জ্যোতিবাবুকে মনে রেখে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন-বিমান বসু

0

টিডিএন বাংলা: কমরেড জ্যোতি বসুর ১০৫তম জন্মদিবস। জ্যোতিবাবু যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিনই তিনি প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে কমিউনিস্ট কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন। জ্যোতিবাবুর স্মরণে দুকথা লিখতে গিয়ে আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন জ্যোতিবাবুর জীবনে সব থেকে বড় কীর্তি কি? উত্তরে আমি বলব কমিউনিস্ট পার্টির নিয়মশৃঙ্খলা মেনে কমিউনিস্ট কার্যকলাপ পরিচালনা করা। জ্যোতিবাবুর মতো দেশের অত বড়মাপের কমিউনিস্ট তথা বামপন্থী নেতাকে ১৯৯৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব আসলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মত বিরোধিতা করায় তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি। এখনকার সময় দে‍‌শে রাজনৈতিক নেতাদের হালচাল, আকাঙ্ক্ষা, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের একাংশের যে মনোভাব থাকে তার বিচারে কমরেড জ্যোতি বসু পার্টির সিদ্ধান্ত মান্য করে কমিউনিস্ট কার্যকলাপ পরিচালনা করার এক অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন।

কমরেড জ্যোতি বসুর সাত দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলনসহ বামপন্থী গণআন্দোলনের ইতিহাসের বর্ণনা তুলে ধরা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। একথা সকলেই জানেন পরাধীন ভারতের যুক্ত বাংলার রেলওয়ে ক্ষেত্র থেকে ১৯৪৬ সালে তিনি বিধানসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে চা বাগান ক্ষেত্র ও কৃষি ক্ষেত্র থেকে যথাক্রমে কমরেড রতনলাল ব্রাহ্মণ ও কমরেড রূপনারায়ণ রায় জয়ী হয়েছিলেন। ঐ সময় থেকে জ্যোতি বসু বিধানসভার অভ্যন্তরে ও বিধানসভার বাইরে গণআন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে চিরদিন লিপিবদ্ধ থাকবে। তিনি মাঝে ১৯৭২ সালে জাল-জোচ্চুরির নির্বাচন বাদে ১৯৫২ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে গণতন্ত্র ও সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের অধিকারী হয়েছিলেন।

পাঁচের দশকে জ্যোতিবাবু আবার সংসদীয় কার্যকলাপ ও পার্টি সংগঠন পরিচালনার যুগপৎ দায়িত্বে থেকে যেভাবে বামপন্থী শক্তির ঐক্য-সংহতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছেন তাও উদাহরণ সৃষ্টিকারী। ১৯৫৬ সালে বঙ্গ-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব আসলে তার বিরুদ্ধে যৌথভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কমিটি তৈরি করার সময় অন্যান্য বামপন্থী নেতৃত্ব উক্ত কমিটির সভাপতি হিসাবে জ্যোতিবাবুর নাম প্রস্তাব করলে তিনি আপত্তি করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহিত মৈত্র-র নাম প্রস্তাব করলে তাঁকেই সভাপতি করা হয়। জ্যোতিবাবু পার্টি সম্পাদক ও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসাবে কাজ করে ঐ ধরনের কমিটির সভাপতির কাজ করা অসম্ভব হতে পারে মনে করে নিজেকে সরিয়ে নেন। এই ঘটনা অনেকের কাছে শিক্ষণীয় হওয়া উচিত।

বর্তমান সময়ে দেশের রাজনীতির বিচার বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই সব থেকে বড় বিপদ গণতন্ত্র ও দেশের সাম্প্রদায়িক ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতি রক্ষার প্রশ্ন। জ্যোতিবাবু গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় জীবনের বড় সময় ব্যয় করেছেন। তিনি শ্রমিক-কৃষকের গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামকে অগ্রসর করতে যেমন পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন ঠিক তেমন ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজনের নীতির বিরোধিতায় আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ রাজ্যের ছয়ের দশকে স্বল্পস্থায়ী দুটো যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়ে উঠেছিল যার উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি নিজে। যুক্তফ্রন্টের সময়কালে শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনের বিরোধিতায় সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সরব হলে জ্যোতিবাবু তার বিরোধিতা করতেন এবং মাঠে ময়দানের আন্দোলনের সমর্থনে বক্তব্য রাখতেন। তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও অগণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভাজন করে সমর্থনের বিষয় নির্ণয় করতেন। শ্রমিক‍‌শ্রেণির ন্যায্য দাবিতে শুধু সাধারণ আন্দোলন নয়, এমনকি চূড়ান্ত অস্ত্র ধর্মঘটকেও সমর্থন করতেন। আবার রাজ্যে সাতের দশকের শুরুতে যেভাবে গণতন্ত্রের উপর হামলা আক্রমণ করে আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস পরিচালিত হয়েছিল তার বিরোধিতায় তিনি সোচ্চার ছিলেন। সর্বত্র জনসভার মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইকে অগ্রসর করতে রাজ্যের সর্বত্র প্রচার করেছেন। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকেও তিনি ঘৃণা করতেন। যুক্তফ্রন্টের আমলে একবার হুগলী জেলায় তেলেনিপাড়ায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বাধলে সেই দিন রাতে ১২টা-১টার সময় তেলেনিপাড়ায় গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবেদন জানান এবং পুলিশকে বলেছিলেন সংঘর্ষের জন্য যারা এগিয়ে আসবে তাদের দেখামাত্র গুলি করতে হবে। বলেছিলেন ‘শুট অ্যাট সাইট’।

