাতে হয়, তা উনি এরাজ্যে দেখিয়েছেন। মিশ্র বলেন, ‘‘এই তো আমাদের বিরুদ্ধে নবান্ন অভিযান, কলেজ স্ট্রিটের মিছিলে থাকার জন্য মামলার নোটিশ দিতে এসেছিল। আমরা বললাম, নোটিশ দিন, দরকার হলে থানায় যাবো। গোটা রাজ্যে আমাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে এরকম লক্ষাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এখন কেন্দ্রের বি জে পি সরকারও একই কাজ করছে।’’ সূর্য মিশ্র বলেন, বিরোধীদের উপর হামলা-আক্রমণ, বিরোধী দলের পার্টি অফিস দখল, গণসংগঠনের অফিস দখল-হামলা-ভাঙচুর-আগুন লাগানো গত ছয় বছর ধরে ওঁর দল করে দেখিয়েছে।
মিশ্র এদিন বলেন, উনি আজ বলেছেন যে, সংবাদমাধ্যমের উপর বি জে পি সরকার চাপ সৃষ্টি করছে। গত ছয় বছরে তৃণমূল সরকারও একই কাজ করছে। একটি অন্যতম বড় সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাংবাদিকদের উপর ক্রমাগত আক্রমণ হচ্ছে। বিধাননগর পৌর নির্বাচনের দিন অনেক সাংবাদিক এক সঙ্গে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেকথা সকলেরই মনে আছে। নবান্ন অভিযানের দিনও অসংখ্য সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, এদিন ভাঙড়ের কাশীপুর গ্রামের বাসিন্দা সুখেন কর্মকার নামে ২৮ বছর বয়সী এক যুবক একুশে জুলাইয়ের মঞ্চের পিছনে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। মিশ্র এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, পুলিশ তাঁকে আহত অবস্থায় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুপুর আড়াইটে নাগাদ এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ এখন ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওই যুবকের পরিবারও সঙ্গে ছিল। কিন্ত আজ কোনও সংবাদমাধ্যমে এটা দেখায়নি। মিশ্র বলেন, এখন কোন সংবাদমাধ্যমের সাহস আছে ওঁর বিরুদ্ধে লিখবে? মুখ্যমন্ত্রীর ইশারাই যথেষ্ট।
মিশ্র দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী সঠিকভাবেই বি জে পি যে দুর্নীতিতে রেকর্ড করেছে, তা বলেছেন। কিন্তু ওঁর দল কম যায় কীসে! সারদা-নারদা, আরও কত দুর্নীতির ঘটনা। সি বি আই, ই ডি-ও তেমন, মাঝে মাঝে এদের ডাকে, কেউ কেউ চিঠি দেন যাবে না বলে। দু’ একজন গ্রেপ্তারও হয়েছেন, জেলের বদলে হাসপাতালে থেকেছেন, আবার ফিরে এসে ওঁর দলের নেতা হিসেবে কাজ করছেন। সারদা-নারদায় অভিযুক্তরাই তো আজ মঞ্চের শোভাবর্ধন করছিলেন, কেউ কেউ বক্তব্যও রেখেছেন। মিশ্র বলেন, মুখ্যমন্ত্রী এদিন এইসব দুর্নীতি থেকে হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করেছেন। নারদা নিয়ে বলেছেন, ওরা নাকি টাকা নিতে চায়নি, ইন্টারভিউ নিতে এসেছিল, টাকা দিয়েছে। সব ছেলেমানুষ আর কী! মানহানির মামলা করবেন বলেছেন! সূর্য মিশ্র বলেন, ‘‘আমাদের প্রশ্ন হলো, চিট ফান্ডের যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠ হয়েছে, সেগুলো ফেরতের কী হলো? মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, দেড়-দু’হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সব চিট ফান্ডের মিলিয়ে টাকা লুঠের হিসেব ৩৬-৩৮ হাজার কোটি টাকার কম না। আমাদের দাবি, সব আমানতকারীকে লুঠ হওয়া টাকা ফেরত দিতে হবে।’’ মিশ্র বলেন, এদিন মুখ্যমন্ত্রী গোটা দেশে ১২ হাজার কৃষকের আত্মহত্যার কথা বলেছেন, অথচ এরাজ্যে তো উনি একজন কৃষকের আত্মহত্যার কথাও স্বীকার করছেন না। অথচ ফসলের দাম না পেয়ে অনেক কৃষক আত্মহত্যা করেছেন এরাজ্যে। কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মানুষ কাজ হারাচ্ছেন, শিল্পে শ্মশান হয়ে যাচ্ছে। গোয়েবলস-এর থিয়োরি অনুসারে উনি একই মিথ্যা কথা বারবার বলে যাচ্ছেন।
সূর্য মিশ্র এদিন বলেন, এদিনের সভায় উনি যা যা বলেছেন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে, সবই ওঁর বিরুদ্ধে প্রযোজ্য। তফাৎ একটাই, ওরা তিন বছর আর উনি ছয় বছর ধরে ক্ষমতায়। তা না হলে কেন্দ্রে ও রাজ্যে যে দুটো দল সরকারে আছে, তারা চরিত্রগতভাবে একই ধরনের শক্তি। কেন্দ্রের দলটি সর্বভারতীয়, আর এরা একটি আঞ্চলিক দল। কেন্দ্রের দলের পিছনে একটি ফ্যাসিবাদমূলক শক্তি রয়েছে। মিশ্র বলেন, আসলে জ্যোতিবাবু যে কথা বলতেন, ‘তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অপরাধ, ওরা পশ্চিমবাংলায় বি জে পি-কে ডেকে এনেছে’, মুখ্যমন্ত্রী এই সত্য ভুলিয়ে দিতে চাইছেন। উনি যে গুজরাট দাঙ্গার পর বিধানসভা নির্বাচনে মোদী জয়ী হলে ফুল পাঠিয়েছিলেন, উনি যে বি জে পি-র সঙ্গে কেন্দ্রে দু’বার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন, সেকথা মানুষকে ভোলাতে চান। মিশ্র বলেন, মুখ্যমন্ত্রী এখন এটা বুঝেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বি জে পি-র বিরোধিতা না করলে ওঁর পায়ের তলায় মাটি থাকবে না। এতদিন উনি অন্য দলের জনপ্রতিনিধি শিকার করছিলেন, এখন ওঁর থেকে টাকার ক্ষমতা বেশি এমন শিকারী এসে গেছে, টাকা দিয়ে দল ভাঙাতে যারা ওস্তাদ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই সেটা উনি টের পেয়েছেন। তাই আজ বক্তৃতা দিতে গিয়ে উনি যে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন, সেটা সবাই বুঝেছেন।
মিশ্র আরও বলেন, ‘‘উনি বি জে পি-র বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে আমরা এতদিন যা বলেছি, সেই সব কথাই বলেছেন। হয়তো আমাদের কাগজ এখন পড়ছেন। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা উচ্চারণ করেননি। আবার কেন্দ্রের মতো এরাজ্যে যে ওঁর সরকারের হাতে মানুষের গণতন্ত্র আক্রান্ত, জীবন-জীবিকা আক্রান্ত হচ্ছে, তা নিয়ে কোনও কথা নেই। আমরা আগেই স্লোগান দিয়েছি, ‘তৃণমূল হটাও, রাজ্য বাঁচাও, বি জে পি হটাও, দেশ বাঁচাও’। সেই লক্ষ্যে আমাদের লড়াই চলবে।’’ (তথ্যসূত্র : গণশক্তি)