বর্তমান সময়ে ভারতের রাজনীতির আকাশে এক ঘন কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। এখন সর্বত্র ধর্ম ও রাজনীতিকে মিলিয়ে মিশিয়ে চলার লক্ষ্যে কেন্দ্রে বি জে পি সরকার পথ চলতে চাইছে। বি জে পি-র নেতৃত্বে প্রথম এন ডি এ সরকার ১৯৯৮ সালে গড়ে ওঠার পর থেকেই ধর্ম ও রাজনীতির এক ধরনের ককটেল শুরু হয়েছে। সেই সময় জ্যোতিবাবু বারবার রাজনীতি থেকে ধর্মকে সরিয়ে রাখবার কথা বলেছেন। ১৯৯০ সালে ২৪শে জানুয়ারি জ্যোতিবাবু রাজ্য বিধানসভায় ভাষণে যা বলেছিলেন পাঠকের সুবিধার্থে তা হুবহু উল্লেখ করছি। তিনি বলেছিলেন — ‘‘ধর্ম এবং রাজনীতিকে কখনও মেশাবেন না। এটা মেশালে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমাদের যে সংবিধান আছে তা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের। তার জন্য আমরা গর্বিত। আমাদের অনেক প্রতিবেশী রাষ্ট্র আছে, আমাদের রাষ্ট্র তাদের মতো নয়। সেখানে কোনও একটা ধর্ম আছে, সেটা কোনও একটা ধর্মের রাষ্ট্র। আমরা সেটা চাই না। ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ হতে পারে না, যে যার ধর্ম পালন করবেন এই অধিকার আমাদের সংবিধানে আছে। কিন্তু রাম জন্মভূমি এবং বাবরি মসজিদ নিয়ে কিছু সংগঠন ধর্ম আর রাজনীতিকে মিশিয়েছে। ধর্ম আর রাজনীতিকে মেশালে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’’ আমাদের মনে রাখতে হবে এই সরকারের আমলেই তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক হয়। আর তৃণমূল কংগ্রেস ধর্ম ও রাজনীতিকে নিয়ে ককটেল করার বি জে পি-র নীতির বিরোধিতা না করে তাদের কুকর্মের অংশীদার হয়েছিল।

জ্যোতিবাবু ১৯৯২ সালে ৬ই ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার আগে বারবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করেছিলেন এবং বলেছিলেন আমার কাছে রিপোর্ট আছে বাবরি মসজিদের সামনে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বহু মানুষ জড়ো হচ্ছে বাবরি মসজিদ আক্রমণের জন্য। তাই আপনাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকি দরকার হলে সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, বজরঙ দল, বি জে পি-র অন্যান্য সহযোগী সংগঠন মিলিতভাবে বাবরি মসজিদ ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল। এই ঘটনা আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের উপর ভয়ংকর আক্রমণ এনেছিল। এই ঘটনার পরিণতিতে অযোধ্যা থেকে ফৈজাবাদের কর্নেলগঞ্জ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ কলুষিত হয়। বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে জ্যোতিবাবু সোচ্চারে বলেছিলেন এই জঘন্য কাজ ঘটাতে পারে একমাত্র ‘‘অসভ্য ও বর্বররাই।’’ পরবর্তী সময়ে ১০বছর পর গুজরাটে প্রথম আমেদাবাদকে ঘিরে পরে অন্যান্য এলাকায় যে ন্যক্কারজনক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে জ্যোতিবাবু বলেছিলেন ‘‘বাবরি মসজিদ ভাঙার পর অসভ্য বর্বরদের কার্যকলাপ বলেছিলাম। গুজরাটের ঘটনাকে কী অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? এই ঘটনা পরম্পরা অবশ্যই অসভ্যতা ও বর্বরতা।’’ ইতিহাসের পাতা থেকে এই কয়েকটা কথা উল্লেখ করলাম এই জন্য যে, বর্তমান সময়ে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ অতীতের সময় থেকে অনেকগুণ বেড়েছে। তাই, সাম্প্রদায়িকতার বিষময় ফলের কথা বিবেচনায় রেখে বি জে পি-র পক্ষ থেকে যে সব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা হয় তার বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী তথা বি জে পি দলের রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামকে জোরদার করার জন্য পরিশ্রমী কাজ হলেও জনগণের দৃঢ় ঐক্যের ভিত মজবুত করতেই হবে।

আমরা কখনও ভুলে যেতে পারি না যে, আমাদের দেশে হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করেন। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। আবার এই ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মধ্যে অগ্রসর ও পশ্চাৎপদ অংশের মানুষও রয়েছেন। জ্যোতিবাবু মনে করতেন ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শই পারে সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সংহতির মেলবন্ধন তৈরি করতে।

পরিশেষে, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতকারী মানুষের ঐক্য গড়ে তোলার কাজে আমাদের সকলকেই নিরলস প্রচেষ্টায় যুক্ত থেকে গণআন্দোলনের ভিত্তিকে শক্ত করে তাকে প্রসারিত করতে হবে। জ্যোতিবাবুর কথা দিয়েই এই লেখা শেষ করতে চাই। তিনি বহুবার বলেছেন, ‘‘আমরা বিশ্বাস করি, যে মানুষই ইতিহাস রচনা করেন, তাঁদের উপর আমাদের দৃঢ় আস্থা। তাঁরা কখনও কখনও ভুল করলেও শেষ পর্যন্ত সঠিক পথ বেছে নেবেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের সংগ্রাম-আন্দোলনের পাশাপাশি, আমাদের অভিমত হলো বর্তমান পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, অগণতান্ত্রিক এবং সাম্রাজ্যবাদপন্থী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম জরুরি।’’
(বিমান বসুর এই লেখাটি
গণশক্তি থেকে নেওয়া হয়েছে)